আবরারকে পেটানোর সিদ্ধান্ত হয় ক্যান্টিনের বৈঠকে

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ১২:৩৬ এএম

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ রাব্বীকে (২২) পিটিয়ে হত্যার চার-পাঁচ দিন আগে শেরেবাংলা হলের ক্যান্টিনে বৈঠক করেছিলেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। আবরার হত্যা মামলার আসামি মেহেদী হাসান রবিন আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এ কথা বলেছেন বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার মাসুদুর রহমান। রবিনের জবানবন্দি উদ্ধৃত করে তিনি আরও জানান, ‘অক্টোবরের শুরুর দিকের সেই বৈঠকেই আবরারকে পেটানোর সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু আবরার হলে না থাকায় তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে ৬ অক্টোবর বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর তাকে তার ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে ডেকে ২০১১ নম্বর কক্ষে নিয়ে মারধর শুরু হয়। সেখানে গিয়ে আমি প্রথমে চড়-থাপ্পড় ও কিল-ঘুষি মারি। স্টাম্প দিয়েও বাড়ি দিয়েছি। তবে তাকে বেশি মেরেছে অনিক ও সকাল। অন্যরাও মেরেছে।

গতকাল সোমবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব কথা বলেছেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক (বহিষ্কৃত) রবিন। জবানবন্দি শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। এ নিয়ে আবরার হত্যা মামলায় পাঁচ আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেন, যাদের সবাই কারাগারে। অন্যরা হলেন ইফতি মোশাররফ সকাল, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, অনিক সরকার ও মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ।

জবানবন্দিতে রবিন আরও বলেন, ‘আবরারের রুমমেট মিজান ও বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের উপ-আইন বিষয়ক সম্পাদক অমিত সাহা তাকে জানিয়েছিলেন আবরার শিবির করে। ওর সঙ্গে শিবিরের সংশ্লিষ্টতা আছে। ওর ফেইসবুক বা মোবাইল ফোন চেক করলেই এটা নিশ্চিত হওয়া যাবে। সে অনুযায়ী ঘটনার দিন ৬ অক্টোবর রাত ৮টার দিকে আবরারকে ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে আনা হয়।’

রবিন বলেন, ‘আবরারকে প্রথম দফায় আমি প্রশ্ন করি, “তুই শিবির করিস?” আবরার অস্বীকার করে। পরে ইফতি ও তানভীরকে তার কক্ষে পাঠিয়ে দিই আমরা। তারা আবরারের কক্ষ থেকে তার দুটি মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ নিয়ে আসে। অনিক একটি মোবাইল ফোনে আবরারের ফেইসবুক ঘেঁটে কিছু উস্কানিমূলক বক্তব্য পায়। তখন সে জিজ্ঞাসা করে, “ক্যাম্পাসে কারা শিবির করে? তুই তাদের নাম বল?” আবরার চুপ থাকে। তখন অনিক তাকে কিল-ঘুষি মারে। আমিও আবরারকে চড়-থাপ্পড় মারি। একটা পর্যায়ে ক্রিকেটের স্টাম্প দিয়ে তাকে পেটাই। কিছু সময় পর আমি অনিককে বলি যে ওকে পিটিয়ে শিবিরের নামগুলো বের করতে হবে। এরপর আমি চাঁনখারপুল যাই খেতে। চাঁনখারপুলে হোটেলে খাওয়া-দাওয়ার সময় মেসেঞ্জার গ্রুপে দেখতে পাই যে আবরারের অবস্থা খুবই খারাপ।’

পুলিশ কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে আরও জানান, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে রবিন সেই রাতে আবরারকে মারধরের সময় কী করেছিলেন তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। অন্য আসামিদের ভূমিকাও তার জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। তিনি বলেন, আবরার হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়া পাঁচ আসামিসহ ১১ জন কারাগারে রয়েছেন। এদের মধ্যে যাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়নি তারা হলেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, ফুয়াদ, জেমি, তাবাখখারুল তানভীর ও ইশতিয়াক মুন্না। এছাড়া গোয়েন্দা শাখার হেফাজতে রয়েছেন আট আসামি। তাদের বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রত্যেক আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হলে, বিচারিক প্রক্রিয়ায় আসামিদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা যায় না। বিভিন্নজনের বিভিন্ন ধরনের বক্তব্যের কারণে আসামির দোষ-প্রমাণে নানা ধরনের জটিলতার সৃষ্টি হয়। তাই ইচ্ছে করেই সব আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়নি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া মিজানুর রহমান মিজান নামে আরেক আসামি অসুস্থ থাকায় তাকেও রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ না করে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

পুলিশকে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল : আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনার রাতে পুলিশকে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল বলে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাত ৩টার সময় হলের সামনে গেলে পুলিশকে বলা হয়েছিল কোনো সমস্যা নেই। পুলিশের সে রাতে হলে যাওয়ার সময় নিয়ে একাধিক বক্তব্য পাওয়া গেছে এতে পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয় কি না জানতে চাইলে মনিরুল ইসলাম বলেন, পুলিশ সে রাতে ৩টার পরে গিয়েছে। সে সময়ও পুলিশকে বলা হয়েছে কোনো সমস্যা নেই। ভেতরে সমস্যা না থাকলে পুলিশের হলে ঢোকার রেওয়াজ নেই। সমস্যা থাকলে, কেউ জানালে তখন তারা ঢুকতে পারে। আটক করাদের জিজ্ঞাসাবাদে যেটা পেয়েছি, ৩টার বেশ আগেই আবরার মারা গিয়েছে। পুলিশ গিয়েছে অনেক পরে। ফলে কোনো চিৎকার বা শব্দ শোনাও সম্ভব হয়নি।

শিবির সন্দেহে পেটানো হয় : আবরার হত্যার মোটিভ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে মনিরুল ইসলাম বলেন, চার আসামি আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছে, তারা শিবির সন্দেহে মারধর করেছিল এবং মারধরের এক পর্যায়ে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে। তাদের জবানবন্দি, পাশাপাশি তথ্য বিশ্লেষণ এবং পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে আসতে হবে যে, তাকে কি হত্যার উদ্দেশ্যে মারধর করছিল, নাকি মারধর করার জন্য মারধর করছিল। হয়তো মারধরের মাত্রা বেশি হওয়ার কারণে হত্যার শিকার হয়েছে। সেটিকে শুধু শিবির সন্দেহে পেটানো? না অন্যকিছু সেটা আরও তথ্য-প্রমাণ ছাড়া উপসংহারে পৌঁছানো যাবে না। সাংবাদিকদের অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কারও কারও জবানবন্দিতে এসেছে কয়েক ঘণ্টা ধরে বারবার মারধর করা হয়েছে আবরারকে।

সবকিছু জানতেন অমিত সাহা : ডিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আবরার হত্যাকাণ্ডের সবকিছু জানতেন অমিত সাহা। আবরারকে খোঁজাখুঁজি থেকে শুরু করে মারধর ও হত্যাকাণ্ডের সব বিষয়েই তিনি অবহিত ছিলেন। আদালতে যারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, তাদের অনেকের বক্তব্যে তার ভূমিকার বিষয় উঠে এসেছে।

অভিযোগপত্র নভেম্বরের শুরুতে : সংবাদ সম্মেলনে আগামী মাসে আদালতে এ মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হতে পারে ইঙ্গিত দিয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘তবে আমরা আশ্বস্ত করতে চাই, আগামী মাসের শুরুতে বিজ্ঞ আদালত যে তারিখ দিয়েছে তার আগেই অর্থাৎ আমরা আশা করছি, আগামী মাসের শুরুর দিকে এ মামলার তদন্তকাজ শেষ হবে। তখন আমরা একটা পূর্ণাঙ্গ চিত্র দিতে পারব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত