প্রজনন মৌসুম হওয়ায় সারা দেশে ৯ অক্টোবর থেকে ২২ দিন ইলিশ ধরায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ সময়ে সরকারের বরাদ্দ দেওয়া ২০ কেজি করে চাল চার হাজার জেলের পাওয়ার কথা। তবে ইলিশ ধরা ছয় দিন বন্ধ থাকলেও ওই চাল পাননি কোনো জেলে। মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, বরাদ্দের চাল পৌঁছবে চলতি সপ্তাহে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা, কাট্টলী থেকে সীতাকু- উপজেলা পর্যন্ত ৩৮টি জেলে পল্লী রয়েছে। এসব এলাকায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ এই মাছ ধরার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। মূলত ইলিশ ধরার ওপর তাদের আয় নির্ভর করে। গত ২০ মে থেকে সাগরে ৬৫ দিন মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। তারা তখন এই নিষেধাজ্ঞার প্রত্যাহার চেয়ে সড়ক অবরোধসহ মানববন্ধনও করেছিল। চলমান নিষেধাজ্ঞার ছয় দিনেও চাল না পেয়ে অনেকেই ক্ষোভ জানিয়েছে। জেলেদের দাবি এই সময়ে কোনো আয় না থাকায় ঋণ করে চলতে হয়।
জেলেদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মৌসুমের শুরুতে তারা দেখা পায়নি ইলিশের, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বৈরী আবহাওয়া। তবে গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষ থেকে অক্টোবরের শুরুতে
গভীর সমুদ্রে ও নদীতে ধরা পড়ছিল ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ। জেলেদের মুখে যখন হাসি ফুটেছে, তখনই প্রজনন মৌসুমের জন্য ইলিশ ধরা বন্ধ করতে হয়েছে। আর সরকারের সাহায্যও সঠিক সময়ে আসছে না।
উত্তর কাট্টলীর জেলে প্রদীপ জলদাস বলেন, ‘২২ দিন ইলিশ ধরা বন্ধের সময় সরকার মাত্র ২০ কেজি করে যে চাল দেয়, তা এখনো পাওয়া যায়নি। আমার তো আটজনের সংসার। বিশ কেজি চালে কী হয়? এর সঙ্গে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যাসহ বিভিন্ন সমস্যায় মাছ শিকার বন্ধ রাখতে হয়। এ সময়ে কোনো আয় থাকে না। মাছ ধরা বন্ধ থাকার সময় সরকার বিকল্প কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে ভালো হতো।’
উত্তর চট্টলা উপকূলীয় জলদাস সমবায় কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক লিটন জলদাস বলেন, চালের বরাদ্দ হয়েছে শুনেছি, তবে এখনো পায়নি। এই চাল দিয়ে সংসার চালানো কষ্টকর। সরকারি এই বরাদ্দ পাবে কার্ডধারী নিবন্ধিত প্রায় চার হাজার জেলে। অথচ এই সংখ্যার ১০ গুণের বেশি লোক এই পেশার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এ ছাড়া পরোক্ষভাবে জড়িত ধরলে তা হবে লক্ষাধিক। তাই কার্ডধারীদের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। এ ছাড়া মাছ ধরা বন্ধের সময় জেলেদের জন্য সরকারের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ইলিশ সারা বছরই ডিম ছাড়ে। তবে আশ্বিনের পূর্ণিমার আগে ও পরে ৮০ শতাংশ মা ইলিশ মিঠাপানিতে এসে ডিম ছাড়ে। এ জন্য আশ্বিনের পূর্ণিমার চার দিন আগে এবং পূর্ণিমার পরে ১৮ দিন মিলিয়ে ২২ দিন বঙ্গোপসাগর, উপকূলীয় অঞ্চল ও দেশের সব নদ-নদীতে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ থাকবে। এ সময় মৎস্য বিভাগ, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মমিনুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, জেলেদের চাল চলতি সপ্তাহে পৌঁছে যাবে। কোনো জেলেই খালি হাতে ফিরবে না। প্রতি পরিবারকে ২০ কেজি করে চাল দেওয়া হবে সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী। নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে ইলিশ মাছের প্রজনন নির্বিঘ্নে হলে তার সুফল পরবর্তী সময়ে মৎস্যজীবীরাই পাবেন।
গত ৯ অক্টোবর থেকে আগামী ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এ সময়ে ইলিশের আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় নিষিদ্ধ থাকবে। এ আইন অমান্য করলে জেল অথবা জরিমানা এমনকি উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মো. আশরাফ আলী খান খসরু। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে গত ৭ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাংবাদিকদের জানান, গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে মা-ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান-২০১৯ উপলক্ষে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ থাকবে। এ সময় ইলিশ ধরার ওপর নির্ভরশীল জেলেদের খাদ্য সহযোগিতা দেওয়া হবে।
