গুরু শিষ্য হয় যদি এক তার গুরু সুভাব দাও আমার মনে

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১০:১৫ পিএম

বাউলরা স্বরূপ থেকে অরূপের খোঁজ করেন এবং অরূপের সন্ধান করতে গিয়ে তাকে চিনে নেওয়াই হলো মূল বাউলতত্ত¡। চেনাচিনির পথে গুরু এবং লালনগানই তাদের অনিবার্য অবলম্বন। গুরুর প্রকারভেদ আছে। যেমন দীক্ষাগুরু, শিক্ষাগুরু। দীক্ষাগুরুর নিচে থাকেন শিক্ষাগুরু। যিনি দীক্ষা দেন তিনি সর্বক্ষেত্রে শিক্ষা নাও দিতে পারেন। সুফিবাদে যেমন পীর, মুর্শিদ কিংবা শায়খ, লালনবাদে তেমনি আউল বাউল দরবেশ ফকির। আর গুরুশ্রেষ্ঠ মানে সাঁই।

ভবে মানুষগুরু নিষ্ঠা যার।/ সর্বসাধন সিদ্ধ হয় তার।।

ফকিরি ভাষায় সাধারণ মানুষ হলো আউল। আউলরা গুরুর কাছে দীক্ষা পেয়ে বাউল হয়। বাউলের কোনো গ্রন্থ নেই, বাউল একটা টাইটেল। অন্যকথায় বাউলরা সর্বকেশী; তারা সন্ধানে চলেন হাওয়ার সন্ধান। বাও হলো বাতাস আর উল মানে সন্ধান। দৌলতপুরের বাউল শফি মণ্ডল বর্ণনা করতে গিয়ে একই কথা বলেন ‘বাউলরা বাতাসেরই সন্ধান করেন। তিনি মনে করেন বাতাসের মধ্যে অনেক মহৎ আবিষ্কার আছে এবং বাতাসের মধ্যেই মহৎ আত্মাগুলো বিদ্যমান থাকেন। আমরা তো নেটওয়ার্ক জানি না তবে যারা কল্যাণ চিন্তা করেছেন তারা তো সকলে বাতাসের মধ্যেই বিরাজিত আছেন’। সে যাই হোক, এক দুই কথায় বাউলকে সংজ্ঞায়িত করা কষ্টকরই বটে। বাউল ধর্মে আকৃষ্ট হয়ে যে কেউ এই পথ গ্রহণ করতে পারেন। তবে হাওয়ার সাধনায় নারীর অবদান অপরিহার্য। সাধিকা ছাড়া সাধকের সাধনা পূর্ণ হয় না

ঘরে বাইরে একই মন/ তবে হবে গুরুর দরশন।

সাধুসঙ্গিনীকে নিয়েই শুরু হয় যুগল সাধনা। সাধুসঙ্গিনী সাধনার ব্যাপারে সর্বদা চেতন থাকেন বলে তারা চেতনগুরু।

কোথা আছেরে সেই দিন দরদি সাঁই/ চেতনগুরুর সঙ্গ লয়ে খবর কর ভাই।।

সাধন লাইনের একবারেই প্রাথমিক পাঠ হলো চাল-পানি আর সিদ্ধির পর্যায়ের দীক্ষা হলো খেলাফত গ্রহণ। খেলাফত গ্রহণকে সাধুরা ভেক নেওয়া বলেন। চাল-পানি নিয়ে শিষ্য গুরুকার্যে মনোযোগী হন এবং গুরুর বাতলে দেওয়া পথে পরম ভক্তি সহকারে চলতে শুরু করেন। গুরু নামের সুধাসিন্ধুতে বিন্দুরূপে পান করলে দীনবন্ধু মেলে। লালনকথা যারে (গুরু) ভাবলে পাপীর পাপ হরে, দিবানিশি ডাকো তারে। গুরু প্রসঙ্গে ফকির ইয়াসিন শাহ্ জানান, ‘গুরু যারে দয়া করে সেই জানে গুরুদেশের কথা, অনেক ভাগ্যের ফলে সে চাঁদ (গুরু) দেখিতে পাওয়া যায়, অমাবস্যা নেই সে চাঁদে; দ্বিতলে তাঁর কিরণ উদয়-আমার গুরু খুব ভালো মানুষ ছ্যালো’। ফকির ইয়াসিন বিশ্বাস করেন সাধক হতে গেলে চাতকস্বভাব থাকতে হবে। কবে অমৃত পাওয়া যাবে সেই আশায় বসে থাকতে হবে। গুরুর কাছেই জানা যায় চাতকস্বভাব।

মোদ্দাকথা হলো, যারা হাওয়ার সাধনা করেন তারাই মূলত বাউল। এই মতে সাধনার স্তর চারটি : স্থ‚ল, প্রবর্ত, সাধক ও সিদ্ধি। প্রথম পর্যায়ের শিক্ষা হলো স্থ‚ল, দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবর্ত, তৃতীয় পর্যায়ে সাধক এবং চতুর্থ বা চ‚ড়ান্ত পর্যায়ের শিক্ষা হলো সিদ্ধ। লালনগানেও দেখা যায় সেই ভাবদর্শন

ধর চোর হাওয়ার ঘরে ফাঁদ পেতে।/ সেকি সামান্য চোরা/ধরবি কোনা কানচিতে।।

লালনভক্তির বিষয়ে বৃদ্ধ বাউল ফকির নিজামুদ্দিন শাহ্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান ‘দ্যাকেন তো কতা; তাঁর জন্যই তো স¤পূর্ণ জীবন যৌবন অর্পণ করেছি। চোখ বন্ধ করলে গুরু কোকিল শাহ্কে পরিষ্কার দেখতে পাই’। গুরু সম্পর্কে প্রায় সব বাউলেরই একই ধরনের আকুতি লক্ষ করা যায় গুরুই তাদের সাধনার প্রাণপ্রবাহ, তিনিই  শিষ্যকে ভক্তি দেওয়া শেখান। ভক্তি ধীরে ধীরে গাঢ় হয়। কথা বলতে গিয়ে গুরু নাম উচ্চারিত হলেও শিষ্য হাতজোড় করে কপালে ঠেকান। শুধু তাই নয়, গুরু-শিষ্যের দেখা-সাক্ষাৎ হলে তারা চোখে চোখে ভাববিনিময় করেন। দৃষ্টি বিনিময়ে এ যেন এক অপূর্ব মিলনখেলা

গুরু শিষ্য হয় যদি এক তার/সমন বলে ভয় কিরে আর

গুরুই মূলত শিষ্যের মনের মানুষ। ঢাকার বাউল জাহাঙ্গীর শাহ্ বললেন, ‘গুরু তো উপরেই থাকবেন; আমি নিচে থাকতেই চাই’। আখড়াবাড়ির বজলু শাহ্ জানালেন- ‘আমার উনিই তো সব’।

বাউলরা কলেব পরিষ্কার করার কথা বলেন। কলেব পরিষ্কারের পদ্ধতি নিয়ে বাউল শফি মণ্ডলের ব্যাখ্যাটি বেশ নান্দনিক। মূলকথায় যাওয়ার আগে তিনি গানের উপমা টানেন-

পাখি কখন যেন উড়ে যায়/বদ হাওয়া লেগেছে খাঁচায়।

খাঁচায় যাতে বদ হাওয়া না লাগে এ জন্য শফি প্রভুর নাম নিয়ে শ্বাস নেন এবং কলব পরিষ্কার রাখার জন্য দমে দমে হরদম আল্লাহর নামে জিকির করেন। শিষ্য ভেদে কলেমা বা মন্ত্র যাই হোক, গুরু তার শিষ্যকে মানবধর্মের নানা কর্মকরণ পালন করতে বলেন এবং শিষ্যের কার্যধারা পর্যবেক্ষণ করে সময়ে সময়ে আদেশ উপদেশ দিয়ে থাকেন। ফকিরি ভাষায় এ হলো ‘চক্ষুদান’।

চাল-পানি দিয়ে সাধনার ক্লাস শুরু হলেও শিষ্যকে চাতকের মতো বসে

থাকতে হয় অমৃত লাভের আশায়। পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ পরিক্রমা। স্থ‚ল পর্যায় পার হয়ে প্রবর্ত। প্রবর্তের পরে আসে সাধক। আর সাধক হলেই পাওয়া যায় সিদ্ধি। সাধু জনমটা শিষ্যের কাছে সৌভাগ্যের ব্যাপার। পূর্ব সুকৃতির পাওনা না থাকলে সাধু হওয়া যায় না। সাধু হওয়া এক জনমের কাজ নয়-

থাকিলে পূর্ব সুকৃতি/দেখিতে শুনিতে হয় গুরুপদে মতি।

প্রত্যেক পর্যায়ের মতো সাধক পর্যায়েরও আছে চার উপ স্তর। মূলত এই চার স্তরেই শুরু হয় মূল সাধনা। মূল সাধনা দিয়েই পাওনা হয় সিদ্ধি। যারা বস্তুরক্ষায় মনোযোগী এবং ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণে সমর্থ হন তারা এগিয়ে যান। এরপর সিদ্ধের চার উপ স্তরে রস-রতির যোগে চলে প্রেম সাধনা। খেলাফত বা ভেক গ্রহণ এইসব সাধন পথাদির উচ্চপর্যায়ের দীক্ষানুষ্ঠান। ভেক নেওয়ার আগের দিন গুরু তার শিষ্যকে নিয়ে গোপনীয় স্থানে মিলিত হন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দান করেন। গুরু শিষ্যকে বীজমন্ত্র দেন এবং সাধুবৃত্তির রীতিনীতি ও শারীরবৃত্তীয় নানা কৌশলাদি সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান দান করে থাকেন। যা তারা কখনোই প্রকাশ করেন না। দীক্ষাশিক্ষার সেকশনে এসব মন্ত্রাদি শিষ্যের কাছে সারা জীবনের জন্য অমূল্যবাণী হয়ে থাকে।

খেলাফত বা ভেক নেওয়ার সময় সাধনার্থী যুগলকে নদীস্নানে পবিত্র করে সাদা শামিয়ানার তলায় নিয়ে যাওয়া হয়। অতঃপর তাদের খিল্কা পরিয়ে দেয়। খিল্কা হলো কাফন সদৃশ পোশাক। সাধু একে একে পরে নেন আচলা, তহবন, খিল্কা পাগড়ি এবং ডোরকোপনি যার মধ্যে তহবন হলো সাদালুঙ্গি আর ডোরকোপনি মানে আঁটোসাঁটো অন্তর্বাস। ডোরকোপনি পরানোর প্রতীকী অর্থÑ কামের ঘরে কপাট মারা। খিল্কা নেওয়ার পর সাধনার্থী যুগল নিজেদের মৃত মনে করেন। তাদের ভাষায় এ হলো জিন্দাদেহে মুর্দার পোশাক অর্থাৎ জ্যান্তে মরা। বৈষ্ণব সহজিয়ার শূন্যতার সাক্ষাৎ কিংবা সুফিদের ফানা পর্যায়ের সঙ্গে ‘জ্যান্তে মরার’ যথেষ্ট মিল আছে। খিল্কা পরিহিত সাধনার্থী যুগলকে গুরু কানে কানে গুরুবাক্য শোনান গুরুবাক্য মানে বীজমন্ত্র এবং কলেমা। গুরু এবার তাদের প্রেমভজা খেতে দেন। তাদের চোখ এবং হাতজোড়া রুমালের মতো লম্বা সাদা কাপড় দিয়ে বেঁধে লালনের সমাধিকে কেন্দ্র করে সাত বার প্রদক্ষিণ করাতে হয়। এ সময় তারা লালনের একটি বিশেষ লালনগান গাইতে থাকেন-

কে তোমার এই বেশভ‚ষণ পরাইলো বলো শুনি।/জিন্দাদেহে মুর্দার বেশ/খিল্কা তাজ আর ডোরকোপনি।।

খেলাফত নেওয়ার পর সাধু সকল পার্থিব বিষয় থেকে নির্মোহ হয়ে ওঠেন। জীবকে হত্যা করা যাবে না। জীবকে হত্যা করলে আত্মাকে পুনরায় জীবাত্মায় প্রবেশ করতে হয়। অধিকন্তু তারা এও মনে করেন যে, শুক্রের পতনে সৃষ্টি আর ঊর্ধ্বগামীতে স্রষ্টার দর্শন। সে কারণে খেলাফত নেওয়ার পর তারা  সন্তান  উৎপাদন থেকে বিরত  থাকেন। তাদের বিশ্বাস সন্তানের মাধ্যমে পিতার পুনর্জন্ম হয় এবং তার আত্মা পৃথিবীতেই রয়ে যাওয়ায় আত্মার মুক্তি হয় না

পিতার বীজে পুত্র সৃজন/তাইতে পিতার পুনর্জনম।/পঞ্চভ‚তে দেহের গঠন/আলেকরূপে ফেরে সাঁই।।

লেখক : কবি ও লালন গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত