পরাবাস্তব ঢাকায় কালকেতু ও ফুল্লরার অনিশ্চিত যাত্রা

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ১০:৩২ পিএম

কবি কিংবা কথাসাহিত্যিকদের প্রত্যেকেরই একটি নিজস্ব ভাষা থাকে বোধহয়। যে ভাষা বোঝার জন্য সেই কবি বা সাহিত্যিকের ভাবনার জগৎটিকেও বুঝতে হয়। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের উপন্যাস ‘কালকেতু ও ফুল্লরা’ পড়ার ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

জাদুবাস্তবতা, রূপকল্প কিংবা স্যাটায়ারের মতো সাহিত্যিক অনুষঙ্গের সুনিপুণ ব্যবহারে তৈরি হয়েছে উপন্যাসের কাঠামো। তবু উপন্যাস হিসেবে অবশ্য কালকেতু ও ফুল্লরাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট ‘জনরা’-তে ফেলা মুশকিল। আবার, কোনো ছকে ফেলতে না পারলেও, এমনকি কখনো কখনো দুর্বোধ্য মনে হলেও, এটি এক নিঃশ্বাসে শেষ করা ছাড়া পাঠকের আর কোনো উপায় থাকে না।

কী নিয়ে লেখা এই উপন্যাস? কেউ কেউ হয়তো বলবেন এটি একটি প্রেমের গল্প। তবে শেষ বিচারে এটি আসলে মানুষের চিরবিচ্ছিন্নতারই গল্প। আর এই গল্প পুরোপুরি বুঝতে হলে, একটি নির্দিষ্ট প্রজন্মের সাহিত্য সম্পর্কেও কিছুটা জানা-শোনা থাকা জরুরি। কেননা, এই উপন্যাসের অনেক চরিত্রই বাংলাদেশের সাহিত্যিক পরিমণ্ডলের চেনা মুখ। তবে তারা যতটা বাস্তব চরিত্র, ততটাই লেখকের সৃষ্টি। এমনকি, উপন্যাসের জগৎ এই ঢাকা শহর হলেও সেটি আসলে ঢাকা শহর নয়।  এখানে বুড়িগঙ্গার বদলে আছে ইউফ্রেটিস, এখানে রমনা পার্ক একটি পরাবাস্তব বন, এখানকার সংসদ ভবনে কোনো প্রবেশদ্বার নেই... ইত্যাদি ইত্যাদি।

তবু এটা আমাদেরই পরিচিত ঢাকা। আমাদের যাপিত জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতার একটি অনন্য, অন্য এক রূপ। যার স্রষ্টা আশির দশকের কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। ফলে এই জগৎকে বুঝতে হলে আশি এবং নব্বই দশকের সাহিত্য পরিমণ্ডল, তার সৌন্দর্য এবং বীভৎসতা বোঝাটাও জরুরি।  একই সঙ্গে ধারণা থাকতে হবে সেই নির্দিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়েও। তীক্ষè, ক্ষুরধার আর ব্যঙ্গাত্মক লেখনীতে ঔপন্যাসিক তার সময়কেই তুলে ধরেছেন। কাল্পনিক, উদ্ভট এবং হাস্যকর মনে হলেও ছোট ছোট একেকটি ঘটনায় হঠাৎ করেই পাঠক বুঝে যান, এগুলো আসলে আমাদের খুব অপরিচিত ঘটনা নয়। 

তাহলে কি নতুন পাঠক, এসময়ের পাঠক এই উপন্যাসের মূল সুর ধরতে পারবে না? এখানে একটা মজা আছে। যে কোনো মহৎ সাহিত্যই যেমন তার সময়কে অতিক্রম করে যায়, তেমনি ‘কালকেতু ও ফুল্লরা’ও তার সময়-কাল এবং লেখকের নিজস্ব দুর্বোধ্যতা সত্তে¡ও সব ধরনের, সব সময়ের পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারে। কারণ, আগেই যেটি বলেছি, এটি আসলে মানুষের খুব পুরনো, খুব মৌলিক একটি সংকটের কথা বলে। বিচ্ছিন্নতা। যে বিচ্ছিন্নতা সবচেয়ে বেশি ক্লাসিক্যাল রূপ নেয় নারী-পুরুষের সম্পর্কে এসে।

কালকেতু ও ফুল্লরা, এই উপন্যাসের প্রধান দুই পুরুষ ও নারী চরিত্র। নায়ক কিংবা নায়িকা বলা যাচ্ছে না, কারণ নায়কের যে বীরোচিত রূপ, যে পৌরুষোচিত সৌন্দর্য থাকে, কালকেতুর তা নেই।  সে যৌনতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভোগে, সে প্রেমিকা চলে গেলে দীর্ঘদিন একাকী জীবনযাপন করে, আবার উপেক্ষা করে চলে যাওয়া ছলনাময়ী ফুল্লরার প্রতি তার ভালোবাসা ও বিশ্বাস টলে না চরম আঘাত আসার আগ পর্যন্ত। ফুল্লরা তাকে বিয়ে করেনি, ফেলে গেছে, তবু ফুল্লরার হাত ধরে সে যাত্রা করে অনিশ্চিতের উদ্দেশে।

আর ফুল্লরা? নায়িকার সমস্ত রূপ-গুণ তার আছে বটে। তবে একই সঙ্গে সে-ই এই উপন্যাসের মহাপরাক্রমশালী খল চরিত্র। অন্তত, কালকেতুর দিক থেকে বিচার করলে। সত্যিকার অর্থে, কালকেতুর প্রতি ফুল্লরার অনুভ‚তি একতরফাভাবে বিচার করা পাঠকের জন্য কঠিন। ফলে কালকেতু, অর্থাৎ লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করা ছাড়া পাঠকের উপায় থাকে না। আর সেক্ষেত্রে ফুল্লরাকে নেতিবাচকভাবেই দেখতে বাধ্য হয় পাঠক। কিন্তু রহস্যময়ী, প্রখর বুদ্ধিমতি, মানসিক ও শারীরিক শক্তিতে সমভাবে বলীয়ান একটি চরিত্র হিসেবে ফুল্লরাকে উপস্থাপনের মাধ্যমেই আবার, লেখক ফুল্লরা চরিত্রের একটি বিকল্প পাঠের অবকাশ রেখে দিয়েছেন। কালকেতুর কোন অপরাধের শাস্তি ফুল্লরা তাকে দিয়েছে, সে প্রশ্ন কিন্তু করতেই পারে পাঠক।

তাই ফুল্লরার সঙ্গে কালকেতুর এই অনিশ্চিত যাত্রা ব্যর্থ না সফল, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার পাঠকের। যদিও গন্তব্যের চেয়েও যাত্রার রোমাঞ্চই পাঠককে মুগ্ধ করবে বেশি। তবে হ্যাঁ, একটি সতর্কবার্তা। আমাদের বর্তমান বাস্তব জগতের মতোই কালকেতু ও ফুল্লরার জগৎ অত্যন্ত মরবিড।  দ্বিধা, অবিশ্বাস, হতাশা আর নিষ্ঠুরতায় ভরা। স্যাটায়ারের শক্তিতে যা আরও বেশি প্রকট হয়ে ওঠে।  যার একটি উদহারণ হতে পারে জনা চরিত্রটি। কেন এত ব্যাখ্যাহীন নিষ্ঠুরতার শিকার হলো অনিন্দ্যসুন্দর এই মেয়েটি, তার কোনো কৈফিয়ত দেওয়ার দায় নেননি ঔপন্যাসিক। জনা যেন সেই শাশ্বত নির্যাতিত মানুষের প্রতিভ‚, জীবন যাদের প্রচণ্ড যন্ত্রণা ছাড়া আর কোনো কিছুই দেয় না কখনো।

উপন্যাস শেষ করার পর যে স্তব্ধতা তৈরি হয় পাঠকের মনে, সেটিই আবার ভাবতে বাধ্য করে দীর্ঘক্ষণ। জীবন নিয়ে, জীবনের অর্থহীনতা নিয়ে, অর্থপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে ব্যর্থতা নিয়ে, মানুষের ধ্বংসাত্মক পরিণতি নিয়ে।

বই : কালকেতু ও ফুল্লরা, লেখক : সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, প্রচ্ছদ : খেয়া মেজবা, প্রকাশক : বৈভব, দাম : ৪০০ টাকা

লেখক

কবি ও সাংবাদিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত