রামু থেকে ভোলা

ফেইসবুকে উসকানি পদ্ধতি ও ছক একই

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০১৯, ০২:২৩ এএম

ফেইসবুক বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া ভুয়া খবরকে কেন্দ্র করে দেশে সাম্প্রদায়িক হামলা, দাঙ্গা, হত্যা ও সংঘর্ষের ঘটনা থেমে নেই। ২০১২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামু থেকে শুরু করে সর্বশেষ গতকাল রবিবার ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলা মিলে গত ৭ বছরে এরকম অন্তত বড় চারটি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা থেকে দেখা গেছে, সব ঘটনার উৎস ফেইসবুকে কোনো মন্তব্য অথবা ছবি। পরে সেসব ছবি বা মন্তব্য মিথ্যা প্রমাণ হয়েছে। কিন্তু তার আগেই ঘটে গেছে বড় ধরনের ক্ষতি। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রদায়িক হামলায় নিহত হয়েছে অনেকে।

এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুয়া খবর ছড়ানো হয়েছে অন্য কারও ফেইসবুকের আইডি হ্যাক করে। এডিট করে ছবি দেওয়া হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তির নাম ব্যবহার করা হয়েছে। সবগুলো ঘটনাই ঘটেছে একই পদ্ধতিতে ও ছকে। এসব ভুয়া খবরের মাধ্যমে ইসলাম ধর্ম, ইসলামের ধর্মগ্রন্থ কোরআন অথবা নবীকে অবমাননা করা হয়েছে। পোস্ট করা হয়েছে ইসলামবিদ্বেষী ছবি।

এই বড় চারটি ঘটনার মধ্যে রামুর ঘটনায় যে বৌদ্ধ তরুণের ফেইসবুক ব্যবহার করা হয়েছে, পরে ওই নামে কারও খোঁজই মেলেনি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে রসরাজ নামে যে ব্যক্তির ফেইসবুক ব্যবহার করে ইসলামবিদ্বেষী ছবি পোস্ট করা হয়েছিল, সেই রসরাজ ফেইসবুক চালাতেই জানতেন না। পাসওয়ার্ড কাকে বলে সে নিয়েও তার কোনো ধারণা ছিল না। এমনকি সাম্প্রদায়িক হামলার পর ওই পোস্ট আর পাওয়া যায়নি। একইভাবে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় মহানবীকে অবমাননা করে যে ব্যক্তির ফেইসবুক থেকে পোস্ট দেওয়া হয়েছিল তার গঙ্গাচড়ায় বাড়ি হলেও তিনি থাকতেন নারায়ণগঞ্জে এবং ওইদিনের ঘটনা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না।

সর্বশেষ ভোলায় যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে গতকাল রবিবার চারজনের মৃত্যু, সংঘর্ষ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে, সেখানেও বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামের এক তরুণের ফেইসবুক হ্যাক করে কে বা কারা একই ঘটনা ঘটিয়েছে। এ ব্যাপারে শুভ কিছুই জানতেন না বলে পুলিশকে জানিয়েছেন এবং আইডি হ্যাক ও পোস্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছেন। পুলিশ আইডি হ্যাক ও এমন মন্তব্য পোস্ট করার সন্দেহে দুজনকে আটক করেছে।

কক্সবাজারের রামুর বৌদ্ধপল্লীতে হামলা : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১২ সাল। সেদিন হঠাৎ শোনা গেল রামুর একটি কম্পিউটারের দোকান থেকে উত্তম বড়–য়া নামে কোন এক বৌদ্ধ তরুণের ফেইসবুকে ইসলাম ধর্ম, মুসলমানের ধর্মগ্রন্থ কোরআন ও নবীকে অবমাননা করে পোস্ট দেওয়া হয়েছে। খবরটি বেশ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সেদিন রামু উপজেলার চৌমোহনী মোড়ে একটি মিছিল ও সমাবেশ হয়। সেখানে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা বক্তব্য রাখেন। কিন্তু সেই মিছিল শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক হামলায় গড়ায়।

এই ঘটনায় সে সময় স্থানীয় মুসলমানদের কয়েকটি দল রামুর ১৯টি বৌদ্ধমন্দির ধ্বংস ও  ক্ষতিগ্রস্ত করে। বৌদ্ধদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় রামুর বৌদ্ধপল্লী। ঘটনার কিছুটা রেশ উখিয়া ও টেকনাফেও ছড়িয়ে পড়ে। পরে রামুতে ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির পুনর্নির্মাণ এবং সংস্কার করা হয়।

স্থানীয় পুলিশের তথ্যমতে, ওই হামলার ঘটনায় তখন রামু, উখিয়া ও টেকনাফে সব মিলিয়ে ১৯টি মামলা হয়েছিল। একটি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। অন্য মামলাগুলোর বিচারকাজ এখনো শেষ হয়নি। এমনকি উত্তম বড়–য়া নামের যে তরুণের ফেইসবুক অ্যাকাউন্টকে ঘিরে ওই হামলার সূত্রপাত, পরে ওই নামে কোনো তরুণের খোঁজ মেলেনি।

নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা : ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর। একই কারণে ও একই কায়দায় সেদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলায়ও অনুরূপ হামলার ঘটনা ঘটে। রসরাজ নামে এক ব্যক্তির ফেইসবুকে কথিত একটি ইসলামবিদ্বেষী ছবি পোস্ট করার অভিযোগে ওই গ্রামের হিন্দুদের অন্তত ৫টি মন্দির ও বহু বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়।

জানা গেছে, হামলার দুদিন আগে নাসিরনগরের হরিপুর গ্রামের হিন্দু যুবক রসরাজ দাসের ফেইসবুকে ইসলামবিদ্বেষী একটি ছবি প্রকাশের অভিযোগ ওঠে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন গ্রামের মুসলমানরা। অভিযোগ ছিল মুসলমানদের কাবাঘরের সঙ্গে হিন্দুদের দেবতা শিবের একটি ছবি জুড়ে দিয়েছিলেন রসরাজ। স্থানীয় লোকজন সেদিনই রসরাজ দাসকে ধরে পিটিয়ে পুলিশে দিয়েছিল। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে মামলা দিয়ে তাকে চালান করে দেয়। কিন্তু তাতেও থেমে থাকেনি ওই ঘটনার রেশ।

সেদিন একাধিক স্থানীয় ইসলামপন্থি সংগঠন বিক্ষোভ সমাবেশ আহ্বান করে। এসব সংগঠনের লোকজন স্থানীয় মুসলমানদের সংগঠিত করে নাসিরনগরের হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা করে। প্রথম দিনই আটটি হিন্দুপাড়ায় অন্তত তিন শতাধিক বাড়িঘর, মন্দির, দেব-দেবীর মূর্তি ভাঙচুর করা হয়। ভাঙচুর হয় রসরাজের বাড়িও। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরে ৪ নভেম্বর আরেক দফা হামলা হয় নাসিরনগরের হিন্দুদের ওপরে।

ঘটনার আড়াই মাস পর জামিনে বের হয়েছিলেন পেশায় জেলে রসরাজ। বের হয়ে তিনি বলেছিলেন তিনি ফেইসবুক চালাতে জানেন না। পাসওয়ার্ড কাকে বলে সে নিয়েও তার কোনো ধারণা নেই। যে পোস্টটিকে ঘিরে এত ঘটনা সেটিও পরে আর পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, নাসিরনগরে ওই হামলার ঘটনায় মোট আটটি মামলা হয়েছিল। এর মধ্যে মাত্র একটি মামলার অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে। একটি মামলার তদন্ত করছে গোয়েন্দা বিভাগ। আর বাকি ছয়টির তদন্ত করছে নাসিরনগর থানার পুলিশ।

রংপুরের গঙ্গাচড়ায় গুলি ও একজনের মৃত্যু : নাসিরনগরে হামলার ঠিক এক বছরের মাথায় ২০১৭ সালের ১০ নভেম্বর রংপুরের গঙ্গাচড়ার আরেকটি অনুরূপ ঘটনা ঘটেছিল। সে ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়েছিল।

জানা গেছে, গঙ্গাচড়ায় টিটু রায় নামে এক ব্যক্তির ফেইসবুক থেকে মহানবীকে (সা.) অবমাননা করে একটি স্ট্যাটাস দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ক্ষুব্ধ হন স্থানীয় মুসলমানরা। শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটে।

সে সময় গঙ্গাচড়ায় প্রথমে কয়েক দিন মাইকিং হয়। ঘটনার দিন একটি মানববন্ধন শেষে হঠাৎ করে আশপাশের গ্রাম থেকে শত শত মানুষ মিছিল নিয়ে হিন্দুপাড়ায় হামলা চালায়। পুলিশের গুলিতে সেদিন একজন নিহত হয়।

স্থানীয় পুলিশ জানায়, গঙ্গাচড়ায় দুটো মামলা হয়েছিল। রংপুর সদরে হয়েছিল একটি মামলা। অবমাননার অভিযোগের মামলায় টিটু রায়কে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তিনি এখন জামিনে রয়েছেন।

সর্বশেষ ভোলায় : সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটে গতকাল রবিবার ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায়। সেখানে পুলিশের সঙ্গে গ্রামবাসীর সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে গ্রামবাসী ও পুলিশ সদস্যসহ অর্ধশত মানুষ।

স্থানীয় পুলিশ বলছে, ফেইসবুকে মহানবীকে (সা.) নিয়ে কটূক্তি করে একটি পোস্ট নিয়ে বোরহানউদ্দিনে গত শুক্রবার থেকেই বিক্ষোভ চলছিল। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা গ্রামবাসীর সঙ্গে কয়েক দফায় আলোচনা করেছেন। এমনকি বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামের যে তরুণের ফেইসবুক থেকে মহানবীকে কটূক্তি করে স্ট্যাটাস দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, ওই তরুণ সেদিনই স্থানীয় থানায় গিয়ে তার আইডি হ্যাক হয়েছে এবং কে বা কারা সেখানে স্ট্যাটাস দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি এখনো পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন।

স্থানীয় পুলিশ আরও জানায়, বিষয়টি তিনি স্থানীয় মসজিদের দুই ইমাম ও বাটামারা পীরকে জানান। তারা জানান যে, রবিবার সকালে দোয়া-মোনাজাত করে কর্মসূচি শেষ করবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। শেষ পর্যন্ত বিক্ষুব্ধরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে চারজন নিহত হয়। ১০ পুলিশ আহত হয়।

এ ব্যাপারে সেখানকার সাবইন্সপেক্টর মোহাম্মদ জাফর ইকবাল জানান, রবিবার সকাল ১০টা  থেকে ঈদগাহ ময়দানে হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভ চলছিল। শনিবার থেকেই বিভিন্ন ইসলামি সংস্থা এই সমাবেশের পক্ষে মাইকে প্রচার চালায়। তওহিদী জনতা নামে একটি সংগঠন নেতৃত্ব দিচ্ছিল। পরে সে বিক্ষোভ থেকে প্রথমে পুলিশের ওপর ঢিল ও ধর ধর বলে ছুটে আসে সবাই। এরপরই সংঘর্ষ বেধে যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত