সহজে ব্যবসার সূচকে ৮ ধাপ অগ্রগতি বাংলাদেশের

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০১৯, ০১:৪৬ এএম

উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বিশ্বব্যাংকের সহজে ব্যবসার সূচকে ৮ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। তারপরও আফগানিস্তান ছাড়া এশিয়ার সব দেশের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। এই সূচকে ১৯০ দেশের মধ্যে এবার বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮তম, যা গত বছর ছিল ১৭৬তম। এবার বাংলাদেশের গড় পয়েন্ট ৪৫, যা গত বছরের চেয়ে ৩.০৩ পয়েন্ট বেশি। গত বছর ছিল ৪১ দশমিক ৯৭ পয়েন্ট। সহজে ব্যবসার সূচকে বিভিন্ন পয়েন্ট বিচারে এবার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে নিউজিল্যান্ড। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে সিঙ্গাপুর ও হংকং। গতকাল বৃহস্পতিবার

প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘ডুয়িং বিজনেস ২০২০’ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (বিডা) বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের করবী মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান, প্রধান সমন্বয়ক (এসডিজি) আবুল কালাম আজাদ, বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বক্তব্য দেন। এ ছাড়া লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মোহাম্মদ শহিদুল হক ও অর্থ সচিব মো. আবদুর রউফ তালুকদার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

একটি দেশের অর্থ-বাণিজ্যের পরিবেশ দশটি মাপকাঠিতে তুলনা করে এই সূচক তৈরি করা হয়। এই দশটি মাপকাঠি হলোÑ নতুন ব্যবসা শুরু করা, অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি পাওয়া, বিদ্যুৎ সুবিধা, সম্পত্তির নিবন্ধন, ঋণ পাওয়ার সুযোগ, সংখ্যালঘু বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, কর পরিশোধ, বৈদেশিক বাণিজ্য, চুক্তি বাস্তবায়ন ও দেউলিয়া হওয়া ব্যবসার উন্নয়ন।

বাংলাদেশের অবস্থা : বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দশ মাপকাঠির মধ্যে তিনটিতে বাংলাদেশের স্কোর গতবারের চেয়ে বেড়েছে। চারটিতে এবারের স্কোর গতবারের সমান। আগের চেয়ে অবনতি হয়েছে দেউলিয়া হওয়া ব্যবসার উন্নয়ন ঘটানোর ক্ষেত্রে। বিশ্বব্যাংক বলছে, উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা শুরু করা, বিদ্যুৎ সংযোগ ও ঋণপ্রাপ্তিকে সহজ করেছে বাংলাদেশ। নতুন কোম্পানি নিবন্ধনের খরচ কমেছে। ডিজিটাল সনদ ফি বাতিল করা হয়েছে। ঢাকায় নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রে জামানত কমানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিআইবি তথ্য সংরক্ষণের আওতা বাড়িয়েছে। যেকোনো অঙ্কের ঋণের উপাত্ত সংরক্ষণ করছে।

স্কোর : প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০০ পয়েন্টের মধ্যে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের স্কোর ৪৫। তবে খাতভিত্তিক হিসাবে নতুন ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে ১০০ পয়েন্টের মধ্যে বাংলাদেশের অর্জন ৮২ দশমিক ৪ পয়েন্ট। নতুন ব্যবসা শুরু করতে এখানে ৯টি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এতে সময় লাগে গড়ে সাড়ে ১৯ দিন। সব মিলিয়ে এ সূচকে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩১তম। নির্মাণকাজের অনুমোদনের ক্ষেত্রে স্কোর ৬১ দশমিক ১। এখানে পার হতে হয় ১৬টি ধাপ। সময় লাগে ২৭৪ দিন। তবে বিদ্যুতের নতুন সংযোগে বাংলাদেশের অবস্থান কিছুটা ভালো হলেও তা আশানুরূপ নয়। এতে বলা হয়েছে, ১০০ স্কোরের মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগে বাংলাদেশের অর্জন মাত্র ৩৪ দশমিক ৯ পয়েন্ট। এ কাজে ৯টি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। সময় লাগে ১২৫ দিন। জমির নিবন্ধনে সময় লাগে ২৭১ দিন। এ ছাড়াও চুক্তি বাস্তবায়নে সময় লাগে প্রায় চার বছর (১৪৪২ দিন)।

ডাবল ডিজিটে পৌঁছার আশা : সংবাদ সম্মেলনে সালমান এফ রহমান বলেন, ‘এবার আমাদের অবস্থান ১৬৮তম। এবার আমরা আগের চেয়ে আট ধাপ এগিয়েছি। আগে কখনো এত পয়েন্ট জাম্প আমরা করতে পারিনি। তবে এই অগ্রগতিকে অনেক বড় অর্জন বলে মনে করব না। আমাদের লক্ষ্য আগামী বছর উল্লেখযোগ্য একটা অগ্রগতি। আমরা টার্গেট করব যেন ডাবল ডিজিটে আসতে পারি।’

সালমান এফ রহমান আরও বলেন, ‘গত তিন চার বছর ধরেই এ নিয়ে কাজ হচ্ছিল। কিন্তু আমাদের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হচ্ছিল না। নিয়মটা হলো, এপ্রিল মাসের মধ্যে প্রতিবছরের যা রিফর্মস হয়, সেই রিফর্মসের ওপর ভিত্তি করে তারা অক্টোবরে ফল দেয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বিশ্বব্যাংক যখন র‌্যাংকিং শুরু করে, বাংলাদেশ খারাপ অবস্থানে ছিল। সর্বশেষ আমাদের অবস্থান ছিল ১৭৬তম। তার আগে আরও খারাপ ছিল।’

প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা আশা প্রকাশ করেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা আরও বেশি ছিল। কারণ, আমরা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অনেক পরিবর্তন এনেছি। তবে এই পরিবর্তনের সুফল মাঠপর্যায়ে পুরোপুরি যায়নি, কারণ মধ্যম ও নিচু সারির সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই পরিবর্তন সম্পর্কে অবহিত হননি অথবা মানিয়ে নিতে পারেননি। আমরা এখন এই পরিবর্তনের প্রায়োগিক বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছি। যাতে সব উপকারভোগী বাস্তবিক অর্থেই এই পরিবর্তনের সুফল পান ও আমরাও সূচকে পূর্ণ নম্বর পাই। এ ছাড়া আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানকে ডাবল ডিজিটে উন্নীত করা।’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রতিবেদনে ১০টি মানদণ্ডের মধ্যে অন্তত ৬০টি ইস্যুতে রিপোর্ট করতে হয়। প্রতিটিতেই কিন্তু গুরুত্ব দিতে হবে। সব ক্ষেত্রেই উন্নতি করার সুযোগ রয়েছে। সবাই মিলে আন্তরিকভাবে কাজ করে গেলে আরও ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।

দুই বছরের মধ্যে ডাবল ডিজিটের আশা পূরণ সম্ভব কি নাÑ জানতে চাইলে বিশ্ব ব্যাংকের পরামর্শক ও অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা সম্ভব। তার জন্য ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম দ্রæততার সঙ্গে বাস্তবায়ন করে মাঠ পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে। এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। তবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অটোমেশন ডিজিটালাইজেশনের যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নে আরও আন্তরিক হতে হবে।’

শীর্ষ ১০ দেশ : প্রতিবেদন অনুযায়ী এবারও সহজে ব্যবসা পরিচালনায় বিনিয়োগকারীদের পছন্দে শীর্ষে রয়েছে নিউজিল্যান্ড। এরপর রয়েছে সিঙ্গাপুর, হংকং, ডেনমার্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জর্জিয়া, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে ও সুইডেন। গত বছরের চেয়ে এবার যে ১০টি দেশ সবচেয়ে ভালো করেছে, সেগুলো হলোÑ সৌদি আরব, জর্ডান, টোগো, বাহরাইন, তাজিকিস্তান, পাকিস্তান, কুয়েত, চীন, ভারত ও নাইজেরিয়া।

দক্ষিণ এশীয়া : দক্ষিণ এশিয়ায় বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের জন্য পছন্দের শীর্ষে রয়েছে ভারত। এবার দেশটির অবস্থান ৭৭ থেকে কমে ৬৩তে নেমে এসেছে। এ ছাড়াও পাকিস্তান ২৮ ধাপ কমে ১৩৬ থেকে ১০৮, নেপাল ১১০ থেকে ৯৪ ও ভুটানের অবস্থান ৮৯।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত