পাবিপ্রবিতে শিক্ষক নিয়োগে ভিসির ঘুষবাণিজ্য ফাঁস

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০১৯, ০১:৪৭ এএম

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম রোস্তম আলীর বিরুদ্ধে ৮ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েও ইতিহাস বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে উপাচার্য বলেছেন, নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পেরে কতিপয় প্রার্থী তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন।

এদিকে উপাচার্যের সঙ্গে চাকরিপ্রার্থী মনিরুল ইসলামের কথোপকথনের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে গতকাল বৃহস্পতিবার এ নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট

সূত্রে জানা যায়, ইতিহাস বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ২৮ জন অংশ নেন। লিখিত পরীক্ষা শেষে শিবু চন্দ্র অধিকারী, শরিফুল ইসলাম, তানভীর আহমেদ, রাজীবুল ইসলাম, সালাহউদ্দিন ও নুরুল হামিদকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করে তালিকা প্রকাশ করা হয়। তারা সবাই রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী।

নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মনিরুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ ইতিহাস বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিলে সব শর্ত পূরণ করে তিনি আবেদন করেন। চলতি বছরের জুনে এ নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত হলে পরিচিত এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে উপাচার্য এম রোস্তম আলীর সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। সে সময় দু’দফা সাক্ষাতের পর উপাচার্য শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে ১২ লাখ টাকা চান। নিয়োগ পরীক্ষার আগেই জমি বিক্রি করে ঢাকার ফার্মগেটে পাবিপ্রবির রেস্টহাউজে গিয়ে দু’দফায় প্রথমে ৫ ও পরে ৩ লাখ টাকা দেই।

তিনি বলেন, ‘বুধবার পরীক্ষার আগেও উপাচার্যের সঙ্গে ফোনে কথা হয়। তিনি আশ্বাস দিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে বলেন। কিন্তু আজ (গতকাল) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পূর্বনির্ধারিত কয়েক প্রার্থীর প্রতি বিশেষ সুবিধা ও তাদের গতিবিধি সন্দেহ হয়। পরে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলে তালিকাতে আমার নাম পাইনি। ওই প্রার্থীদেরই নাম পেয়েছি।’

মনিরুল আরও বলেন, ‘এরপর উপাচার্য স্যারকে ফোন দিয়ে আমাকে নিয়োগ না দিলে টাকা ফেরত চাই। জবাবে তিনি আমাকে র‌্যাব দিয়ে ধরিয়ে শায়েস্তা করার হুমকি দেন।’

নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক আইরিন আক্তারের অভিযোগ, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ১০ প্রার্থী নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিলেও কেউই উত্তীর্ণ হননি। নিয়োগ বোর্ডে থাকা শিক্ষকরা সবাই রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শরিফুল ইসলাম পাবিপ্রবির উপ-উপাচার্য আনোয়ারুল ইসলামের আপন ভাগ্নি জামাই। নীতিমালা ও নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে নিজে নিয়োগ বোর্ডে ছিলেন উপ-উপাচার্য।’

পরীক্ষায় অংশ নেওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রার্থী অভিযোগ করেন, উপাচার্য এম রোস্তম আলী, উপ-উপাচার্য আনোয়ারুল ইসলাম, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ এবং ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম নির্দিষ্ট প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়ার শর্তে তাদের থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ নিয়েছেন। সে অনুযায়ী নিজেদের ঘনিষ্ঠ শিক্ষকদের দিয়ে নিয়োগ বোর্ড সাজিয়ে পূর্বনির্ধারিত প্রার্থীদের উত্তীর্ণ দেখিয়েছেন। কিন্তু ঘুষ কেলেঙ্কারি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বেকাদায় পড়ে কর্র্তৃপক্ষ বলছে, মৌখিক পরীক্ষার জন্য কেউ উত্তীর্ণ হয়নি।

এ বিষয়ে নিয়োগ বোর্ডের সদস্য এবং কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. হাবিবুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিয়োগ বোর্ড নীতিমালা মেনেই সব প্রক্রিয়া শেষ করেছে। লিখিত পরীক্ষার ফলাফলে ৬ জনকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হলেও মৌখিক পরীক্ষায় বোর্ড সন্তুষ্ট না হওয়ায় কাউকেই চ‚ড়ান্ত উত্তীর্ণ ঘোষণা করেনি। পরে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়েছে।’

অভিযোগের বিষয়ে পাবিপ্রবি উপ-উপাচার্য ড. আনোয়ারুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

তবে ঘুষ নেওয়া ও নিয়োগ পরীক্ষায় অস্বচ্ছতার সব অভিযোগ অস্বীকার করে উপাচার্য ড. এম রোস্তম আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিয়োগ পরীক্ষায় ফেল করে কতিপয় প্রার্থী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত করার ষড়যন্ত্র করছেন।’ মনিরুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে নিয়োগ পরীক্ষার আগে একাধিকবার কথা ও সাক্ষাতের কথা স্বীকার করলেও কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। চাকরিপ্রার্থীর সঙ্গে এত যোগাযোগ কেন করেছেনÑ এমন প্রশ্নে উপাচার্য বলেন, ‘মনিরুল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সুপারিশ জানাতে আমার সঙ্গে বারবার দেখা করেছিল।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত