সোনাগাজী ও ফেনীর সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা জল্পনা-কল্পনা থাকলেও রেহাই পাননি মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত হত্যায় জড়িত আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন ও মাকসুদ আলম। গতকাল বৃহস্পতিবার ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ মামলায় অভিযুক্ত এই দুই আওয়ামী লীগ নেতাসহ ১৬ আসামিকেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি রুহুল আমিন হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকারীদের বাঁচানোর চেষ্টা করেন। আর সোনাগাজী পৌরসভার সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১০ হাজার টাকা জোগান ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে প্রচার করেন।
গত ৬ এপ্রিল নুসরাতের ওপর নৃশংস হামলার ঘটনার পর আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন ও কাউন্সিলর মাকসুদ আলমের নাম নানাভাবে উঠে আসে। রুহুল আমিন গ্রেপ্তারের এক দিন আগে ১৮ এপ্রিল আওয়ামী লীগের একটি সভায় জেলার শীর্ষস্থানীয় নেতারা রুহুল আমিন নির্দোষ দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তার সুনাম ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। পরদিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সোনাগাজীর তাকিয়া বাজারের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। পরে ২৯ মে রুহুল আমিনসহ ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড চেয়ে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
এরপর গত ৩০ মে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুর রহমান বিকম ও সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারী স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে রুহুল আমিন কারাগারে থাকায় সহ-সভাপতি অধ্যাপক মো. মফিজুল হককে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করার কথা জানানো হয়।
রুহুল আমিন গ্রেপ্তারের পর উপজেলা আওয়ামী লীগ ও দলীয় অঙ্গসংগঠনের ব্যানারে তার মুক্তির দাবিতে সোনাগাজী ও ফেনীতে পোস্টার এবং ব্যানার সাঁটানো হয়। গত ২০ জুন রাত থেকে ফেনীর আদালতপাড়া এবং সোনাগাজী পৌরসভাসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি সংবলিত রুহুলের মুক্তির দাবির পোস্টারে ছেয়ে যায়। ফেনী সদর ও ফেনী পৌর আওয়ামী লীগের সম্মেলনকে ঘিরে ৪ আগস্ট পুনরায় ফেনী শহরের বিভিন্ন সড়কে ফেস্টুন সাঁটায় রুহুল আমিনের সহযোগীরা। পরদিন পত্রিকায় সংবাদ ছাপা হলে রাতের আঁধারেই ওই ফেস্টুন সরিয়ে ফেলা হয়।
বিভিন্ন সময় এ মামলায় রুহুলের লঘু শাস্তি হবে ভেবে সমর্থকরা নানাভাবে আস্ফালন করতেন। মামলার বিচারকাজ পরিচালনার সময় আদালত প্রাঙ্গণেও প্রত্যেক দিন বিপুলসংখ্যক রুহুল সমর্থকের আনাগোনা ছিল। এছাড়া তারা রুহুলের শাস্তি হবে না জানিয়ে স্থানীয়দের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন বলে অনেকের অভিযোগ।
নুসরাতের অগ্নিদগ্ধের ঘটনার আরেক আওয়ামী লীগ নেতা সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম পালিয়ে যান। পরে গত ১১ এপ্রিল রাজধানী ঢাকার একটি আবাসিক হোটেল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। পরদিন শুক্রবার তাকে দল থেকে অব্যাহতি দেয় জেলা আওয়ামী লীগ।
এদিকে নুসরাত হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের অনেকেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকায় এ নিয়ে মুখ খুলতে চান না কেউ। তবে নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে দলটির জেলা ও সোনাগাজী উপজেলা পর্যায়ের একাধিক শীর্ষ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নুসরাত হত্যা মামলার রায়ে গোটা দেশবাসী সন্তুষ্ট। এ রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে অপরাধী যত বড় শক্তিশালীই হোক না কেন, এ সরকারের আমলে পার পাওয়া যাবে না।
তবে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল রায়ে সন্তোষের পাশাপাশি হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিচারহীন সংস্কৃতির মধ্যে নিম্ন আদালতের এই রায়কে স্বাগত জানাই। তবে এই রায় যেন দ্রুত কার্যকর হয়। বিশ্বজিৎ হত্যার রায়ের মতো উচ্চ আদালতে যদি খুনিরা পার পেয়ে যায় তখন এই সন্তোষের কোনো লাভ নেই। এই রায় যেন হাইকোর্টেও বহাল থাকে।’
