ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা মামলার রায় অতি দ্রুত কার্যকর দেখতে চান পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা। এজন্য তারা বিচার কার্যক্রমের মতো রায় কার্যকরের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতা কামনা করেছেন। এছাড়া নুসরাতের গায়ে আগুন ও মৃত্যুপরবর্তী সময়ে তাদেরকে সার্বিকভাবে সহযোগিতার জন্য নুসরাতের মা-বাবা আরেকবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে চান। গতকাল শুক্রবার সোনাগাজীর বাড়িতে বসে নুসরাতের বাবা এ কে এম মুসা মানিক এবং মা শিরিন আক্তার দেশ রূপান্তরকে তাদের এই ইচ্ছার কথা জানান।
গতকাল সকালে নুসরাতদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় নুসরাতের মা শিরিন আক্তারকে সান্ত্বনা দিতে আত্মীয়-স্বজনসহ এলাকাবাসী বাড়িতে ভিড় জমাচ্ছেন। শিরিন আক্তার নুসরাতের শয়নকক্ষের খাটে বসে মেয়ের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন জিনিস নিয়ে ক্ষণে ক্ষণে বিলাপ করছেন। কখনোবা কান্নায় ভেঙে পড়ে কিছু সময়ের জন্য চেতনা হারিয়ে ফেলছেন। পরে কিছুটা ধাতস্থ হয়ে তিনি নুসরাত হত্যা মামলার ১৬ আসামিরই মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার ঘটনার পর থেকে রায় পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী প্রশাসনিক নির্দেশনা ও সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে গেছেন। এজন্য তার প্রতি আমরা অশেষ কৃতজ্ঞ। এর আগে একবার আমরা তার সঙ্গে দেখা করেছি। তবে আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আরেকবার দেখা করে তাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই।’
নাতনিকে পুড়িয়ে হত্যা মামলার সব আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় শোনার পর থেকেই ক্ষণে ক্ষণে কান্নাকাটি করছেন নুসরাতের দাদা বয়োবৃদ্ধ মাওলানা মোশাররফ হোসেন (৯০)। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নুসরাত আমার কলিজার ধন ছিল। শরীরের মাংস নিয়ে সে কবরে যেতে পারেনি। মৃত্যুর আগে তার পোড়া যন্ত্রণা সে আর একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কেউ বুঝবে না। সবাই আমাকে বলছে খুনিদের ফাঁসি হয়েছে। আমি খুশি হয়েছি। আমি তো দুনিয়া ছেড়ে চলে যাব। আমার ছেলে, ছেলের বউ ও নাতিদের কে দেখবে? তবে আমি মৃত্যুর আগে নুসরাতের খুনিদের ফাঁসি দেখে যেতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আল্লাহর কাছে বিচার দিয়েছিলাম। আজ আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি। এজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পুলিশ, পিবিআই, সাংবাদিক ও বিচারককে ধন্যবাদ জানাই।’
গতকাল জুমার নামাজের পর প্রিয় বোনের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে কবর জিয়ারত করেন নুসরাত হত্যা মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান নোমান। তিনি জানান, আদালতের রায়ের পর পর আসামিদের আপত্তিকর মন্তব্য আর হুমকিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন তারা। তবে ফেনীর পুলিশ সুপার তাদের বাড়িতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করায় এখন আতঙ্ক কমেছে। তবে তা কতদিনের জন্য তা জানেন না নোমান।
তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসামিরা যাতে উচ্চ আদালতে আপিলের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড থেকে কোনোভাবে নিস্তার না পায় সেটা আশা করছি। এছাড়া মামলার রায় যেন দ্রুত কার্যকর হয় সেজন্য প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতাও কামনা করছি।’
নুসরাতের বাবা এ কে এম মুসা মানিক নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার একটি মসজিদের খতিব এবং একটি ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষক। তিনি শুক্রবার সকালে নুসরাতের কবর জিয়ারত করে মসজিদে জুমার নামাজ পড়াতে কোম্পানীগঞ্জ চলে যান।
বোনের হত্যাকারীদের ফাঁসির রায়ে সন্তুষ্ট কি-না জানতে চাইলে নুসরাতের ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান বলেন, ‘আপুকে হারিয়ে যতটা কষ্ট পেয়েছি, এই রায়ের মাধ্যমে তার কিছুটা হলেও লাঘব হয়েছে। আমরা রায়ে শতভাগ সন্তুষ্ট। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। রায় দ্রুত কার্যকর করে যেন মানুষরূপী হায়েনাদের ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।’
এদিকে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে নুসরাতের মামলার রায়ের পর তাদের বাড়িতে ডিশ লাইনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় দুর্বৃত্তরা। পরে সোনাগাজী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মুহাম্মদ খালেদ হোসেন কেব্ল অপারেটরকে ফোন করে বিকেল ৩টার দিকে সংযোগ লাগিয়ে দেন।
নুসরাত হত্যা মামলায় গত বৃহস্পতিবার ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। একই সঙ্গে প্রত্যেক আসামির কাছ থেকে ১ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করে নুসরাতের পরিবারকে দিতে বলা হয়েছে।
