আরব বিশ্বে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের প্রেক্ষাপট

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০১৯, ১১:১৭ পিএম

সাম্প্রতিক সময়ে আরব বিশ্বের অনেকগুলো দেশেই জনবিক্ষোভ পরিলক্ষিত হচ্ছে। লেবানন, ইরাক, মিসর, জর্ডান, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, সুদান, মরক্কোসহ অনেক দেশই একের পর এক বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠছে। এসব দেশের জনগণ মূলত নব্য উদারতাবাদী অর্থনীতি, দারিদ্র্য আর নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। জনতার এই সংগ্রামের মূল লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক একনায়কতন্ত্র ও তার থেকে সৃষ্ট দারিদ্র্য থেকে জনগণকে মুক্ত করা। এই গণরোষের প্রধান লক্ষ্যবস্তু রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজাতরা, যারা দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবস্থাকে আগলে রেখেছেন এবং এ থেকে লাভবান হচ্ছেন। আরব বিশ্বের অবস্থা কেন এত শোচনীয় হলো? বিশেষ করে ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ এ যে উর্বর সময় ছিল, তা থেকে কেন পশ্চাদপসরণ ঘটল? কেন অর্থনীতির সূচকগুলো নিম্নগামী হলো?

নব্য উদারতাবাদের জেঁকে বসা

এই শতাব্দীর ১৯৪০ এর দশক থেকে আরব বিশ্বের দেশগুলো ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করছিল।  এই সময়কাল থেকে ১৯৭০ এর দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত এই বিশ্বের অনেক দেশই স্বাধীনতা পরবর্তী পুনর্গঠনে ব্যস্ত ছিল। এই সময়কালকে যদি আরব বিশ্বের প্রথমার্ধ ধরা হয়, তাহলে এই সময়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা যাবে, তা প্রগতিশীল আদর্শ এবং জাতীয় স্বাধীনতার নীতি দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। আর ১৯৮০ এর দশক থেকে এখন পর্যন্ত যে নীতি তাদের পরিচালিত করছে, তাহলো নব্য উদারতাবাদ। ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ এর দশক পর্যন্ত আরবের রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিল ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্তি এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। ওই সময় মিসরের সাবেক রাষ্ট্রপতি গামাল আবদেল নাসেরের নেতৃত্ব, সিরিয়া এবং ইরাকে একই ধরনের শাসন কাঠামো, আলজেরিয়া থেকে ফিলিস্তিন হয়ে ওমান পর্যন্ত বিস্তৃত ঔপনিবেশিকতাবিরোধী সংগ্রাম আরব বিশ্বে নতুন যুগের সূচনা করেছিল। অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের লক্ষ্যে তখন সম্পদের আংশিক পুনর্বণ্টন সংঘটিত হয়েছিল এবং আয় বৈষম্য নিরসন ও দারিদ্র্য বিমোচনের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্র পরিচালিত উন্নয়ন নীতি পরিচালিত ছিল। কিন্তু ১৯৬৭ এর যুদ্ধের পর এই হাওয়া পরিবর্তিত হতে থাকে এবং ১৯৭০ এর দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। জাতীয় স্বাধীনতার নীতির পরিবর্তে তখন নব্য উদারতাবাদ জেঁকে বসে এবং রাজনৈতিক একনায়কতন্ত্র কায়েম করে এবং অর্থনৈতিক ও সামরিক বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসে।

ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ

উদারতাবাদের প্রকৃত অর্থ হওয়া উচিত ব্যক্তিস্বাধীনতার উন্মেষ, আঞ্চলিক শান্তি এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের সমৃদ্ধি। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাবে, যা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করবে।  কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য নব্য-উদারতাবাদীদের মতো আরব বিশ্বের নব্য-উদারতাবাদীরাও অর্থনৈতিক গণতন্ত্র ধ্বংস করে দিয়েছে। ১৯৫৩ সালে ইরাকে মোসাদ্দেকবিরোধী অভ্যুত্থানের প্রথম সূচনা ছিল। মিসরের নাসেরকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও ১৯৭০ সালে তার মৃত্যু স্বাধীনতা এবং জাতীয় মুক্তির যুগের পরিসমাপ্তি ঘটায়। ১৯৫০, ’৬০ এবং ’৭০ এর দশকে আরবে যে নিজস্ব ধারার সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল, তাতে শুধু অর্থনৈতিক সূচকগুলোর ঊর্র্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হয়নি, সাধারণ মানুষের জীবনমানও উন্নত হয়েছিল। স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য ছিল, জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছিল ও সমানুপাতিক অর্থনৈতিক বণ্টনের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছিল। ভ‚মি সংস্কার কর্মসূচি এবং ভারী শিল্পে বিনিয়োগ অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছিল। কিন্তু ১৯৭০ এর মধ্যভাগ এবং ১৯৮০ এর শুরু থেকে আরব বিশ্বে যে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে তা জনগণের এই সব উন্নয়নকে শুধু ভ‚লুণ্ঠিতই করেনি তার গণতান্ত্রিক অধিকার পর্যন্ত খর্ব করে। জনগণের ব্যক্তিস্বাধীনতা বিপর্যস্ত হয়।

যুদ্ধ এবং শান্তি

১৯৭০ এর মধ্যভাগ এবং ১৯৮০ এর শুরু থেকে যে নব্য উদারতাবাদের সূচনা হলো তা শুধু অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটায়নি, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও ঘটিয়েছিল। ‘ক্যাম্প ডেভিড’ চুক্তি থেকে এই পরিবর্তন সূচিত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো শক্তি যারা জাতীয় স্বাধীনতার প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তিকে সহায়তা যোগাত, তারাও এই সময় থেকে ক্ষীয়মান হতে থাকে। তখন স্থানীয় অর্থনৈতিক অভিজাতদের উত্থান ঘটে। তারা তাদের সাম্রাজ্যবাদী মদদদাতাদের অভীপ্সায় নব্য উদারতাবাদী অর্থনীতি গ্রহণ করে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের সময় নব্য উদারতাবাদীরা তর্ক করে যে যুদ্ধে জড়িয়ে রাষ্ট্র তার সমস্ত সম্পদ নিঃশেষিত করছে। একমাত্র শান্তিই সকল মিসরীয় তথা সকল আরবকে সমৃদ্ধ করবে।  উদারতাবাদী পরিবর্তনের অন্যতম প্রচারক মিসরীয় মুসলিম ব্রাদারহুড নাসেরপন্থি ধর্মনিরপক্ষ আরব জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। ১৯৮০ এর দশকে মিসরীয় শাসন কাঠামো এবং মিসরীয় উদারতাবাদ এক নব্য আরব বুদ্ধিজীবীদের জন্ম দেয়। ফিলিস্তিন এবং জর্ডানের নব্য উদারতাবাদীরাও মিসরের পথে হাঁটা শুরু করে। আস্তে আস্তে আরব বিশ্বের অন্যরাও একই পথের সহযাত্রী হতে থাকে।  যুদ্ধ থেকে শান্তিতে আসা আরব বিশ্বে যখন থেকে নব্য উদারতাবাদীরা ক্ষমতায় তখন থেকে ধনীদের সম্পদ সীমাহীন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সাধারণ জনগণের নাভিশ্বাস উঠেছে।

দুর্নীতির বাড়বাড়ন্ত

অর্থনৈতিকভাবে এবং রাজনৈতিকভাবে গণতন্ত্রকে সংহত করার পরিবর্তে নব্য উদারতাবাদ আরব বিশ্বে সামষ্টিক উন্নয়নের পরিবর্তে শুধু কিছু ব্যক্তির উন্নয়ন ঘটিয়েছে। তারা রাজনৈতিক গণতন্ত্রের কবর রচনা করে শুধু ক্ষান্ত হয়নি, সীমাহীনভাবে দুর্নীতির পরিসর বৃদ্ধি করেছে। অবশ্য প্রভাত পট্টনায়েকের মতো অর্থনীতিবিদরা বলছেন যে, নব্য উদারতাবাদের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো দুর্নীতির বাড়বাড়ন্ত। এটি আরব বিশ্বে যথার্থভাবেই প্রমাণিত।

আরব বিশ্বে একসময় যে নিজস্ব ধারার সমাজতন্ত্র গড়ে উঠেছিল, তাতে অনেকটা কর্র্তৃত্ববাদের প্রভাব থাকলেও, তা মানুষকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিয়েছিল, দারিদ্র্যমুক্ত করতে পেরেছিল, নিরক্ষরতা দূরীকরণ করেছিল, স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা দিয়েছিল। কিন্তু এর পরিবর্তে যে নব্য উদারতাবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা শুধু আরব সমাজতন্ত্রকেই ধ্বংস করেনি, তার যে মানব উন্নয়নের গতিমুখ ছিল তাকেও শেষ করে দিয়েছে।  আর সে কারণেই আরব বিশ্ব আজ ফুঁসছে। কিন্তু সঠিক রাজনৈতিক দিশা না থাকায় সে বিক্ষোভগুলো খুব একটা মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

লেখক : সাংবাদিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত