বিএনপির আশঙ্কা আমলে নিচ্ছে না বিএসএমএমইউ

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০১৯, ০৩:০৫ এএম

কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শরীরিক অবস্থা সম্পর্কে দলটির শীর্ষ নেতা ও স্বজনদের দাবি নাকচ করে দিয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের কতৃ©পক্ষ। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে মাহবুবুল হক গতকাল সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নিয়ে তার দল ও স্বজনরা যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আমরা সে আশঙ্কা দেখছি না। বরং হাসপাতালে ভর্তির পর থেকে গত সাত মাসে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ‘স্থিতিশীল’ রয়েছে এবং ‘কোনো কোনো ক্ষেত্রে উন্নতি’ হয়েছে। গতকাল বিএসএমএমইউর শহীদ ডা. মিল্টন হলে হাসপাতাল কতৃ©পক্ষ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে আসার আগে হাসপাতাল পরিচালকের কক্ষে পরিচালকসহ মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা আধঘণ্টা বৈঠক করেন।

‘খালেদা জিয়ার জীবন অত্যন্ত সংকটাপন্ন এবং তার ফিরে না আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে’– বিএনপি নেতাদের এমন আশঙ্কার জবাবে তার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক জিলন মিয়া সরকার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমাদের মধ্যে এমন কোনো আশঙ্কা নেই। তবে জীবন-মৃত্যু আল্লাহর হাতে। তাকে নিয়ম মেনে দেখা হচ্ছে। শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখি। উনি সিনিয়র সিটিজেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পরিচয় তো আছেই। আমরা সন্তুষ্ট। আমাদের চিকিৎসায় খালেদা জিয়াও সন্তুষ্ট।’

এদিকে বিকেলে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করে বলেন, বিএসএমএমইউ পরিচালক সরকারের শেখানো কথা বলছেন। তার বক্তব্যে এটি সুস্পষ্ট, ৭৫ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে কারাবন্দি রেখে বিনা চিকিৎসায় তিলে তিলে নিঃশেষ করার মহা আয়োজন চলছে। প্রধানমন্ত্রীর মনোভাবই পরিচালকের বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় গত বছর ৮ ফেব্রম্নয়ারি সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে যান বিএনপি চেয়ারপারসন। এরপর সর্বশেষ গত পহেলা এপ্রিল বিএসএমএমইউতে আনা হয়। তাকে হাসপাতালের ৬২১ নম্বর কেবিনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় গত ২৫ অক্টোবর খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের পর তার বড় বোন সেলিমা ইসলাম দাবি করেন, ‘খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটেছে। এখন উঠে বসতে পর্যন্ত পারছে না। কারও সাহায্য ছাড়া বসতে পারে না। তার হাত বেঁকে গেছে, কথা বলতেও তার কষ্ট হচ্ছে। ওজন কমে গেছে। সবকিছু মিলিয়ে তার পঙ্গু হওয়ার মতো অবস্থা হয়ে গেছে।’ এরপর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘খালেদা জিয়ার অবস্থা সংকটাপন্ন। তিনি সুস্থ অবস্থায় ফিরে আসবেন কি না, তা নিয়েই শঙ্কা দেখা দিয়েছে।’

বিএনপি ও পরিবারের এমন বক্তব্যের পর গতকাল বিএসএমএমইউর পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতালটির পরিচালক মাহবুবুল হক পাল্টা দাবি করে বলেন, ‘খালেদা জিয়া যখন হাসপাতালে ভর্তি হন তখন তার শারীরিক সমস্যার মধ্যে ছিল আনকন্ট্রোলড ডায়াবেটিস, ক্রনিক রিউমেটিক আর্থ্রাইটিস, দুর্বলতা এবং দাঁতের সমস্যা। তখন উনার ভর্তির সঙ্গে সঙ্গেই একটা মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। উনার শারীরিক অবস্থা প্রতিনিয়ত তদারকি করা হয়। এ কারণে গত সাত মাসে খালেদা জিয়ার অবস্থার কিছু কিছু উন্নতি হয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থিতিশীল রয়েছে। কোনো অবস্থাতেই খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়নি।’

তিনি অভিযোগ করে বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসার ক্ষেত্রে বরং অসহযোগিতা করছেন। তিনি বলেন, হাসপাতালের অধ্যাপকরা স্বাভাবিক সময়ে গিয়ে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা তার সঙ্গে কথা বলার অনুমতি পান না। আমাদের হাসপাতালের অফিস সময় ২টা পর্যন্ত। প্রায় সময়ই খালেদা জিয়া অনুমতি দেন দেড়টার পর। নির্ধারিত সময়ে তার দেখা পাওয়া যায় না। এমনকি অনেকবার চিকিৎসক সাড়ে ৪টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে ফিরে এসেছেন। আর্থ্রারাইটিসের চিকিৎসার একটি ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য খালেদা জিয়ার সম্মতি না পাওয়ায় আগের নিয়মে চিকিৎসা চালাতে হচ্ছে বলেও দাবি করেন হাসপাতালের পরিচালক।

সংবাদ সম্মেলনে মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক জিলন মিয়া সরকার সাংবাদিকদের বলেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার উন্নতির জন্য আমরা তাকে তিনটি ভ্যাকসিন দিতে চাচ্ছি। তা হলো– ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া এবং ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য একটি করে। কিন্তু খালেদা জিয়া তা নিতে চাচ্ছেন না। তবে কাউন্সেলিং করা হচ্ছে তাকে রাজি করানোর জন্য। তিনি বলেন, প্রতিদিন রক্ত পরীক্ষা করা হয় দুবার। আর তাকে দিনে দুবার ইনসুলিন দেওয়া হয়। মেডিকেল বোর্ড তার চিকিৎসার কার্যক্রম তদারকি করে।

সংবাদ সম্মেলনে বিএসএমএমইউর উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শাহানা আক্তার বলেন, খালেদা জিয়া ২৮ বছর ধরে বাতজ¦রে ভুগছেন। এ রোগের অত্যাধুনিক চিকিৎসা এ দেশেও সম্ভব। তিনি যদি ভ্যাকসিনে সম্মতি না দেন তাহলে আগের যে ব্যবস্থাপত্র আছে তাতে এর চেয়ে বেশি উন্নতির আশা চিকিৎসকরা করেন না। তবে এ চিকিৎসক আশা করছেন ইনসুলিন নেওয়ার ব্যাপারে খালেদা জিয়া যেমন রাজি হয়েছেন, তেমনি ভ্যাকসিন নিতেও রাজি হবেন। তার চিকিৎসার কোনো ত্রুটি হচ্ছে না।

‘হাসপাতালে থেকে আর কতদিন খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা নিতে হবে’– সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মেডিকেল বোর্ডের এ সদস্য জানান, খালেদা জিয়া ভ্যাকসিন নিতে সম্মতি দিলে হাসপাতালে থাকার দরকার আছে। যদি না দেন তাহলে বর্তমান চিকিৎসা বাড়িতে বা অন্য জায়গায় বসেও সম্ভব। তাছাড়া খালেদা জিয়ার হাসপাতাল থেকে কারাগারে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ আইনি ব্যাপার বলে মন্তব্য করে কর্তৃপক্ষ।

এ সময় হাসপাতালের অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. ফরিদউদ্দিনসহ খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

হাসপাতাল পরিচালক সরকারের ভাষায় কথা বলেছেন, রিজভী : বিকেলে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করে বলেছেন, বিএসএমএমইউ পরিচালক সরকারের শেখানো কথাই বলছেন। তার বক্তব্যে এটি সুস্পষ্ট যে, ৭৫ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে কারাবন্দি রেখে বিনা চিকিৎসায় তিলে তিলে নিঃশেষ করার মহা আয়োজন চলছে। প্রধানমন্ত্রীর মনোভাবই পরিচালকের বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে। তার বক্তব্যের অনেকাংশই এখতিয়ারবহিভূ©ত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতোই পরিচালকের বক্তব্যও অযাচিত, অগ্রহণযোগ্য, অসৌজন্যমূলক, পূর্বকল্পিত, বিভ্রািন্ত সৃষ্টি ও কুৎসামূলক।

তিনি বলেন, খালেদা জিয়া চিকিৎসকদের সহযোগিতা করেন না বলে পরিচালক যে বক্তব্য রেখেছেন তার সঙ্গে মেডিকেল বোর্ডের প্রধানের বক্তব্যের মিল নেই। মেডিকেল বোর্ডের প্রধান বলেছেন, ‘খালেদা জিয়া চিকিৎসকদের যথেষ্ট সহযোগিতা করেন এবং অত্যন্ত বিনয়ী ব্যবহার করেন। তিনি হাঁটতে পারেন না, অন্যজনের সহায়তায় তাকে হাঁটতে হয়। তার আরও চিকিৎসা প্রয়োজন। একজন অসুস্থ মানুষের লাইফস্টাইল অনেক রকম হয়, এটা আমি স্বাভাবিক মনে করি। এসব বিষয়গুলো সম্মান করেই আমাদের চিকিৎসা করতে হয়। ম্যাডাম আমাদের সঙ্গে সবসময় হাসিখুশি কথা বলেন। কিন্তু চিকিৎসক হিসেবে নানা অসুবিধার কারণে আমাদেরও প্রতিদিন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হয় না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত