মূল হোতা অধরা, ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় পরিবার

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০১৯, ০৩:৪১ এএম

কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে চলন্ত বাসে নার্স শাহীনুর আক্তার তানিয়াকে দলবেঁধে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো ধরা পড়েনি এ ঘটনার মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত বোরহান উদ্দিনসহ অন্যতম দুই আসামি। এতে করে ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় ভুগছেন তানিয়ার পরিবারের সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, তানিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী বোরহান এবং ‘স্বর্ণলতা’ পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পারভেজ সরকার পাভেল প্রভাবশালী হওয়ায় পুলিশ তাদের ধরছে না। পুলিশকে ম্যানেজ করে তারা এখন প্রকাশ্যেই ঘোরাফেরা করছেন। তবে দেশব্যাপী আলোচিত এই মামলাটির তদন্তের সঙ্গে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মামলার এই দুই আসামি পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন। যেকোনো সময় পুলিশের জালে ধরা পড়বেন তারা।

এদিকে ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার বিচার ও রায় ঘোষণা দ্রুততম সময়ে হলেও সে তুলনায় তানিয়া হত্যার বিচার প্রক্রিয়ার গতি ধীর হওয়ায় ক্ষুব্ধ তার পরিবারের সদস্যরা। নুসরাত হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার ও রায় দ্রুত সময়ে হলেও কাছাকাছি সময়ের তানিয়া হত্যার ঘটনা দেশে আলোড়ন তুললেও মামলার অগ্রগতি না হওয়ার কারণ খুঁজে ফিরছেন তারা।

বাজিতপুর থানা ও আদালত থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ মে চলন্ত বাসে তানিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যার তিন মাসের মাথায় গত ৮ আগস্ট চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক এই ঘটনায় করা মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়। অভিযোগপত্রে স্বর্ণলতা পরিবহনের বাসচালক নুরুজ্জামান, হেলপার লালন, বোরহান উদ্দিন, সুপারভাইজার রফিক, আল আমিন, লাইনম্যান খোকন, ল্যাংড়া বকুল, বাস মালিক আল মামুন এবং স্বর্ণলতা পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পারভেজ সরকার পাভেলকে আসামি করা হয়।

তানিয়ার পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, বিচারকাজে কোনো গতি নেই, উল্টো দিন যতই যাচ্ছে মামলার গতি ততই স্তমিত হয়ে পড়ছে।

মামলার বাদী ও নিহত তানিয়ার বাবা মো. গিয়াস উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে গত শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার মেয়েকে হত্যার ঘটনা আজ পাঁচ মাস হয়ে গেল। কিন্তু ধর্ষণ ও হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী বোরহান এবং পাভেলকে কেন পুলিশ ধরছে না– এ জবাব কোথাও পাচ্ছি না, কোথাও না। পুলিশ তো ইচ্ছে করলেই তাদের ধরতে পারে। নুসরাত হত্যার সব আসামিই তো গ্রেপ্তার হয়েছিল। কিন্তু আমার মেয়ের বেলা কেন পুলিশ এমন করছে? আমার সন্দেহ, এই আসামি দুজন প্রভাবশালী ও অর্থবান বলে পুলিশ তাদের কাছে ম্যানেজ হয়ে গেছে।’

তানিয়ার বাবা আরও বলেন, ‘নুসরাত হত্যার বিচারের রায় হয়েছে, কিন্তু তানিয়া হত্যার রায় কবে হবে কেউ এখনো বলতে পারে না। আমরা কি সে রায় দেখতে পারব না?’

তানিয়ার বড় ভাই কফিল উদ্দিন সুমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বোনের হত্যাকারী মূলহোতা বোরহান উদ্দিন এবং স্বর্ণলতা পরিবহনের এমডি পারভেজ সরকারকে এখনো পুলিশ ধরছে না। পুলিশ লোক দেখানোর জন্য এ দুই আসামিকে ধরতে পুরস্কার ঘোষণা করে তাদের দায় এড়িয়ে গেছে। নইলে কেন তাদের ধরছে না পুলিশ?’ প্রায় একই ধরনের অভিযোগ করেছেন তানিয়ার অন্য ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনরা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাজিতপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. সারোয়ার জাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বোরহান ও আল আমিনকে গ্রেপ্তারে চিরুনি অভিযান চলছে। কিন্তু তারা দুজন পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে অজ্ঞাতস্থানে আত্মগোপনে রয়েছে। তবে বোরহান ও আল আমিন যেকোনো মুহূর্তে পুলিশের জালে ধরা পড়বেই।’

অন্যদিকে কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, ‘আমরা তদন্তসাপেক্ষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছি। কোনো আসামি এ মামলা থেকে রেহাই পাবে না। আমরা এ মামলাটির ব্যাপারে দ্রুত সব কার্যক্রম গ্রহণ করছি। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘বোরহান ও পারভেজ সরকারকে গ্রেপ্তারের ড়্গেত্রে আমরা সর্বসাধারণের সহযোগিতা কামনা করেছি। এই দুজনকে গ্রেপ্তারের ড়্গেত্রে কেউ সহযোগিতা করলে তাকে পুলিশের পক্ষ থেকে পুরস্কৃত করা হবে। আমার বিশ্বাস, পুলিশ ও জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বোরহান ও পারভেজ সরকার সহসাই ধরা পড়বে।’

গত ৬ মে ঢাকার কল্যাণপুরে ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত নার্স তানিয়া বাসে করে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার বাহেরচর গ্রামের নিজ বাড়িতে আসছিলেন। পথে বাজিতপুরের জামতলী গজারিয়া এলাকায় তাকে স্বর্ণলতা পরিবহনের বাসের চালক নুরু এবং তার সহকারী লালন মিয়াসহ কয়েকজন ধর্ষণ করে মাথায় আঘাত করে হত্যার পর ফেলে রেখে যায়। তানিয়া কটিয়াদীর লোহাজুরি ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের গিয়াসউদ্দিনের মেয়ে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত