ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পেয়েও যথাযথ কর্তৃপক্ষকে না জানানোয় সাকিব আল হাসানকে দুই বছরের সাজা দিয়েছে আইসিসি। এর মধ্যে দোষ স্বীকার করে নেওয়ায় সাজার এক বছর স্থগিত নিষেধাজ্ঞা। এই পুরো প্রক্রিয়াটা নিয়ে গতকাল একটি প্রেস রিলিজ দিয়েছে আইসিসি। পাঠকদের জন্য তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ অনুবাদ করে দেওয়া হলো–
সূচনা
১. সাকিব আল হাসান বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সদস্য। যিনি দেশটির হয়ে মোট ৫৬ টেস্ট, ২০৬ ওয়ানডেসহ মোট ৩০০’র বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশ নিয়েছেন। তার আন্তর্জাতিক অভিষেক ঘটে ২০০৬ সালের আগস্টে।
২. একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হিসেবে সাকিব আল হাসান অবশ্যই আইসিসির নিয়মনীতির আওতাভুক্ত। যেমন, আইসিসির সকল নিয়ম তাকে মানতে হবে। নিয়মের মধ্যে থাকতে হবে। যে কোনো একটি নিয়মের বিরুদ্ধে যায় এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে এবং ক্রিকেটের স্বচ্ছতায় প্রভাব ফেলে এমন কোনো কাজ দেখলে আইসিসিকে জানাতে হবে।
৩. ক্যারিয়ারজুড়ে সাকিব আইসিসির অ্যান্টি করাপশন ইউনিটের সঙ্গে মিলিতভাবে অনেক শিক্ষামূলক কাজ করেছেন। এসব কাজের কারণ হলো ক্রিকেটারকে স্মরণের মধ্যে রাখা যে আইসিসির নিয়ম তাকে মানতে হবে। এর মধ্যে ফিক্সিং বা এ জাতীয় কিছু করার জন্য কোনো প্রস্তাব পেলে তা আইসিসিকে জানানোর বাধ্যবাধকতাও আছে।
৪. ২০০৮ ও ২০০৯ সালে সাকিব তার দায়িত্বে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন এবং একটি ফিক্সিং প্রস্তাব পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে তা আইসিসির অ্যান্টি করাপশন ইউনিটকে জানান।
বর্তমান শাস্তির পেছনের কারণ
১. এ বছর ২৩ জানুয়ারি ও ২৭ আগস্ট সাকিব আল হাসানকে একটি সন্দেহজনক ফিক্সিং কাণ্ডের তদন্তের স্বার্থে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করে আইসিসির অ্যান্টি করাপশন ইউনিট। ক্রিকেটে আগেও দুর্নীতির অভিযোগ আছে এমন একজন– দীপক আগারওয়ালের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছে কি না এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হয়।
২. সাক্ষাৎকারগুলোতে সাকিবকে সাবধান করা হয় যে, যে কোনো বক্তব্যই তিনি দেন না কেন সেটা পরবর্তী সময়ে তদন্তের প্রয়োজনে তার বিরুদ্ধে বা স্বপক্ষে ব্যবহার করা হবে। এই সাবধানবাণী শোনার পর সাকিব স্বীকার করেন আগারওয়াল বেশ কয়েকবার তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে।
৩. এই সাক্ষাৎকারে আইসিসির কোড অব কন্ডাক্ট ভাঙার শাস্তির ব্যাপারে অবগত আছেন বলে জানান।
৪. সাক্ষাৎকারে সাকিব এই বিষয়গুলো স্বীকার করেন–
১. ২০১৭ সালের নভেম্বরে ঢাকা ডায়নামাইটসে খেলার সময় সাকিবের পরিচিত একজন আগারওয়ালকে তার নাম্বার দেন। ব্যাপারটি পরে বুঝতে পারেন সাকিব। সেই লোকের কাছে বিপিএলে খেলা অনেক ক্রিকেটারের নাম্বার চেয়েছিলেন আগারওয়াল এটাও বুঝেছিলেন সাকিব। টুর্নামেন্ট চলাকালীন আগারওয়াল অনেকবার সাকিবের সঙ্গে দেখা করার জন্য হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠান কিন্তু সাকিব এড়িয়ে যান।
২. ২০১৮’র জানয়ারিতে জিম্বাবুয়ে ও শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলে বাংলাদেশ। ওই সিরিজ চলাকালীন আগারওয়াল আবারও সাকিবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ বিনিময় হয়। ১৯ জানুয়ারি সিরিজের একটি ম্যাচে সাকিব ম্যাচসেরা হওয়ায় তাকে অভিনন্দন জানান আগারওয়াল। এরপরই হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজটি ছিল- ‘আমরা কি এভাবেই কাজ করব নাকি আইপিএল পর্যন্ত অপেক্ষা করব।’ এখানে ‘কাজ’ বলতে দলের কোনো অর্থ আদান-প্রদানকে ধরে নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারটি সাকিব আইসিসিকে জানাননি। পরে ২৩ জানুয়ারিতে আবারও আগারওয়ালের মেসেজ পান সাকিব। আগারওয়াল আবারও দলের খবর জানতে চেয়ে মেসেজ করেন- ‘ব্রো এই সিরিজে আর কিছু?’ এর মানে হলো আগারওয়াল দলের আরও খবর জানতে চাইছে। সাকিব এ ব্যাপারেও আইসিসিকে কিছু জানাননি।
৩. ২৬ এপ্রিল ২০১৮, সে বছর ওই দিনে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের হয়ে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের বিপক্ষে খেলছিলেন সাকিব। সেদিনও সাকিবের কাছে কোনো একজন ক্রিকেটারের নাম উল্লেখ করে আগারওয়াল জানতে চান এই ক্রিকেটার আজ খেলবেন কি না। আবারও দলের ভেতরের সংবাদ জানতে চাওয়া হচ্ছে। পরে এই কথোপকথনে বিট কয়েন, ডলার অ্যাকাউন্ট ও সাকিবের অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে কথা বলেন দুজনে। পরে সাকিব আগারওয়ালকে মেসেজ দেন যে এসব নিয়ে কথা বলার আগে তার সঙ্গে দেখা করতে চান। এইদিনের মেসেজে অনেকগুলো মেসেজ ডিলিট করা হয়েছিল। সাকিব স্বীকার করেছেন এই মেসেজগুলোতে আগারওয়াল দলের ভেতরকার খবর জানতে চেয়েছিল। তারপরই লোকটিকে ফিক্সার হিসেবে সন্দেহ হয় সাকিবের। কিন্তু এ ব্যাপারেও সাকিব আইসিসির অ্যান্টি করাপশন ইউনিটের কাছে কিছু জানাননি।
৫. সাকিব অ্যান্টি করাপশন ইউনিটকে জানিয়েছেন যে, আগারওয়ালের কাছ থেকে তিনি কোনো রকম অর্থ গ্রহণ করেননি এবং তার কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি বা তথ্য দেননি।
যে কোড ভঙ্গ হয়েছে
১. কোড ২.৪.৪ – ফিক্সিংয়ে জড়ানোর জন্য কোনো পক্ষ থেকে কোনো রকম প্রস্তাব পাওয়ার পর দ্রুত তা অ্যান্টি করাপশন ইউনিটের কাছে জানানো। সাকিব তিনবার ফিক্সারদের কাছ থেকে প্রস্তাব পেয়েও তা জানাননি আইসিসিকে এ জন্য এই কোডটি ভঙ্গ হয়েছে।
ডিসিপিস্ননারি অ্যাকশন
১. সাকিব স্বীকার করেছেন তিনি ২.৪.৪ কোড অব কন্ডাক্টটি ভঙ্গ করেছেন। এ জন্য তাকে আইসিসির নির্ধারিত শাস্তির ৫.১.১২ কোডে নিষিদ্ধ করা হয়।
স্বীকারোক্তি
১. কোড ২.৪.৪ ভঙ্গ করলে কোনো ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে শাস্তির মেয়াদ আইসিসির ৬.২ ধারায় লেখা আছে কমপক্ষে ৬ মাস থেকে সর্বোচ্চ ৫ বছর।
২. আইসিসির ৬.১ ধারায় লেখা আছে এই ড়্গেত্রে আইসিসির অ্যান্টি করাপশন ইউনিট বিভিন্ন বিষয় আমলে নিয়ে শাস্তির মেয়াদকাল নির্দিষ্ট করবেন।
৩. ক্রিকেটে সাকিব আল হাসানের অর্জন, সম্মান, নিবেদন এবং অ্যান্টি করাপশন ইউনিটের সঙ্গে ক্রিকেট দূষিত না করার লক্ষ্যে পূর্বের কাজগুলোকে আমলে নিয়ে সাকিবকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হলো। এর মধ্যে এক বছর স্থগিত নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
৪. সাকিব নিজেও নিজের ভুল স্বীকার করেছেন এবং শাস্তি মেনে নিয়েছেন।
৫. আইসিসির ৭.২ ধারা মোতাবেক সাকিব আল হাসান বা আইসিসি এই শাস্তির বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে না।
