দুই মিউচুয়াল ফান্ডের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে এল আর গ্লোবাল

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০১৯, ১২:০৬ এএম

বেআইনি ও স্বেচ্ছাচারী বিনিয়োগের মাধ্যমে মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের তহবিল ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কায় ইউনিটধারীরা সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন চেয়েছেন। সম্প্রতি গ্রিন ডেল্টা ও ডিবিএইচ প্রথম মিউচুয়াল ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এল আর গ্লোবাল বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির নিয়োগ বাতিল করতে ট্রাস্টিকে চিঠি দিয়েছেন দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ইউনিটধারী। এর ফলে ওই দুই মিউচুয়াল ফান্ড পরিচালনায় নিয়ন্ত্রণ হারাতে যাচ্ছে এল আর গ্লোবাল।

গত ২৮ অক্টোবর ওই দুই মিউচুয়াল ফান্ডের প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিশ্রেণির ইউনিটধারীরা ট্রাস্টি বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে (বিজিআইসি) সম্পদ ব্যবস্থাপক পরিবর্তনের চিঠি দিয়েছেন। গ্রিন ডেল্টা মিউচুয়াল ফান্ডের ৭০ দশমিক ১২ শতাংশ ও ডিবিএইচ প্রথম মিউচুয়াল ফান্ডের ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ ইউনিটধারী সম্পদ ব্যবস্থাপক পরিবর্তন ও নতুন সম্পদ ব্যবস্থাপক নিয়োগে আলাদাভাবে চিঠি দিয়েছে ট্রাস্টিকে। সিকিউরিটিজ আইন অনুসারে ফান্ডের এক-তৃতীয়াংশ ইউনিটধারী চাইলে সম্পদ ব্যবস্থাপক পরিবর্তন করবে ট্রাস্টি।

মিউচুয়াল ফান্ডের তহবিল পরিচালনায় এল আর গ্লোবালের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে সম্পদ ব্যবস্থাপক পরিবর্তনের এমন উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ইউনিটধারীরা। সম্প্রতি একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে নিজেদের পরিচালিত বিভিন্ন ফান্ড থেকে এল আর গ্লোবাল ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। ওই নিউজ পোর্টালের ১০০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ার সাড়ে ১২ হাজার টাকায় কেনা হয়। যদিও এ বিনিয়োগে স্থগিতাদেশ দিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। এর আগে মিউচুয়াল ফান্ডের তহবিল কয়েকটি অতালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বেআইনি ও বিধিবহির্ভূতভাবে ৯৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বিনিয়োগের দায়ে এল আর গ্লোবালকে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল এসইসি। এছাড়া সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানটির ওপর নতুন তহবিল গঠনে এক বছরের নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়। একই সঙ্গে যথাযথ দায়িত্ব পালন না করায় ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান বিজিআইসিকে ২৫ লাখ ও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান হুদা ভাসিকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। 

তহবিল পরিচালনায় বিশ্বাস ভঙ্গ ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০০১-এর ৩১ ধারা অনুযায়ী সম্পদ ব্যবস্থাপক পরিবর্তনে ট্রাস্টিকে চিঠি দিয়েছেন ইউনিটধারীরা। গত ২৮ আগস্ট বিজিআইসিকে দেওয়া চিঠিতে গ্রিন ডেল্টা ও ডিবিএইচ প্রথম মিউচুয়াল ফান্ডের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ইউনিটধারী এল আর গ্লোবালের পরিবর্তে আইডিএলসি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডকে সম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন।

মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালার ৩১ (২) ধারা অনুযায়ী ট্রাস্টি, কমিশনের পূর্বানুমতিক্রমে এবং স্কিমের দুই-তৃতীয়াংশ ইউনিট মালিক দাবি করলে কোনো সম্পদ ব্যবস্থাপকের নিয়োগ বাতিল করতে পারে। এক্ষেত্রে বাতিলের বিষয়টি কমিশনকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে অবহিত করতে হয়। এজন্য ইউনিটধারীদের সভা আহ্বানের কোনো প্রয়োজন হয় না। এর আগে সন্ধানী লাইফ ইউনিট ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপক একই প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন করা হয়।

গ্রিন ডেল্টা ও ডিবিএইচ প্রথম মিউচুয়াল ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপক পরিবর্তনে যেসব ইউনিটধারী প্রতিষ্ঠান ট্রাস্টির কাছে চিঠি দিয়েছেন, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ব্র্যাক ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং, অগ্রণী ইক্যুইটি অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স, আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস, আইডিএলসি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, ভিআইপিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট, এজ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ও এশিয়ান টাইগার ক্যাপিটাল পার্টনারস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি। এর বাইরে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি বিনিয়োগকারী রয়েছেন, যারা ওই দুই মিউচুয়াল ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপক পরিবর্তন চেয়ে ট্রাস্টিকে উদ্যোগ নিতে বলেছেন।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত মেয়াদি গ্রিন ডেল্টা ও ডিবিএইচ প্রথম মিউচুয়াল ফান্ডের আকার হচ্ছে ২৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে গ্রিন ডেল্টা মিউচুয়াল ফান্ড ১৫০ কোটি ও ডিবিএইচ প্রথম মিউচুয়াল ফান্ডের আকার ১২০ কোটি টাকা। বর্তমান বাজারমূল্যে এ দুই ফান্ডের সম্পদের পরিমাণ হচ্ছে ২৬৫ কোটি টাকা। এল আর গ্লোবাল পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ছয়টি ক্লোজ অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ড ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে, সেসব ফান্ডের আকার প্রায় ৮৮০ কোটি টাকা।

সম্পদ ব্যবস্থাপক পরিবর্তন বিষয়ে ওই দুই মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটধারী প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সম্প্রতি এল আর গ্লোবালের বেআইনি বিনিয়োগের কারণে বিনিয়োগকারীরা সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানটির আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। সম্পদ ব্যবস্থাপক পরিবর্তনের এটাই মূল কারণ।

এর আগে ১৬ সেপ্টেম্বর এল আর গ্লোবাল পরিচালিত ডিবিএইচ মিউচুয়াল ফান্ড বেমেয়াদিতে রূপান্তরের জন্য ফান্ডটির ৭৮ শতাংশ ইউনিটধারী সভা আহ্বান করতে ট্রাস্টির কাছে আবেদন জানায়, যা এসইসির নির্দেশনার পর এখন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

এল আর গ্লোবাল বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিয়াজ ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, মন্দাবাজারে আমাদের ১০ বছরের সাফল্যের রেকর্ড রয়েছে। ৪০ শতাংশের বেশি নগদ লভ্যাংশের ইতিহাস রয়েছে। আমাদের পারফরম্যান্সই কথা বলবে। আমরা সব বিনিয়োগকারীকে সমান চোখে দেখি। আমাদের কিছু প্রতিযোগী যারা বড় ধরনের কারসাজিতে যুক্ত, তাদের বিষয়ে আমরা ইতিমধ্যেই তথ্য প্রকাশ করেছি। কোনো গ্রাউন্ড ছাড়া তারা সম্পদ ব্যবস্থাপক পরিবর্তন করতে পারে না। এ রকম কিছু হলে আমরা লিগ্যাল অ্যাকশনে যাব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত