লোকসান দিতে দিতে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শ্বেতহস্তীতে পরিণত হওয়ার ঘটনা এদেশে নতুন কোনো খবর নয়। ধারাবাহিক লোকসানের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা বন্ধের নজিরও ভূরি ভূরি। উল্টোদিকে লোকসানি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পর লাভজনক হয়ে ওঠার অনেক দৃষ্টান্তও রয়েছে। সরকারের পরিচালনাধীন একদা লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোও কেন একসময় লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, কীভাবে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসানের পাহাড় বাড়তে থাকেÑ সেসব নিয়েও নানা সময়ে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা এই সংকট সমাধানে নানা পরামর্শ দিয়েছেন, সংকট কাটিয়ে উঠতে নানা সময়ে সরকার নানা উদ্যোগও নিয়েছে, হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকিও দেওয়া হয়েছে। কখনো কখনো রাজনৈতিক অঙ্গনেও এ নিয়ে মাঠ গরম হয়েছে। সবই হয়েছে। কিন্তু জনগণের কষ্টার্জিত অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে সম্পদের অপচয় রোধ করা যায়নি; দেশের অর্থনীতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের যথাযথ বিকাশ নিশ্চিত করা যায়নি।
শুক্রবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত “সরকারি ৩৫ ‘হাতি’র পেটে ৩৫০০ কোটি টাকা” শিরোনামের প্রতিবেদনে সরকারের পরিচালনাধীন ৩৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা লোকসানের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৩৫টি সরকারি প্রতিষ্ঠান গত অর্থবছরে লোকসান করেছে মোট ৩ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০০ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে ৮টি সরকারি প্রতিষ্ঠান। লোকসানি এসব সংস্থার প্রতিবেদন অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। অবশ্য, গত মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা বৈঠকে ৫৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা মুনাফাও অনুমোদন করা হয়। কিন্তু ব্যাংক, টেলিযোগাযোগ কোম্পানি, গ্যাস কোম্পানি, চিনিকল, পাটকল ও সিমেন্ট কারখানার মতো বিশাল বাজার থাকা বিভিন্ন খাতের ৩৫টি কোম্পানি কেন লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলো তার কোনো জবাব মেলেনি। প্রতিষ্ঠানগুলোকে কীভাবে লাভজনক করা যায় সে বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা দেখা যাচ্ছে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির লোকসানি শ্বেতহস্তীতে পরিণত হওয়াটা যেন কাঠামোগতভাবেই মেনে নেওয়ার প্রক্রিয়াই তৈরি হয়েছে।
দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে কয়েকটি খাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আর সরকারি প্রতিষ্ঠানের যে তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা যেমন হতাশাজনক তেমনি কৌতূহলোদ্দীপক। দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংক গত বছর মুনাফা করেছে ৫৬৭ কোটি টাকা। অথচ একসময় দেশের সবচেয়ে ভালো ব্যাংক হিসেবে পরিচিত বেসিক ব্যাংক গত অর্থবছরে লোকসান করেছে ২৫১ কোটি টাকা। শতভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত এ ব্যাংকটির অবস্থা খারাপ হয়েছে চার হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়ানোর পর থেকে। সরকারি অবকাঠামো ব্যবহার করে পরিচালিত রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিকম কোম্পানি টেলিটক গত অর্থবছরে লোকসান দিয়েছে ২০৩ কোটি টাকারও বেশি। অথচ ২০১৮ সালে ৩ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা মুনাফা করেছে বেসরকারি খাতে পরিচালিত গ্রামীণফোন। রবি ও বাংলালিংকও বড় অঙ্কের মুনাফা করেছে এ সময়ে। বেসরকারি চিনিকলগুলো দিন দিন বড় হলেও বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের অধীন ১৫টি চিনিকলের মধ্যে একমাত্র কেরু অ্যান্ড কোং ছাড়া সবকটি লোকসানে রয়েছে। গত অর্থবছর চিনিকলগুলো ৮৫৪ কোটি টাকা লোকসান করেছে। শুধু লোকসানই নয়, চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের ব্যাংকঋণ ও দায়দেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকারও বেশি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বিপুল লোকসানের পেছনে বড় কারণ অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতা এবং অনিয়ম ও দুর্নীতি। অদক্ষ আমলাদের দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসান গুনছে। এজন্য সরকারের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন অনেক অর্থনীতিবিদ। তারা বলে থাকেন, বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলে লোকসান কমবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো ভালোভাবে পরিচালিত হলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। কিন্তু এই আলোচনায় রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে আমলাতন্ত্র ও অসাধু ব্যবসায়ী শ্রেণির যোগসাজশের অশুভ চক্রের কথা পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়। একই কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের নানা আর্থিক কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতি থেকে অলিখিত দায়মুক্তি পেয়ে থাকেন এই সংকটের জন্য দায়ীরা। অন্যদিকে, মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই দেশের অর্থনীতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের কোম্পানিগুলোকে দেশি-বিদেশি বেসরকারি খাতের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়। অর্থনীতিতে জাতীয় স্বার্থের পক্ষে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অনুপস্থিতি নিঃসন্দেহে এই সংকটের একটি নেপথ্য কারণ, যা আলোচনায় আসে না। এমতাবস্থায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য বাজারের চাহিদা অনুযায়ী যুগোপযোগী করে ঢেলে সাজানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সংস্কার কর্মসূচির যেমন কোনো বিকল্প নেই, তেমনি এই সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছারও কোনো বিকল্প নেই বলেই মনে হয়। আর এটি কার্যকর করতে হলে দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন ও অব্যবস্থাপনা দূর করে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে আসতে হবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
