নরসিংদীতে দলীয় প্রভাব বিস্তার করে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান ওরফে সুইডেন আতাউরের বিরুদ্ধে। জমি, মিল-কারখানা দখলসহ নানা প্রতারণার মাধ্যমে তিনি গত ১০ বছরে দেশে-বিদেশে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
বিভিন্ন সময় মামলা হলেও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবে পার পেয়ে গেছেন তিনি। তবে সরকারের চলমান শুদ্ধি অভিযানে সুইডেন আতাউরকে সিআইডি গ্রেপ্তারের পর আতঙ্কে থাকা মানুষ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। বেরিয়ে আসছে নানা তথ্য। এদিকে বিতর্কিত সুইডেন আতাউরের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগ নেতারা।
জালিয়াতি ও প্রতারণা মামলায় সুইডেন আতাউরকে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল রবিবার দুপুরে শতকোটি টাকার মোল্লা স্পিনিং মিল অবৈধ দখলের মামলায় বিচারিক হাকিম (জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট) শারমিন আক্তার পিংকির আদালতে তোলা হলে বিচারক এ আদেশ দেন।
মোল্লা স্পিনিং মিল দখলের অভিযোগে সোনালী ব্যাংকের জালিয়াতি ও প্রতারণা মামলায় গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার মালিবাগ থেকে সুইডেন আতাউরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গত শুক্রবার বিকেলে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাইনউদ্দিন কাদিরের আদালতে তাকে সোপর্দ করা হয়। ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সুইডেন আতাউরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। বিচারক রবিবার (গতকাল) রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরই প্রেক্ষিতে গতকাল তাকে আদালতে তোলা হলে বিচারক তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এ সময় বিচারক তাকে প্রতিদিন চার ঘণ্টা করে পরপর তিন দিন জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন।
সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, নরসিংদী শহরের হাজিপুর এলাকার নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে আতাউর রহমান ২০ বছর আগে অবৈধপথে সুইডেন পাড়ি জমান। সেখানে এক বৃদ্ধ মহিলাকে বিয়ে করে বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পত্তি আত্মসাৎ করে মালিক বনে যান। সেই টাকায় সুইডেনের স্টকহোম ক্রিসেন্টাল সংলগ্ন স্থানে রিও নামে একটি দোকান খোলেন। পরে তিনি সুইডেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।
২০০৩ সালের দিকে নরসিংদী শহরের পশ্চিম কান্দাপাড়ায় ছয় তলাবিশিষ্ট সুইডেন ভিলা ভবন নির্মাণ করে প্রথমে স্থানীয়দের নজরে আসেন সুইডেন আতাউর। এরপর তিনি ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় ব্যবহার করে মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকা ভেজাল জমি খুঁজে বেড়ান। কয়েক বছরের ব্যবধানে নরসিংদী বাজারের গেঞ্জিপট্টি মোড়ে অন্যের জমি দখল করে পাঁচ তলাবিশিষ্ট সুইডেন প্লাজা গড়ে তোলেন। এখানেই ক্ষান্ত হননি তিনি। প্রভাব খাটিয়ে ২০১৬ সালে শহরের বাগহাটা এলাকার শতকোটি টাকা মূল্যের মোল্লা স্পিনিং মিল সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে দখল করে নিয়েছেন। এভাবে তিনি পার্শ্ববর্তী আমজাদ ভূইয়া ও মতিন মোল্লার নির্মাণাধীন ম্যানচেস্টার কম্পোজিট নামক একটি কারখানা অবৈধভাবে দখল করতে মালিকদের হুমকিধমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সুইডেন আতাউর বিএনপির পদধারী কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক নেতাকে সঙ্গে নিয়ে শহরের খালপাড় এলাকায় হাবিবুল্লাহ মিয়ার ১২ শতাংশ জমি দখল করেছেন। বাগহাটা এলাকার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী স্থানের আহমেদ হোসেনের ২০ শতাংশ জমি জোরপূর্বক দখল করেছেন। সদর উপজেলার পাঁচদোনায় মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকা ৬৯ শতাংশ জমি দখল করে নিয়েছেন। সদর উপজেলার মেহেরপাড়া ইউনিয়নের কান্দাইলে হিন্দু সম্প্রদায়ের ১০০ বিঘা জমি দখল করতে মালিকদের হুমকিধমকি দিচ্ছেন। ইতিমধ্যে ২০ বিঘা জমি জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছেন।
সুইডেন আতাউরের ঘনিষ্ঠজনদের কাছ থেকে জানা গেছে, সুইডেন আতাউরের ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ৮ শতাংশ জমির একটি প্লট রয়েছে। গাজীপুরের টঙ্গীতে রয়েছে তার ১০ শতাংশ জমি। নরসিংদী শহরের দগরিয়ায় মিস্টিক ফার্মাসিউটিক্যালের পেছনে ৮০ শতাংশ জমি, ব্রাহ্মন্দী পুরাতন টাউন হলের পেছনে ৫ শতাংশ জমি ছাড়া আরও নামে-বেনামে অনেক স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে তার।
অভিযোগ রয়েছে, সুইডেন-বাংলা টেক্সটাইল মিলে কটন সুতা ব্যবহার করা হলেও বন্ড সুবিধার মাধ্যমে টেনসিল, পলিস্টার ও বিসকস তুলা আমদানি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছেন। এর মাধ্যমে তিন সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছেন।
রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সুইডেনে সফরে যাওয়া প্রধানমন্ত্রীসহ বড় বড় নেতাদের সঙ্গে ছবি তুলে ফেইসবুকে প্রচার করে দেশে প্রভাব বিস্তার করেন। তিনি ইতিপূর্বে পৌরসভাসহ বিভিন্ন নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চেয়ে পোস্টার ব্যানার করে নিজেকে নেতা হিসেবে জাহির করেছেন।
সুইডেন আতাউরের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ব্যবসায়ী পরেশ সূত্রধর বলেন, ‘কান্দাইলের হিন্দু সম্পত্তিটি আতাউরসহ আমরা তিনজন কিনেছি। কিন্তু আতাউর জমির টাকা দিলেও সেই জমি আমার নামে কিনেছেন। পুরো জমি এখনো আমাদের দখলে নেই। অনেক জমি বেদখল। সেগুলো উদ্ধারের জন্য চেষ্টা চলছে।’
মোল্লা স্পিনিং মিলের পরিচালক রাশেদুল হাসান রিন্টু বলেন, ‘সুইডেন আতাউর আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে আমাদের মিলসহ অসহায় অনেক মানুষের জমি দখল করে নিয়েছেন। এভাবে তিনি অবৈধভাবে কয়েকশ কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। চলমান শুদ্ধি অভিযানে তিনি গ্রেপ্তার হওয়ায় আমাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। আমরা আমাদের বেদখল হওয়া মিল ফিরে পেতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি।’
জানতে চাইলে নরসিংদী সদর আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হিরো বলেন, ‘বিতর্কিত কোনো নেতার দায় আওয়ামী লীগ কেন নেবে? আতাউরের অপরাধগুলো আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত হলে আমরা বিতর্কিত লোককে দলের মধ্যে স্থান দিয়ে রাখতে পারি না। তার বিরুদ্ধে আমরা অবশ্যই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেব।’
আতাউর গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে সুইডেন আওয়ামী লীগের সভাপতি উল্লেখ করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় তার ব্যাখ্যা দিয়েছে সুইডেন আওয়ামী লীগ। গত ১ নভেম্বর সুইডেন আওয়ামী লীগের সভাপতি এইচ এম জাহাঙ্গীর কবির ও সাধারণ সম্পাদক ডা. ফরহাদ আলী খান স্বাক্ষরিত এক প্রেস নোটে জানানো হয়, আতাউরকে সুইডেন আওয়ামী লীগের সভাপতি উল্লেখ করে ভুল তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে। আতাউর রহমান সুইডেন আওয়ামী লীগের বর্তমান বা সাবেক কোনো কমিটিরই সভাপতি নন। সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগ কর্র্তৃক অনুমোদিত ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা কর্র্তৃক স্বীকৃত সুইডেন আওয়ামী লীগের সভাপতি এইচ এম জাহাঙ্গীর কবির ও সাধারণ সম্পাদক ডা. ফরহাদ আলী খান। গ্রেপ্তার হওয়া আতাউর রহমান প্রায় তিন বছর ধরে সুইডেন ছেড়ে সপরিবারে লন্ডনে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। সুইডেন আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
