আইএমইডির প্রতিবেদন

সমীক্ষা যথাযথ না হওয়ায় বুড়িগঙ্গা পুনরুদ্ধার বিঘ্নিত

আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ০৩:৪৮ এএম

রাজধানীর উপকণ্ঠে প্রবহমান ধলেশ্বরী-পুংলী-বংশাই-তুরাগ-বুড়িগঙ্গা নদীর পানিপ্রবাহ ফেরাতে চায় সরকার। এজন্য ২০১০ সালে নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্প ৯ বছরেও গতি পায়নি। এই সময়ে শেষ হয়েছে মোট বরাদ্দের এক-তৃতীয়াংশ। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) বলছে, সময়োচিত সমীক্ষা না করে প্রকল্প গ্রহণ করায় বাস্তবায়ন বিঘ্নিত হচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় টঙ্গীখাল ও বুড়িগঙ্গার অফটেকে ভৌত মডেল নতুন করে পরীক্ষা করাও জরুরি। কারণ এটি বাস্তবায়ন হলে তা আদৌ সুফল আসবে কি না, বলা যাচ্ছে না। এ ছাড়া প্রকল্পের গতি আনতে জনবল কাঠামোতে জোর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, আগে গতি না থাকলেও এখন গতি এসেছে। বর্ধিত মেয়াদে কাজ শেষ হবে। সম্প্রতি আইএমইডি প্রকাশিত প্রকল্পের ওপর নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বিগত কয়েক দশক ধরে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও আর্থ-সামাজিক কার্যক্রম বাড়ার সঙ্গে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের অভ্যন্তরীণ বন্দরগুলোর পরিধি, শিল্প ও ব্যবসাকেন্দ্র ব্যাপকভাবে বেড়েছে। যত্রতত্র নৌযান নোঙর ও নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে জলপথ সরু হয়েছে। শিল্প-কারখানাগুলো থেকে নোংরা তরলের সঙ্গে বিষাক্ত রাসায়নিকের ক্রমাগত নিঃসরণ এবং নদী ও খালগুলোতে পলিথিনসহ নানা মানববর্জ্য নিক্ষেপের ফলে নদীর তলদেশ ভরাট হচ্ছে। এই অবস্থায় ২০১০ সালের এপ্রিলে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ২০১৩ সাল নাগাদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ‘বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার (নিউ ধলেশ্বরী-পুংলী-বংশাই-তুরাগ-বুড়িগঙ্গা রিভার সিস্টেম) শীর্ষক প্রকল্প পাস হয়। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে বাস্তবায়ন না করতে পারায় প্রকল্পটি কয়েক দফায় ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে মেয়াদ বাড়ানো হয়। প্রকল্প অনুমোদনকালে ব্যয় ধরা হয় ৯৪৪ কোটি টাকা। এরপর গত বছর প্রকল্পপ্রস্তাবে প্রথম সংশোধনী এনে ১৮১ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানো হয়। এতে প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়ায় ১ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের মেয়াদ বাড়ে ২০২০ সালের জুন নাগাদ।

আইএমইডি প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ২৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এখন পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তবায়নের হার ততটা বাড়েনি। বাস্তবায়ন হয়েছে মোট বরাদ্দের এক-তৃতীয়াংশ। প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী ও তুরাগ নদ ঢাকা শহর ও বিভাগের ব্যবসা, পরিবহন ও কৃষিতে অসামান্য অবদান রেখে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিদ্যমান প্রকল্পটির আওতায় যমুনা থেকে বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত মোট দৈর্ঘ্য ১৬২ কিলোমিটার। এর মধ্যে ধলেশ্বরী নদী ২, পুংলী ৬১.৫০, বংশাই ২০.৫০ ও তুরাগ ৭৮.৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের গতিহীনতার কারণ হিসেবে আইএমইডি বলছে, পুরাতন গাণিতিক মডেল সমীক্ষা এবং সময়োচিত বেজ লাইন সমীক্ষা ব্যতিরেকে ফিজিবিলিটি স্টাডি নিয়ে ডিপিপি প্রণয়ন করায় প্রকল্পটি যথাসময়ে বাস্তবায়িত হয়নি। ভৌত মডেল সমীক্ষাটি শুধু প্রধান উৎসমুখ থেকে পুংলী নদীর ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় টঙ্গীখাল ও বুড়িগঙ্গার অফটেকে পানিপ্রবাহের যথার্থতা যাচাই করা হয়নি। তাই টঙ্গীখালের ও বুড়িগঙ্গার অফটেকে ভৌত মডেল পরীক্ষা করা খুবই জরুরি। ভূমি অধিগ্রহণে ভৌত কাজের অগ্রগতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করে সংশোধিত ডিজাইন মোতাবেক বাস্তবভিত্তিক ওয়ার্ক প্ল্যান প্রণয়নে নিবিড় তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা করতে হবে।

এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে জনবল কাঠামো পরিবর্তনের জোর দিয়ে আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প পরিচালকের পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী অথবা প্রধান প্রকৌশলী পদমর্যাদার কর্মকর্তা নিয়োগ করা প্রয়োজন। পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ যদি সম্ভব না হয়, তবে প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগ করা যেতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন দীর্ঘায়িত না করে প্রস্তাবিত দ্বিতীয় সংশোধনীর মেয়াদে এর কাজ সমাপ্ত করা দরকার। পুংলী নদীর ভাঙনকবলিত স্থানগুলোতে নদীতীর সংরক্ষণ কাজ, নদী প্রশস্তকরণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ, নদী ও সেডিমেন্ট বেসিনের রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং ইত্যাদি কাজ দ্বিতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন প্রয়োজন। বুড়িগঙ্গার পানিদূষণ ও নাব্য-সংকট উত্তরণের জন্য প্রকল্পের প্রধন উৎসমুখে পানিপ্রবাহ আনুপাতিক হারে বাড়াতে হবে।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এ বিষয়ে আইএমইডি সচিব আবুল মনসুর মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এই প্রতিবেদন পাঠাব। আশা করি প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নে এটি সহায়ক হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত