দখল আর দূষণে কেরানীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শুভাঢ্যা খালটি প্রায় বিলীনের পথে। ময়লা আবর্জনায় ভরা খালটি এখন শুধুমাত্র নামেই টিকে আছে। খালে পানির প্রবাহ নেই বললেই চলে। কেরানীগঞ্জ উপজেলার আগানগর ও শুভাঢ্যা ইউনিয়নের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা খালটি বাঁচাতে সরকার বিভিন্ন সময় নানা পদক্ষেপ নিলেও বাস্তবে এখন তার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এক সময় খালটি পানিতে পরিপূর্ণ ছিল, স্বচ্ছ পানির প্রবাহ বয়ে যেত খাল দিয়ে। খালের দুই পাড়ের বাসিন্দারা গোসলসহ নিত্যপ্রয়োজনে খালের পানি ব্যবহার করত। এলাকার মুরব্বিদের কাছ থেকে শোনা যায়, এই খালে একসময় গয়নার নৌকাও চলাচল করত। এ ছাড়া গোলাম বাজার, চড়াইল, বেগুনবাড়ি ঝাউবাড়িসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার জনসাধারণের একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম ছিল এই খালটি। মানুষ বিনোদনের জন্য নৌকা নিয়ে এ খালে ঘুরতে আসত। যা এখন রূপকথার গল্পের মতো মনে হয়।
খালটি রক্ষা করার জন্য ২০০৭ সালের দিকে যৌথবাহিনীর উদ্যোগে আগানগর গুদারাঘাট থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকা উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে অবৈধ দখলমুক্ত করে খালের ভেতর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা হয়। এরপরে ২০১২ সালে কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন খালটি পুনঃখনন ও সংস্কারের উদ্দেশ্যে প্রায় ৫৬ লাখ টাকা ব্যয় করে। ২০১৪ সালে শুভাঢ্যা খালের পানিপ্রবাহ সৃষ্টি করতে ও খালের তীর সংরক্ষণে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রাথমিকভাবে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে খালের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, পুনঃখনন ও তীর সংরক্ষণ করে খালের দুপাশে ব্লক বসিয়ে পানিপ্রবাহ সৃষ্টি করার ব্যবস্থা করা হয়। তবে কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায় প্রকল্পের কাজ।
এরপরে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও কয়েকবার খালের ময়লা পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু তাতে কোনো অগ্রগতি অথবা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি।
খালের পাড়ের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, খালের আয়তন কমে গেছে। কোথাও কোথাও খালের আয়তন কমে প্রস্থে ১০ ফুটে নেমে এসেছে। অথচ কাগজপত্রে খালটি প্রস্থ সর্বনিম্ন ৪০ ফুট। তা ছাড়া খালে ময়লা আবর্জনার স্তূপ জমে গেছে। কোথাও কোথাও হেঁটে অনায়াসে খালটি পার হওয়া যায়। আগানগর এলাকায় খালটিতে টুকরো কাপড়, ঝুট, পলিথিন, সুতা দিয়ে ভরে ফেলা হয়েছে, শুভাঢ্যার দিকে খালটি ভরে গেছে বিভিন্ন গৃহস্থালি আবর্জনায়। এসব জায়গায় পানির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। কালিগঞ্জ জোড়া ব্রিজ থেকে কৈবর্ত্য পাড়া পর্যন্ত খালের জায়গা দখল করে অনেকেই বাড়িঘর নির্মাণ করেছেন। এসব এলাকায় শত শত বাড়িঘর, গার্মেন্টস ও দোকানপাট গড়ে ওঠায় এসব এলাকার মানুষজন তাদের প্রতিদিনের বর্জ্য খালেই ফেলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আগানগর ও শুভাঢ্যা খালের একাধিক বাসিন্দা জানান, শুভাঢ্যা খালটিতে কিছু অসাধু লোক খালের নামে বছর বছর বরাদ্দ এনে লোক দেখানো কিছু কাজ করে বাকি টাকা আত্মসাৎ করছে।
কেরানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ জানান, গত ২২ আগস্ট পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শুভাঢ্যা খাল পরিদর্শন করে গেছেন। এর পরে শুভাঢ্যা খাল রক্ষায় ১১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। এরই মধ্যে প্রকল্পটির অনুমোদন হয়ে গেছে। টেন্ডার হলেই কাজ শুরু হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে খালটি তার হারানো সৌন্দর্য ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি বিনোদনের স্থান হবে। রাজধানীর হাতিরঝিলের আদলে দৃষ্টিনন্দন করে গড়ে তোলা হবে শুভাঢ্যা খালকে।
