কৃষি অর্থনীতিই সব অর্থনীতির মূল ভিত্তি। শিল্প অর্থনীতি কৃষির কাঁচামালের ওপর অথবা খনিজ উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। এই কাঁচামাল কখনো স্থানীয় বাজারেই পাওয়া যায়, কখনো দূরবর্তী বাজার থেকে সংগ্রহ করতে হয়, বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। স্থানীয়ভাবে কৃষি উৎপাদন নবায়নযোগ্য, খনিজ উৎপাদন নিঃশেষযোগ্য। যেসব রাষ্ট্র অন্য দেশের কাঁচামালের ওপর নির্ভর করে শিল্পের ওপর চলে অথবা অন্য রাষ্ট্রকে বন্দর ও অন্যান্য সেবা দিয়ে চলে, তাদের অর্থনীতির সুদূর ভিত্তি অন্য দেশের কৃষি ও শিল্প উৎপাদন। বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ এবং কৃষি অর্থনীতিই বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি।
বলতে শোনা যায়, একটি দেশের জাতীয় উৎপাদনে কৃষির পরিমাণ যত কম হবে, তার অর্থনীতি তত বাড়বাড়ন্ত হবে। কারণ শিল্পের মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়ে। সেবার মাধ্যমে দেশ ও বিদেশ থেকে আয় করা সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে কৃষির পরিমাণ যত কমবে এবং সেবার পরিমাণ বাড়বে, ততই বুঝতে হবে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর শিক্ষিত মধ্যবিত্ত আর ধনীদের নিষ্পেষণ বাড়ছে। এই নিষ্পেষণ হয় তাদের মৌলিক চাহিদার সেবাগুলো উচ্চতর হারে ক্রয় করার ক্ষেত্রে। জনগণের মৌলিক চাহিদার সেবাগুলো পূরণ সরকারের দায়িত্ব হলে এই নিষ্পেষণ দূর হবে। সেই ক্ষেত্রে সরকারকে জাতীয় ব্যয়ের অন্তর্গত চুরি রোধ করে কালো টাকা ধরতে হবে। কালো টাকা ধরলে সরকারি কোষাগার বৃদ্ধি পাবে; বেসরকারি বিনিয়োগ কমবে, সরকারি বিনিয়োগ বাড়বে। এভাবে জনগণের মৌলিক অধিকার রাষ্ট্র পূরণ করবে, রাষ্ট্র জনকল্যাণকর হবে।
অর্থনীতি সচল থাকে তখনই, যখন বাজারে উৎপাদন, চাহিদা এবং মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকে। ব্যাপারী চাষির কাছ থেকে ১০ টাকা কেজি দরে টমেটো কিনে ২ টাকা পরিবহন দিয়ে পাইকারের কাছে যদি ১৫ টাকা দরে বিক্রি করে, তাহলে তার আয় থাকে ৩ টাকা। ভোক্তা ওই টমেটো ১৮ থেকে ২০ টাকা দরে দোকান থেকে কিনতে পারে। এভাবে সুস্থ অর্থনীতি হওয়াটাই কাম্য। কিন্তু ব্যাপারী যদি ওই টমেটো বাজারে এনে দেখে টমেটোর দাম পড়ে গিয়ে ১২ টাকা হয়েছে, তাহলে অর্থনীতি সচল থাকে না, দেউলিয়া হয়ে যায়। আবার ব্যাপারীর কাছ থেকে ১৫ টাকা দরে টমেটো কিনে পাইকার যদি ২৫ টাকা দরে দোকানিকে বিক্রির জন্য দেয়, তাহলেও অর্থনীতি হয় না। হয় সিন্ডিকেটের লুটপাটের ক্ষেত্র। এই ক্ষেত্রে শোষিত হয় ভোক্তা, যারা এই শৃঙ্খলের শেষপ্রান্তে অবস্থান করে। রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকা তখন কী হতে পারে?
একটি সুস্থ অর্থনীতিতে উৎপাদনকারী ও ভোক্তার মধ্যে যারা ব্যবসা করেন, তাদের যেমন মুনাফা হওয়াটা দরকার, তেমনি এর দুই প্রান্তে অবস্থাকারী উৎপাদনকারী ও ভোক্তারও বেঁচে থাকা দরকার। উৎপাদনকারী তার শ্রমের বিনিময়ে বেঁচে থাকার জোগান পাবেন, ভোক্তা তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে পণ্য পাবেন। টমেটো উৎপাদনের খরচ যদি আট টাকা প্রতি কেজি হয়, তাহলে ব্যাপারী ১০ টাকা দরে তা কিনলে চাষি ২ টাকা বেঁচে থাকার জোগান পান। কিন্তু ব্যাপারী যদি ৬ টাকা দরে তা কিনতে চান এবং কারুর কাছ থেকে পেয়েও যান, তাহলে আবার তা হবে দেউলিয়া অর্থনীতি। এতে উৎপাদনকারী ও ভোক্তার মধ্যে যারা ব্যবসা করে তাদের ক্ষতি না হলেও মরেন চাষি। এ অবস্থায় রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকা কী হতে পারে?
সারা বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশের নেতারাও হাভাতের মতো পশ্চিমা দুয়ারে ঘুরে বেড়ান, উদ্দেশ্য পুঁজি আকর্ষণ। বলেন, আমাদের দেশে লগ্নি করুন। আমরা জমি দেব, শ্রম দেব, মান দেব, জান দেব, এমনকি স্বাধীনতাও বিসর্জন দেব। আমাদের নেতারা কোনো ধরনের রাখঢাক না করেই এই ভিক্ষাবৃত্তির পাল্লা দিয়ে যান। যদিও মুখে বলে বেড়ান, পুঁজির আমদানিতে বাজার অর্থনীতির প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করবে, উৎপাদনের মান বাড়বে, অর্থনীতি চাঙা হবে। আসল কারণ এই কাজে দালালি হিসেবে মোটা অঙ্ক পাওয়া যায়। অথচ এই পুঁজি অনেক ক্ষেত্রেই হয় কাগুজে; থাকে মিথ্যাচার আর প্রতারণার দর্শন।
লগ্নি হলেই কি অর্থনীতি চাঙা হয়? পুঁজির মালিক হোক বিদেশি বা দেশি কিংবা হোক জনগণের অর্থ আত্মসাৎকারী কোনো বেনামি ব্যক্তি, কেউই সদিচ্ছা নিয়ে নামে না। তা ছাড়া বাংলাদেশকে একটি ক্রমবর্ধমান ঋণ-জর্জরিত দেশ হিসেবে গড়ে তুলে পুঁজিবাদের বিকাশ অসম্ভব। বরং পুঁজিবাদের নামে এখানে যা হচ্ছে তা হলো রাতারাতি ধনী হওয়ার লোভ দেখিয়ে শেয়ারবাজারে জনগণের পুঞ্জীভূত মূলধন আত্মসাৎ, ছোট শিল্প উৎপাদনকারীদের বাজার আত্মসাৎ, শিল্প-কারখানার বর্জ্য নিক্ষেপ করে পরিবেশ আত্মসাৎ, দরাদরির মাধ্যমে মানুষের শ্রম ও মেধা আত্মসাৎ আর জাতীয় সম্পদ বহুজাতিক কোম্পানির হাতে দিয়ে স্বাধীনতা আত্মসাৎ।
বাজার অর্থনীতিতে মেধা ও শ্রম আত্মসাৎ হয় দুই প্রক্রিয়ায়; এক দর-কষাকষি ও চুক্তির সুযোগে ও দুই, অপেক্ষমাণ রাখার বাধ্যগত প্রক্রিয়ায়। সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় শ্রমিকের শ্রমহার ও নিরাপত্তার যে নিশ্চয়তা থাকে, বাগাড়ম্বরপূর্ণ বাজার অর্থনীতিতে তা আত্মসাৎ হয়ে যায়। আমাদের গার্মেন্টস শ্রমিকরা এই প্রক্রিয়ার শিকার, যেখানে পুঁজির মালিকরা ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কারণে বেকার জনশক্তিকে প্রতিযোগিতায় ফেলে সুবিধাজনক হার ও সময়ের ভিত্তিতে চুক্তি করে নেয়। বাজার অর্থনীতির কারণেই শ্রমিকদের প্রায়ই বেকার হয়ে পুঁজি মালিকদের অনুগ্রহের অপেক্ষায় থাকতে বাধ্য হয়।
মানুষ অর্থ ব্যয় করে, যা কেনে সেটাই পণ্য। আমরা আহারের জন্য খাদ্যশস্য ক্রয় করি, জীবনযাপনের জন্য কাপড় জামা ক্রয় করি, উপার্জনের যোগ্যতা অর্জনের জন্য শিক্ষা ক্রয় করি। এভাবে কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্যের সঙ্গে সেবাও একটি ক্রয়যোগ্য পণ্য। তবে পণ্যের বাজারে এত সবকিছু আছে, যার অনেক কিছুই মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় বলেই মনে হয় না। সভ্যতার নামে, বিজ্ঞানের উন্নতির নামে, প্রচারের অবিরাম প্রতাপে আমরা অনেক সময়ই বিষ আহার করি, জঞ্জাল নিয়ে জীবনযাপন করি, সেবা পেতে গিয়ে সর্বস্ব হারাই। দুর্নীতি ও দুঃশাসনপূর্ণ সরকার এসব না দেখে জনগণের ওপর নিপীড়কের ভূমিকাই পালন করে।
তবে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় যাই-ই হোক, তার চাহিদার ওপর দাম ওঠানামা করে। দেশে আলুর উৎপাদন বেশি হলে বাজারে তার দাম পড়ে যাবে। বন্যায় ফসল মার গেলে কাঁচা মরিচের দাম বাড়বে। মানুষের মধ্যে রোগবালাই বেশি হলে চিকিৎসার ব্যয় বাড়বে। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় লাখ লাখ ছাত্র এ প্লাস পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু ছাত্রদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়বে ও কোচিং সেন্টার বাড়বে। বৃষ্টির সময় রিকশা কমে গেলে ভাড়া বাড়বে। তবে পণ্য সময়মতো বাজার পেলে দাম সন্তোষজনক হবে, না পেলে দাম কমে যাবে। যেমনÑ খাদ্যের বাজার বা অন্য যেসব পণ্য সময়ের ব্যবধানে গুণমান হারায়।
খাদ্যপণ্য সময়ের ব্যবধানে নষ্ট হয়ে যায়। অনেক খাদ্য গুদামজাত করে নষ্ট হওয়া কিছুকাল রোধ করা গেলেও গুণমান হারায়। তাই কৃষিপণ্য যথাসম্ভব দ্রুত ভোক্তার কাছে না পাঠালে তার দাম কমে একসময় আবর্জনায় পরিণত হয়। শিল্পপণ্য সময়মতো ব্যবহার না করলে অব্যবহারযোগ্য হয়ে যায়। তাই সব পণ্যের একটি মেয়াদ থাকে, যার মধ্যে তা ভোক্তার কাছে পৌঁছে ব্যবহার হওয়া দরকার। উৎপাদন বাজারজাত করার ব্যবস্থা নিয়মিত না হলে উৎপাদনের একাংশ বা বড় অংশ নষ্ট হবে। চাষি কিংবা উৎপাদনকারী ওই নষ্ট হওয়া ক্ষতির মূল্য ধরেই পণ্য বাজারজাত করলে পণ্যের মূল্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে ওঠানামা করবে।
কৃষিজাত কাঁচামাল অনেক ক্ষেত্রে শিল্প থেকে ঘুরে প্রক্রিয়াজাত হয়ে এলে তা সহজে পচে না, কারণ তাতে পচননিরোধক ওষুধ মেশানো থাকে। এসব ওষুধ শরীরের জন্য ক্ষতিকারক হলেও শিল্পজাত খাদ্যের একটি সময়সীমা দেওয়া থাকে যে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আহার করলে ওই পচননিরোধক ওষুধ কম ক্ষতি করে। আজকাল সরাসরি ওষুধ মিশিয়ে কৃষিজাত খাদ্যবাজারে পাঠানো হচ্ছে, যা ভোক্তা কিনে অজান্তেই ক্ষতিগ্রস্ত হন। তবে উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে বেশি তারতম্য না হলে এবং বাজারজাত সময়মতো হলে ওষুধ মেশানোর প্রয়োজন হয় না।
আমরা প্রায় ক্ষেত্রেই সিন্ডিকেটের কথা শুনি। এই সিন্ডিকেট হলো কিছু লোকের একটা চক্র, যারা কোনো পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। বিশেষ ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে এবং দামের ক্ষেত্রে এই নিয়ন্ত্রণ হয়। যেমন ঢাকার খোলাবাজারে কোনো বিশেষ ধরনের চাল কী দামে বিক্রি হবে তারা তা নিয়ন্ত্রণ করবে। এই নিয়ন্ত্রণ ডালের ক্ষেত্রে, তেলের ক্ষেত্রে, চিনির ক্ষেত্রে হতে পারে। অর্থাৎ উৎপাদিত পণ্য যাই থাক না কেন, বাজারে তার সরবরাহ একটা চক্র নিয়ন্ত্রণ করবে। এ ধরনের চক্র আগে থেকেই আছে, আজকাল মোবাইলের কারণে তাদের সুবিধা হয়েছে।
আগে মোবাইল ফোন পুলিশ গোয়েন্দারাই পেতেন। এখন সবার হাতে মোবাইল গিয়ে দুর্বৃত্তদের কাজেই বেশি লাগছে। তাই চরিত্রটা তাদের আগের বা পরের একই। আগে এদের বলা হলো আড়তদার, কালোবাজারি; এখন বলে সিন্ডিকেট। বাজারে কোনো পণ্যের ঘাটতি হলে সরকার আমদানি করে বা মজুদ থেকে সরবরাহ বাড়িয়ে পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখবেÑ এটাই সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু ওই পণ্যের সিন্ডিকেট সরকারকে অকার্যকর করে দিয়ে ইচ্ছেমতো জোগান দিয়ে ও দাম নিয়ন্ত্রণ করে মুনাফা করে নেয়। তাই ভোক্তার স্বার্থে বাজার নিয়ন্ত্রণ করাটা অত্যন্ত জরুরি।
ভোক্তার স্বার্থে সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণ দপ্তরও আছে। তাদের কাজ বাজারে পণ্য সরবরাহের সঙ্গে চাহিদার সংগতি আছে কি না, পণ্যের মূল্য উৎপাদন বা আমদানি খরচের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না, পণ্যের গুণাগুণ নির্ধারিত মানসম্পন্ন কি না ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করা এবং অসংগতিপূর্ণ হলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া। যদি সব ঠিকমতো চলে তাহলে অভিযোগের কিছু নেই। যদি না হয় তাহলে বুঝতে হবে, হয় দপ্তরটি দুর্নীতিতে পূর্ণ হয়ে সিন্ডিকেটের অংশ হয়ে গেছে, নয় সেটি অযোগ্য মানুষের হাতে পড়ে অকার্যকর হয়ে গেছে। উভয় ক্ষেত্রেই বাজার চলে যাবে দুর্বৃত্তের হাতে।
বনের কাঠ কেটে নিয়ে বাজারে বিক্রি করলে জাতীয় আয় বাড়ে, অর্থনীতিও হয়; যদি বিধিবিধান মোতাবেক খাজনা দিয়ে করা হয়। নইলে তা হবে চোরাই কাঠ, যাবে দুর্বৃত্তের বাজারে, দেশের অর্থনীতি পথে বসবে, দুর্বৃত্তই হবে সরকার।
