হাইকোর্টের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা-২০১৫’ মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেয়ে প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ হয়েছিল একই বছরের ডিসেম্বরে। সেখানে গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা, সুরক্ষা, অধিকার ও তাদের সঙ্গে মানবিক আচরণসহ নানা বিষয় উল্লেখ রয়েছে। এর আগে ২০১৪ সালের জুলাইতে হাইকোর্ট এক আদেশে গৃহকর্মীদের অধিকার ও সুরক্ষায় আইন প্রণয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকারকে আদেশসহ রুল দিয়েছিল। পরে ২০১৭ সালের ফেব্রম্নয়ারিতে হাইকোর্ট গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় কেন্দ্রীয়ভাবে সিটি করপোরেশন, জেলা ও উপজেলায় মনিটরিং সেল গঠনের আদেশ দেয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নীতিমালা প্রণয়নের প্রায় চার বছর পরও এটি শুধু কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রচার ও সচেতনতার ঘাটতিতে অনেকে এ নীতিমালা সম্পর্কে জানেনই না। আর হাইকোর্টের আদেশের পর পাঁচ বছরের বেশি সময় পার হলেও আইন প্রণয়নে পদক্ষেপ নিতে পারেনি সরকার। মনিটরিং সেল গঠন করতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও প্রতিপালিত হয়নি যথাযথভাবে। ফলে গৃহকর্মী নিয়োগে অনিয়ম, তাদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ এবং নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলেছে। শ্রম আইন না মানায় শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকারও পাচ্ছেন না তারা। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বলছে, গৃহকর্মীদের সুরক্ষা ও অধিকারের প্রশ্নে আইন তৈরির পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। মনিটরিং সেলও পর্যায়ক্রমে গঠন করা হবে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন বয়সী নারী গৃহকর্মীর ওপর নির্যাতন, মৃত্যু ও আত্মহত্যার ৩২টি ঘটনা রেকর্ড করেছে। তাদের প্রতিবেদন অনুসারে, এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের সাতটি, ধর্ষণ ১২টি, এসিড নিক্ষেপ একটি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে আত্মহত্যার একটি ও নির্যাতনে একটি মৃত্যু রয়েছে। এছাড়া বাসাবাড়িতে ১০ গৃহকর্মীর মৃত্যুর কথা বলা হলেও মৃত্যুর ধরন বা নির্যাতন নিয়ে কিছু বলা হয়নি। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনার চেয়ে এ ধরনের ঘটনা আরও অনেক বেশি ঘটছে। অনেক ড়্গেত্রে ঘটনার পর আপস-মীমাংসায় বাধ্য হয় ভুক্তভোগী কিংবা তার পরিবার।
সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুরের স্যার সৈয়দ রোডের একটি বাসায় জান্নাতি নামে (১২) এক গৃহকর্মীকে নির্যাতনে হত্যার অভিযোগ উঠেছে গৃহকর্ত্রী রোকসানা পারভীন ও গৃহকর্তা সাঈদ আহমেদের বিরুদ্ধে। গত ২২ অক্টোবর ভোরে শিশুর বাবা জানু মোল্লাকে জানানো হয় তার মেয়ে অসুস্থ। ঢাকায় এসে হাসপাতালে তিনি জান্নাতির নিথর দেহ দেখতে পান। তার শরীরে ছিল অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন। পরে গ্রেপ্তার গৃহকর্ত্রী রোখসানা আদালতে স্বাীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালায় বলা আছে, গৃহকর্মীদের জন্য শোভন কাজ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, তাদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ঘুম, চিত্ত-বিনোদনের ব্যবস্থা, অসুস্থ হলে চিকিৎসা ও ছুটির অধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আর মহিলা গৃহকর্মীরা মাতৃত্বকালীন সময়ে প্রসবের আগে চার সপ্তাহ এবং প্রসবের পরে ১২ সপ্তাহসহ ১৬ সপ্তাহ ছুটি পাবেন। এছাড়া ১৮ বছরের কম বয়সীদের ভারী কাজ না দেওয়া, কর্মক্ষেত্রে শারীরিক ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া, নিয়মিত বেতনভাতা পরিশোধের কথা বলা হয়েছে। গৃহকর্মীর সঙ্গে অশালীন, আমানবিক আচরণ, দৈহিক বা মানসিক নির্যাতন হলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের সুরক্ষায় সরকারের হেল্প লাইন চালু করার কথাও রয়েছে। কিন্তু নীতিমালায় অনেক কিছু বলা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন।
আসকের নির্বাহী পরিচালক শিপা হাফিজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা শুধু গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন দেখে পরিসংখ্যান তৈরি করি। কিন্তু প্রতিনিয়তই এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে অনেকে আসেন। বেশিরভাগ ড়্গেত্রেই দেখা যায় গৃহকর্তা বা গৃহকর্মীরা খুব প্রভাবশালী। অনেকে মামলা করলেও গৃহকর্তারা আপসে বাধ্য করেন। ফলে নির্যাতিতরা বিচার পায় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে নীতিমালাটি হয়েছিল সেটি নিয়ে পরবর্তী সময়ে আর কাজ করা হয়নি। এ নিয়ে প্রচার-প্রচারণাও নেই। এ নীতিমালার আলোকেই গৃহকর্মীদের জন্য একটি আইন প্রণয়ন দরকার যাতে কতিপয় গৃহপরিচালকদের গ্রাস থেকে গৃহকর্মীদের রক্ষা করা যায়।’
একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ২ ফেব্রম্নয়ারি হাইকোর্ট এক আদেশে গৃহকর্মীদের অধিকার ও সুরক্ষায় মনিটরিং সেল গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল। আদেশে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালার ৬ ধারার বিধান অনুযায়ী কেন্দ্রীয়ভাবে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে এবং সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি করে ছয় মাসের মধ্যে মনিটরিং সেল গঠন করতেও বলা হয়। এছাড়া গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় নীতিমালা অনুসরণ করতে বলা হয়।
এ বিষয়ে রিটকারী হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০১৪ সালের হাইকোর্টের আদেশ ও রুলের পরিপ্রেক্ষিতে গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় নীতিমালা হয়েছিল। নীতিমালার আলোকে আইন তৈরির কথা বলা হয়েছিল। এরপর ওই রিট আবেদনটি করা হয়। এরপর মনিটরিং সেল গঠনের ব্যাপারে সবশেষ অবস্থা আমাদের জানানো হয়নি। আদৌ গঠন হয়েছে কি না তাও জানা নেই।’
শ্রম ও কর্ম সংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব কেএম আলী আজম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমরা এ সংক্রান্ত আইন তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছি। আগামী মাসে এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের বৈঠক হবে। আর মনিটরিং সেলের বিষয়ে আমাদের মন্ত্রণালয়ে একটি ইউনিট রয়েছে। তারা এ নিয়ে কাজ করছে। পর্যায়ক্রমে মনিটরিং সেলও গঠন করা হবে।’
বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্দেশনা যাদের পালন করার কথা আমার মনে হয় তারা উচ্চ আদালত কী বলল না বলল এ নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামান না। যে কারণে নির্দেশনাগুলোও বাস্তবায়ন হয় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয়, যে হারে গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন বাড়ছে, তাতে বিদেশে গৃহকর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া ও তাদের পাঠানো নিয়ে নীতিমালা বা আইন থাকা উচিত।’
