ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনগুলোর কাউন্সিল জোরেশোরে চলছে তখন বিএনপির অঙ্গ সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন থমকে আছে। নিয়মিত কাউন্সিল না হওয়ায় আন্দোলন সংগ্রামে অনীহা বেড়েছে। পদ-পদবি না পাওয়ায় রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে এমন অভিযোগ করেছেন ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা। তারা বলেন, অতীতে যেকোনো আন্দোলন সংগ্রামে ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক ও শ্রমিক দল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু সাম্পªতিককালে এসব সংগঠনে চলছে স্থবিরতা।
অঙ্গ সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের এসব বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে সারা দেশের তৃণমূল পর্যায় থেকে দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের যেভাবে নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হচ্ছে তাতে সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ তাদের সুবিধামাফিক যেকোনো সময়ে যেকোনো সংগঠনের কাউন্সিল করছে, তাদের সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু বিএনপিকে তো অনুমতি দিতে চায় না। এরপরও লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন অঙ্গ সংগঠনগুলোর পুনর্গঠনের জন্য। পর্যায়ক্রমে সব অঙ্গ সংগঠন পুনর্গঠন করা হবে।
ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রাজীব আহসান ও সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসানের নেতৃত্বাধীন কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মোহাম্মদ আরিফ। রাজীব-আকরাম কমিটি ভেঙে দেওয়ার পর এখন কোনো সংগঠনে পদ-পদবি নেই। এ অবস্থায় যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে জায়গা পেতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। আরিফ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছাত্রদলের বিগত কমিটির অনেকেরই এখন কোনো পদ-পদবি নেই। পদ-পদবি না থাকায় আগ্রহ নিয়ে রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামে অংশ নিতে চান না অনেকে। তাছাড়া নিয়মিত কাউন্সিল না হওয়ায় ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটির অনেকেই এখন পরিচয়হীন। যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে জায়গা পাব এ আশায় বসে আছি। কিন্তু কবে হবে কমিটি তা বলা যাচ্ছে না। শোনা যাচ্ছে ২৬ নভেম্বর যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে। আশায় বুক বেঁধে আছি দলের একটা পরিচয় পাওয়ার জন্য।
তিনি বলেন, আজ শনিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী যুবলীগের সপ্তম কংগ্রেস হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগের কমিটি হয়েছে। বিএনপির অঙ্গ সংগঠনগুলোর গতি বৃদ্ধি পেলে ভালো হয়। তাহলে পরিচয়হীন অবস্থায় থাকতে হয় না নেতাকর্মীদের। আন্দোলনেরও গতি আসে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লাহ বুলু ও যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কমিটির সদস্য ছিলেন এইচএম দীন মোহাম্মদ। আলাল-নীরব কমিটির পল্লী উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদকও ছিলেন তিনি। গতকাল দেশ রূপান্তরকে দীন মোহাম্মদ বলেন, যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে যথাযোগ্য মূল্যায়ন হবে এমন আশায় বসে আছি। দীর্ঘদিন ধরে নেতাকর্মীদের পরিচয় না থাকায় তাদের মধ্যে রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামে অনীহা কাজ করছে। কমিটিতে জায়গা পেলে আন্দোলন গতিশীল হতো।
বিএনপির অঙ্গ সংগঠনগুলোর বর্তমান চিত্র : গত ১৯ সেপ্টেম্বর ছাত্রদলের ষষ্ঠ কাউন্সিল হয়। কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ ভোটে ছাত্রদলের নতুন সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন ফজলুর রহমান খোকন এবং সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন ইকবাল হোসেন শ্যামল। কাউন্সিলের পর এক সপ্তাহের মধ্যে ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কথা থাকলেও তা করতে পারেননি নতুন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। কাউন্সিলের পর ইতিমধ্যে দুই মাস কেটে গেছে।
এদিকে যুবদল প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৭৮ সালে। তিন বছর অন্তর সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি হওয়ার কথা থাকলেও ৪১ বছরে কমিটি হয়েছে মাত্র ছয়বার। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে সাইফুল আলম নীরবকে সভাপতি ও সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে সাধারণ সম্পাদক করে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। তখন বলা হয়েছিল, এক মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হবে। কিন্তু এখন মেয়াদ শেষ হওয়ার আগমুহূর্তে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে নেতারা তৎপর হয়েছেন। যদিও জানুয়ারি মাসে কমিটির মেয়াদ শেষ হবে। অবশ্য এর আগে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও সাইফুল আলম নীরবের নেতৃত্বে যুবদলের যে কমিটি ছিল তারা দ্রুতই পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করেছিলেন। পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন হয়েছে কি না জানতে চাইলে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কাজ চলছে। শিগগিরই তা ঘোষণা করা হবে।
২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর শফিউল বারী বাবুকে সভাপতি ও আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েলকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাত সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। গত অক্টোবর মাসে তাদের মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু কমিটি করতে পারেননি তারা। পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কাজ কতদূর জানতে চাইলে স্বেচ্ছাসেবক দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক সাইফুল আলম ফিরোজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি।
২০১৪ সালের ১৯ ও ২০ এপ্রিল দুদিনব্যাপী সম্মেলনের তিন দিন পর আনোয়ার হোসেইনকে সভাপতি, নুরুল ইসলাম খান নাসিমকে সাধারণ সম্পাদক ও জাকির হোসেনকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ৩৫ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। প্রায় তিন বছর ধরে কেন্দ্রীয় শ্রমিক দলের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে আছে। তাদের এখন কোনো কার্যক্রম নেই বললেই চলে।
গত ১৪ মে শ্রমিক দল পুনর্গঠন নিয়ে সংগঠনটির নেতাদের সঙ্গে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে স্কাইপিতে কথা বলেন লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকের পর শ্রমিক দলের কাউন্সিলের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেইন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নাসিমকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার মোবাইল ফোন নাম্বারও নেই। তাকে পাওয়া না গেলে অন্যরা মিলে বৈঠক করে কাউন্সিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন তারা।
