টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিটিআরসি) নিরীক্ষা দাবির মোট পাওনার মধ্যে আপাতত দুই হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর গ্রামীণফোন (জিপি) লিমিটেডকে নির্দেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। গ্রামীণফোনের কাছে বিটিআরসির ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা নিরীক্ষা দাবির নোটিসের ওপর হাইকোর্ট যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, সেটি বহাল রেখে গতকাল রবিবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বেঞ্চ অন্তর্বর্তীকালীন এই নির্দেশ দিয়েছে। গ্রামীণফোন আপিল বিভাগের এই নির্দেশ মানতে ব্যর্থ হলে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞাও বাতিল হয়ে যাবে, তখন গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে যেকোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে বলে বিটিআরসির আইনজীবী জানিয়েছেন।
আপিল বিভাগের আদেশের পর গ্রামীণফোনের আইনজীবী মেহেদী হাসান চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুই হাজার কোটি টাকা না দিলে তিন মাস পরে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়ে যাবে। আমরা আদেশ পাওয়ার পর গ্রামীণফোনের সঙ্গে আলাপ করব তারা এ আদেশের রিভিউ করবে কি না। তিন মাস সময় আছে। আর এক মাসের মধ্যে রিভিউ করার জন্য সুযোগ আছে।’
এ বিষয়ে বিটিআরসির আইনজীবী খন্দকার রেজা-ই-রাকিব বলেন, ‘বিটিআরসির যে পাওনা ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা, এর মধ্যে তারা (গ্রামীণফোন) যদি দুই হাজার কোটি টাকা এখন না দেয়, তাহলে হাইকোর্ট থেকে যে নিষেধাজ্ঞা নিয়েছিল, সেটা ভ্যাকেট হয়ে যাবে। এর অর্থ হলো, এখন গ্রামীণফোনকে দুই হাজার কোটি টাকা দিতে হবে। তারা যদি না দেয়, তাহলে যেকোনো অ্যাকশন নিতে বিটিআরসির সামনে আইনগত আর কোনো বাধা থাকবে না।’ এক প্রশ্নের জবাবে রেজা-ই-রাকিব বলেন, ‘এটা তো ফাইনাল সেটেলমেন্ট নয়। এখন দুই হাজার কোটি টাকা দিলে পরবর্তী সময়ে যদি দেখা যায় মামলায় বিটিআরসি আরও বেশি টাকা পাবে, তাহলে গ্রামীণফোনকে তা দিতে হবে। এই টাকাটা গ্রামীণফোন যত তাড়াতাড়ি দেবে ততই তাদের জন্য ভালো। তবে আমরা এখন মোটামুটি সেটিসফায়েড, কারণ এটা তো ফাইনাল সেটেলমেন্ট নয়।’
বিটিআরসির আইনজীবী বলেন, ‘আমরা সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা চেয়েছি, এটা নিয়ে কোর্টে মামলা চলছে। ওই মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার পর জানা যাবে যে, বিটিআরসি আর কত পাবে।’
আদালতের আদেশের পর গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা আদালতের লিখিত আদেশের জন্য অপেক্ষা করছি। সম্মানিত আইসিটি উপদেষ্টা এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে নিরীক্ষা সংক্রান্ত বিরোধ সমাধানের বিষয়ে আমরা আমাদের আগ্রহ পুনর্ব্যক্ত করতে চাই। বিটিআরসির ওপর হাইকোর্টের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে এবং ত্রুটিপূর্ণ অডিট রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে গ্রামীণফোনের ওপর কোনো প্রকার পদক্ষেপ নেওয়ার ড়্গেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। আমরা আশা করছি, আদালতের ওপর আস্থা রেখে বিটিআরসি হাইকোর্টের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা মেনে চলবে এবং গ্রামীণফোনকে পরিকল্পিত নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং গ্রাহকদের সেবা প্রদানে বাধা দেবে না।’
এ বিষয়ে গত ১৮ নভেম্বর শুনানি শেষে গতকাল আদেশের দিন ধার্য ছিল। এই সময়ের মধ্যে এ নিয়ে অন্য কোনো ফোরামে মধ্যস্থতার উদ্যোগ না নিতে গ্রামীণফোনকে নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। শুনানিতে গ্রামীণফোনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এএম আমিন উদ্দিন, শেখ ফজলে নূর তাপস ও মেহেদী হাসান চৌধুরী। বিটিআরসির পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহবুবে আলম। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী খন্দকার রেজা-ই-রাকিব।
এর আগে বিটিআরসির ওই পাওনা দাবির মধ্যে গ্রামীণফোন কত দিতে পারবে তা জানাতে দুই দফা সময় দেওয়ার পর গত ১৪ নভেম্বর আদালতে শর্তসাপেক্ষে আপাতত ২০০ কোটি টাকা দিতে রাজি হয় প্রতিষ্ঠানটি। আর ওই পাওনার অন্তত ৫০ ভাগ পরিশোধ করে পরবর্তী সময়ে আলোচনার মাধ্যমে বাকি টাকার বিষয়ে সিদ্ধান্তের প্রস্তাব করে বিটিআরসি।
গত ১৭ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) এক আদেশে গ্রামীণফোনের কাছে বিটিআরসির ওই পাওনা আদায়ের ওপর দুই মাসের অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা জারি করে হাইকোর্ট। এরপর হাইকোর্টের এ আদেশের বিরুদ্ধে বিটিআরসি গত ২০ অক্টোবর আপিল বিভাগে আবেদন করে। এরপর কয়েক দফা শুনানি শেষে গতকাল সর্বোচ্চ আদালত থেকে এ সিদ্ধান্ত এলো।
বিটিআরসির দাবি অনুযায়ী, ১৯৯৬-২০১৭ সাল পর্যন্ত যন্ত্রপাতি আমদানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে গ্রামীণফোনের কাছে নিরীক্ষা আপত্তি দাবির ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা এবং রবি আজিয়াটার কাছে ৮৬৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে সংস্থাটির। টাকা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ওই দুটি প্রতিষ্ঠানকে লাইলেন্স বাতিলের হুমকি দিয়ে গত ২ এপ্রিল নোটিস দেয় বিটিআরসি।
এ বিষয়ে সুরাহা না হওয়ায় বিটিআরসির পাওনার বিষয়ে গত আগস্টের শেষ সপ্তাহে ঢাকার সংশ্লিষ্ট দেওয়ানি আদালতে স্বত্বের মামলার (টাইটেল স্যুট) আবেদন করে গ্রামীণফোন। সেই আবেদনটি গৃহীত হয়ে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। ওই আবেদনের অধীনে বিটিআরসির পাওনা আদায়ের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন জানানো হলে গত ২৮ আগস্ট নিম্ন আদালতে সেটি খারিজ হয়ে যায়। পরে ওই খারিজাদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে গ্রামীণফোন।
