ফোর টায়ার জাতীয় ডেটা সেন্টার উদ্বোধনকালে এটিকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে আরেক ধাপ অগ্রণী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে গাজীপুরের কালিয়াকৈর বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটিতে এ
ডেটা সেন্টারের উদ্বোধন করেন।
দেশের উন্নয়নের জন্য ডেটা সংরক্ষণ জরুরি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম তারই অংশ হিসেবে এই ডেটা সেন্টারটি প্রতিষ্ঠা করা হলো। এই ডেটা সেন্টারটি স্থাপনের পর ডেটা সংরক্ষণের জন্য আমাদের আর অন্য কারও ওপর নির্ভর করতে হবে না। এর মাধ্যমে বছরে সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা আয় বা খরচ সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।’
চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটিতে সাত একর জমির ওপর গড়ে তোলা এ ডেটা সেন্টারটির নির্মাণকাজ ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিং পিং যৌথভাবে এর নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এই ডেটা সেন্টারটি ইতিমধ্যেই বিশ্বের সেরা মান নির্ধারণ প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘আপ টাইম ইনস্টিটিউট’ থেকে মাননিয়ন্ত্রণের জন্য সনদ অর্জন করেছে।
ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ (প্রথম সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে প্রদত্ত সৌরবিদ্যুৎ সুবিধার, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে কাপ্তাই লেকে ভ্রাম্যমাণ গবেষণা তরী (রিসার্চ ভেসেল) এবং বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের পাঁচটি নতুন জাহাজেরও উদ্বোধন করেন।
এটি বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম ও এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম ডেটা সেন্টার। এর আপটাইম ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এখানে ডেটা স্টোরেজ ব্যাকআপ, রিকভারি, ডেটা সিকিউরিটি, ডেটা শেয়ারিং, ই-গভর্ন্যান্স, ই-সার্ভিস পাওয়া যাবে। এর তথ্য ধারণ ক্ষমতা দুই পেটাবাইট (১০ লাখ গিগাবাইট=১ পেটাবাইট)। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি, স্পেনের দুটি, সৌদি আরবের এবং কানাডার একটি করে ‘টায়ার ফোর ডেটা সেন্টার’ রয়েছে।
’৯৬ পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগের সরকার গঠনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি খাতে মোবাইল ফোন উন্মুক্তকরণ এবং তার আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের পরামর্শে কম্পিউটারসামগ্রী থেকে ট্যাক্স প্রত্যাহারসহ দেশকে প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে ওঠায় তার সরকারের বিভিন্ন বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ তুলে ধরেন।
প্রতিহিংসার রাজনীতির একটি উদাহরণ তুলে ধরে ২০০১ পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের একটি পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তার সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় নেদারল্যান্ডসের একটি কোম্পানির কাছ থেকে অর্ধেক দামে ১০ হাজার কম্পিউটার কেনার একটি সরকারি উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১০ হাজার স্কুলকে কম্পিউটার প্রদানের একটি তালিকা করা হয়েছিল। সে অনুযায়ী নেদারল্যান্ডস সরকারের সহযোগিতায় সেখানকার একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ হাজার কম্পিউটার অর্ধেক দামে ক্রয়ের চুক্তিও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নেদারল্যান্ডসের জাতীয় ফুল টিউলিপের নামে ওই কম্পিউটার কোম্পানিটির নাম হওয়ায় পরবর্তী সময়ে সরকার পরিবর্তনের পর বিএনপি নেতৃবৃন্দ খালেদা জিয়াকে বোঝাল শেখ রেহানার মেয়ের নামে যেহেতু কোম্পানি (ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকী), তাই ওদের কম্পিউটার নেওয়া যাবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পরে সেই কম্পিউটার তো দেশে এলোই না, বরং ওই টিউলিপ কোম্পানির রুজু করা মামলায় বাংলাদেশকে ৩২ কোটি অতিরিক্ত টাকা জরিমানা গুনতে হলো। নামের প্রতি প্রতিহিংসা দেখাতে গিয়ে খালেদা জিয়া সরকার দেশের ৩২ কোটি টাকা গচ্ছা দিল। আর আমরা যে টাকা জমা দিয়েছিলাম তাও গেল। সবটাই লোকসান!’ সে সময় সরকারের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ এবং স্কুলপর্যায়ে কম্পিউটার সরবরাহে তার সরকারের উদ্যোগটাও থেমে গিয়েছিল, বলেন তিনি।
শেখ হাসিনা মোবাইল ফোনকে জনগণের নাগালের মধ্যে আনায় তার সরকারের পদক্ষেপের উল্লেখ করে বলেন, ‘আমি এ সম্পর্কে জানতাম (বিএনপির এক মন্ত্রীর মনোপলি ব্যবসা), তাই ক্ষমতায় এসেই আমি এই মোবাইল ফোনকে উন্মুক্ত করে দিলাম বেসরকারি খাতে। যাতে প্রত্যেকের হাতে এটি পৌঁছে যায়।’ ‘সত্যিই আজকে আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি’ উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্ক নির্মাণ এবং সারা দেশে ২৮টি আইটি পার্ক স্থাপনের উদ্যোগও তুলে ধরেন।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি আনন্দিত এই ডেটা সেন্টারটি তৈরি হয়ে যাওয়ায়। এটি আমাদের দেশের জন্য যথেষ্ট সুযোগ করে দেবে।’
প্রধানমন্ত্রী চারটি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে প্রকল্প এলাকার প্রশাসন এবং বিভিন্ন শ্রেণি পেশার জনগণের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, সংসদ সদস্যসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মণি, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈ সিং, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী, বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং গণভবন প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক মো. আবুল কালাম আজাদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান এবং প্রেস সচিব ইহসানুল করিমও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে ঢাকার পাশে থাকবে রিয়াদ : রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন সৌদি আরবের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) জেনারেল ফায়াদ বিন হামিদ আল-রুওয়াইলি। সৌদি সিজিএস গতকাল বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে আরও বলেন, রিয়াদ এই ইস্যুতে সব সময়ই ঢাকার পাশে থাকবে।
বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। সৌদি আরব ও বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে চমৎকার সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে জেনারেল ফায়াদ বলেন, দিন দিন এই সহযোগিতা বাড়ছে।
এ সময় বাংলাদেশ ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ (এনডিসি) প্রদত্ত প্রশিক্ষণের প্রশংসা করেন সৌদি সিজিএস।
ইয়েমেন ইস্যুতে সৌদি আরবের অবস্থান ব্যাখ্যা করে জেনারেল ফায়াদ বলেন, ‘আমরা আগ্রাসনে যেতে চাই না, আমরা শান্তি চাই।’ এ সময় সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশের নেওয়া পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।
মুসলিম উম্মাহর মধ্যে দ্বন্দ্বের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে ভ্রাতৃত্বের দ্বন্দ্বের অবসান করা উচিত। দ্বন্দ্বের কারণে এই সুবিধাটি অস্ত্র বিক্রেতাদের কাছে যায়। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে উসকানি দেওয়া হয়েছে। তবে আমরা বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে চাই। বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য তার দেশের আকাক্সক্ষার কথা জানান জেনারেল ফায়াদ।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল মো. মাহফুজুর রহমান এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীকে মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের প্রেসিডেন্টের ফোন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গতকাল বিকেলে টেলিফোনে কুশল বিনিময় করেছেন মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট হিলডা সি হেইনে। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের বলেন, হিলডা হেইন বাংলাদেশের জনগণের অব্যাহত শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। প্রধানমন্ত্রীও মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের জনগণের শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। বাসস
