বিয়ের পিঁড়ি থেকে দক্ষিণ এশিয়ার সেরা ইতি

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:৩৯ এএম

যখন সহপাঠীদের সঙ্গে বেণী দুলিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, যখন খেলার মাঠে বৌচি, ফুল টোক্কা খেলার কথা, সেই বয়সেই বাবা-মা জোর করে তাকে বসাতে চেয়েছিল বিয়ের পিঁড়িতে। মাত্র বাল্যবিবাহের বলি হতে চায়নি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া মেয়েটি। তাই তো খুঁজছিল মুক্তির পথ। বিয়ের দিন-তারিখও ঘনিয়ে আসে। সে সময়ই নিজ জেলা চুয়াডাঙ্গায় দেখেন চলছে আরচারির প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি। হয়তো সেখানেই মুক্তির পথ দেখছিলেন ইতি। যোগ দেন উন্মুক্ত ট্রায়ালে। স্থানীয় এক কোচের সহযোগিতায় তীর-ধনুকের প্রথম পরীক্ষায় উতরেও যান। তারপরও বিয়ের চাপ চলতেই থাকে। তাই তো বিয়ের পিঁড়ি থেকে পালিয়ে যান। ‘নিশানাভেদটা’ সেদিন ভালোই করেছিলেন বলেই সেই কোচের মাধ্যমেই চলে আসেন জাতীয় পর্যায়ের কোচদের আওতায়। প্রতিভা বুঝতে পেরেই তাকে দলে নিয়ে নেন তীরন্দাজ সংসদ। সেখানেই তার আরচারির পাঠ। সেখান থেকেই আজ তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সেরা আরচারদের একজন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে ইতি অংশীদার হয়েছেন বাংলাদেশের দুটি দলগত সোনার পদকের। আজ তার সামনে হাতছানি একক ইভেন্টে সেরা হওয়ার।

বাল্যবিবাহের বলি না হতে লড়াই করেছেন ইতি। সেই লড়াইয়ে জয়ী হয়ে এই মেয়ে এখন দেশের পতাকা সবার ওপরে তুলে ধরেছেন। মাত্র দু’বছরের মধ্যে ইতি এভাবে জ্বলে ওঠায় খোদ আরচারি ফেডারেশন সাধারণ সম্পাদক কাজী রাজিবউদ্দিন আহমেদ চপল ইতিকে পরিচয় করিয়ে দিতে চান বিস্ময় বালিকা হিসেবে। কাল মেয়েদের রিকার্ভ দলগত ইভেন্টে সোনা জয়ের পর তারকা রোমান সানার সঙ্গে জিতেছেন মিক্সড টিম সোনা। তারপরও জীবনের কষ্টকর অতীত নিয়ে কিছু বলতে চাননি ইতি। বরং এককে সেরা হয়েই এ বিষয়ে কথা বলবেন, ‘এখন কিছুই বলতে চাই না। আগে তো এককের সোনা জিতি।’ তবে নিজের ছেলের ক্লাব তীরন্দাজ সংসদের আরচার ইতিকে নিয়ে অনেক কথাই বলেছেন চপল, ‘ইতি আসলে একটা বিস্ময় বালিকা। এত অল্প বয়সে এখানে কেউ খেলে না। ২০১৭ সালে প্রতিভা অন্বেষণের সময় তাকে পেয়েছি। সোহেল আকরাম নামে এক কোচ চুয়াডাঙায় খোঁজ পান ইতির। তিনিই আমার বড় ছেলেকে ওর সম্পর্কে জানালেন। আমার ছেলেও তাকে পরিচর্যার ভার নিয়ে নিল। শুনেছি তখনই নাকি ওর বিয়ে পাকা হয়ে গিয়েছিল। অল্প বয়সে বিয়ে থেকে বাঁচতেই তিনি আরচারিকে অবলম্বন করেছিলেন। বড় বিপদ থেকে এই খেলাটা তাকে বাঁচিয়েছে। তাই আজ এর ঋণ শোধ করলেন ইতি।’

ইতিকে কেবল দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হিসেবেই দেখতে চান চপল। ওর মাঝে সহজাত প্রতিভা দেখতে পেয়েই ওকে দিয়ে আকাশছোঁয়ার কথা বললেন চপল, ‘ইতির তো স্বপ্ন ও কারও মতো হবে না। ও নিজের মতো করেই একসময় বিশ্বকে কাঁপিয়ে দেবে। ওর বাবা-মা একসময় ওকে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। আর ও চেয়েছিল পড়ালেখা করে মানুষ হতে। আর এখন ও রীতিমতো দেশবরেণ্য আরচারে পরিণত হয়েছে।

ইতি আসলে বড় রেসের ঘোড়া সেটা বোঝা গেছে যখন সেমিফাইনালে তিনি হারিয়ে দেন সদ্য এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে ২০২০ অলিম্পিকের কোটা প্লেস পাওয়া ভুটানি আরচার কারমাকে ৬-০ সেটে হারিয়ে। চপল বলেন, ‘যদি আপনারা ওর কালকের খেলা দেখতেন। ভুটানের কারমা অলিম্পিকে নাম লিখিয়েছে। তার কারণেই ইতি কোটা পায়নি। সেই প্রতিশোধটাই আজ নিয়ে নিল ইতি।’

ইতির মধ্যে চপল দেখেন এক সময়ের দেশসেরা আরচার শেখ সজীবের মতো প্রতিভা। তবে তিনি চান না ইতি সজীবের মতোই অল্প সময়েই ইতি টানুক ক্যারিয়ারের। বরং স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে ইতি হোক আরচারির নতুন নক্ষত্র।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত