যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:৩৯ পিএম

শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলীম চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরীর জন্ম ১৯৪২ সালের ২২ এপ্রিল, শেরপুরের চন্দকোনা থানার বন্দটেকি গ্রামে। তিনি টাঙ্গাইলের কুমুদিনী কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর করে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ভারতেশ্বরী হোমসে। দুবছর পর ঢাকা ইংলিশ প্রিপারেটরি স্কুলে (বর্তমানের উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়) যোগ দেন। ১৯৬৫ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. আলীম চৌধুরীর সঙ্গে শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। একাত্তরের ১৫ ডিসেম্বর বিকেলে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা ডা. আলীমকে ধরে নিয়ে হত্যা করে। বধ্যভূমিতে দেশের অন্য সূর্যসন্তানদের সঙ্গে তার লাশও পাওয়া যায়। স্বাধীনতার পর দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে শ্যামলী নাসরিন চৌধুরীর সংগ্রাম শুরু হয়। উদয়ন স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘ ৩৬ বছর। এগোরো বছর ছিলেন প্রধান শিক্ষিকা। ২০০২ সালে চারদলীয় জোট সরকারের সময় তিনি চাকরিচ্যুত হন। এরপর কয়েকজন সাবেক সহকর্মীর সঙ্গে মিলে ঢাকার লালমাটিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন উদ্দীপন বিদ্যালয়। এখন তিনি এ স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী ২০০১ সালে শিক্ষায় একুশে পদক পেয়েছেন। ২০১৩ সালে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে ১৩তম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য প্রদান করেন। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে তার সঙ্গে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সম্পাদকীয় বিভাগের অনিন্দ্য আরিফ

দেশ রূপান্তর : আপনার স্বামী ডা. আলীম চৌধুরীকে বিজয়ের ঠিক আগ মুহূর্তে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই স্মৃতি যদি মনে করতে পারেন?

শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী : সেদিন ছিল ১৫ ডিসেম্বর। তখন বিকেল সাড়ে ৪টা। আমরা আমাদের বাড়ির দোতালার বারান্দায় বসে ভারতীয় বিমানবাহিনীর বোমাবর্ষণ প্রত্যক্ষ করছিলাম। রেডিওতে তখন বারবার পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করতে বলার খবর প্রচার করা হচ্ছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কোনো বাধা দিতে পারছে না। রেডিও শুনে এবং এসব ঘটনা দেখে আমাদের মনে হয়েছিল বিজয়ের আর বেশি বাকি নেই। আমরা ভেতরে ভেতরে উল্লসিত ছিলাম। ৯ মাসের নির্যাতনের অবসান হবে ভেবে আমরা আনন্দ বোধ করছিলাম। ভারতীয় মিগ যে বোমাবর্ষণ করছিল, তা দেখে আমাদের মধ্যে কোনো ভয় কাজ করছিল না। কারণ তারা তো সাধারণ জনগণের ওপর বোমা ফেলছিল না। তাদের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ঘাঁটিসমূহ। আমার স্বামী ডা. আলীম চৌধুরী তখন হাসতে হাসতে বলছিলেন, ‘দেখ আকাশটা যেন ভারতীয় আকাশে পরিণত হয়েছে।’ আমাদের বাসার নিচের তলায় থাকত আলবদরের সংগঠক মওলানা আবদুল মান্নান। তাকে উদ্দেশ করে তিনি বলছিলেন, ‘মান্নানরা বোকার স্বর্গে বাস করছে। ওরা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর এসে ওদের বাঁচাবে। কিন্তু ওরা বুঝতে পারছে না আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো বা আমরা বিজয় লাভ করব।’ এটা বলেই তিনি হো হো করে হাসছিলেন। আমিও সেই হাসিতে যোগ দিয়েছিলাম। ভাবতেই ভালো লাগছিল যে, আমরা বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছি। এই সময় একটা গাড়ির শব্দ পেলাম আমরা। কাদামাটি দিয়ে লেপা একটি মাইক্রোবাস আমাদের পুরানা পল্টনের বাসার সামনে থামল। গাড়িটা মান্নান যে অংশে থাকত, সেই অংশের সামনেই থামল। আমরা তেমন শঙ্কিত হলাম না। কেননা, তার কাছে প্রায়ই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লোকজন আসত এবং অনেকক্ষণ থাকত। আমার স্বামী শুধু বললেন, ‘বেশি উঁকি-ঝুঁকি মেরো না। ভেতরে চলে এসো।’ আমরা সবাই তখন ভেতরে চলে গেলাম। ওরা মান্নানের বাসায় ২৫-৩০ মিনিট থাকার পর উপরে উঠে এলো এবং আমাদের দরজায় প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা দিতে লাগল। দরজায় মনে হয় প্রচণ্ড জোরে লাথি মারছিল আর পরিষ্কার বাংলায় বলছিল, ‘দরজা খুলুন।’ আমি তখন জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম যে, কয়েকজন আলবদর দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। মান্নানের দরজার সামনে সবসময় আলবদরের পাহারা থাকায় আমরা তাদের পোশাক চিনতাম। নীল শার্ট আর ছাই রঙের প্যান্ট তাদের পরিধানে ছিল। আলবদরদের দেখে আমি ঘাবড়ে গেলাম। আমার স্বামীও ভয় পেয়েগিয়েছিলেন। তার মুখটা কালো হয়ে গিয়েছিল। তাকে আমি বললাম, ‘এখন কী হবে? ওরা তো দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে।’ তিনি নিরুপায় হয়ে বললেন, ‘খুলে দাও। খুলে না দিলে তো ওরা ভেঙে ঢzকে যাবে।’ ওরা ভেঙে ঢুকলে তো গুলি চালাতে পারে। বাসায় তো আমাদের বাচ্চারা রয়েছে। ওদের বয়স তখন ২-৩ বছর। আলীম তখন দৌড়ে নিচের তলায় যাওয়ার চেষ্টা করলেন। নিচের তলায় মান্নান থাকত। কিন্তু যাওয়ার জন্য যে দরজাটা সবসময় খোলা থাকত, সেটা বন্ধ ছিল। অনেক ধাক্কাধাক্কির পর মান্নান দরজাটা একটু ফাঁকা করে বললেন, ‘আপনি যান। কোনো সমস্যা নেই।’ তখন তিনি নিরুপায় হয়ে ফিরে এলেন। ফেরার আগে কাজের ছেলেদের দরজা খুলতে বললে তারা তা খুলে দেয়। ওরা ভেতরে ঢুকে আলীম চৌধুরীকে দেখে বলে, ‘হ্যান্ডস আপ।’ ওদের কেউ জিজ্ঞেসও করল না, আলীম চৌধুরী কে? কারণ, আলীমকে মান্নান আগে থেকেই চিনিয়ে দিয়েছে। আলীম তখন বলল, ‘আমি কাপড় পরিবর্তন করে আসি।’ ওরা দরকার নেই বলে আলীমকে ওই অবস্থায় নিয়ে গেল। আমি তখন মওলানা মান্নানের কাছে ছুটে গেলাম। খেয়াল করলাম একতলায় যাওয়ার দরজাটা খোলা রয়েছে। আমি তাকে বললাম, ‘তাকে তো কয়েকজন ধরে নিয়ে গেছে। আপনি কিছু করেন।’ সে প্রথমে উত্তর না দিলেও আমি ক্রমাগত অস্থিরতা দেখানোয় বলল, ‘চিন্তা করবেন না। চারিদিকে তো বোমাবর্ষণ হচ্ছে, ওরা তাকে সিএমএইচে নিয়ে গেছে। ডা. ফজলে রাব্বীকেও নিয়ে গেছে।’ কিন্তু আলীম চৌধুরী আর ফেরেননি। দেশ স্বাধীন হওয়ার দুই-তিন দিন পর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে ডা. রাব্বীর পাশেই তার লাশ পাওয়া যায়।

দেশ রূপান্তর : মুক্তিযুদ্ধের সময় জাতিকে মেধাশূন্য করতে আপনার স্বামীসহ অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদররা। স্বাধীনতা প্রাপ্তির এত বছর পর সেই শূন্যতা কি পূরণ হয়েছে?

শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী : শূন্যতা কখনো পূরণ হয় না। তবে আমরা বঙ্গবন্ধুর সময় যে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়েছিল, তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হতাশ ছিলাম। কিন্তু বর্তমান সরকার যখন ক্ষমতায় এলো, তখন আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছেন, জাতীয় চার নেতার হত্যাকারীদের বিচার করেছেন। অবশেষে তিনি যুদ্ধপরাধীদের বিচার করেছেন। ফলে আমার স্বামীর হত্যাকারীদের বিচার ও ফাঁসি হয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা ন্যায়বিচার পেলাম। আমাদের একটা দুঃখ ছিল, ন্যায়বিচার পাচ্ছিলাম না বলে। আমার স্বামীর হত্যার বিচার হয়নি বলে, বুদ্ধিজীবীদের হত্যার বিচার হয়নি বলে আমরা কষ্ট পাচ্ছিলাম। এটা ঠিক যে, শূন্যতা কখনো পূরণ হয়নি, শোক কখনো মুছে যায়নি। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে যে ন্যায়বিচার আমরা পেয়েছি, তাতে আমাদের এক ধরনের আনন্দ অনুভূত হয়েছে। অন্য রকমের একটা সান্ত¡না আমরা পেয়েছি।

দেশ রূপান্তর : যে দৃঢ়তা আর বলিষ্ঠতা নিয়ে পাকিস্তানি শোষকদের বিরুদ্ধে ১৯৭১-এর সময় এদেশের বুদ্ধিজীবীরা দাঁড়িয়েছিল, বর্তমান সময়ের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কি তা পরিলক্ষিত হচ্ছে?

শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী : এটা তো সময়ের প্রয়োজনে হয়। সময়ের প্রয়োজন ছিল বলেই মুক্তিযুদ্ধের সময় আপামর জনসাধারণ যুদ্ধ করেছেন। জীবন দিয়েছেন। আর বুদ্ধিজীবীরা তো সবসময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন। যেসব বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছে, তারা তো ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সব আন্দোলনেই ছিলেন। তাদের অনেকেই ভাষাসৈনিক ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তারা সম্পর্ক রেখেছিলেন দেশকে স্বাধীন করার জন্য। কাজেই সময়ের প্রয়োজনে ওই সময়ের বুদ্ধিজীবীরা ভূমিকা রেখেছিলেন। এখনকার বুদ্ধিজীবীরাও ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। অবশ্য সবাই নয়। আর সবাই তো একরকম চিন্তাচেতনার হয় না। তাই যখন প্রয়োজন হবে, তখন বুদ্ধিজীবীরা আবার এগিয়ে আসবে, দেশের জন্য লড়াই করবে।

দেশ রূপান্তর : ৪৮ বছর পর আমরা কি ১৪ ডিসেম্বরের শহীদদের আদর্শ, বিশ্বাস ও স্বপ্নের ধারক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি?

শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী : শতভাগ প্রতিষ্ঠা হয়নি। কিন্তু বেশ খানিকটা না হলে গণজাগরণ মঞ্চ তো হতো না। দেশে দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনুপস্থিত ছিল। প্রায় ছাব্বিশ বছর ধরেই তা ছিল না। জিয়াউর রহমান, এরশাদ এবং খালেদা জিয়া–কেউই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ পরিচালনা করেননি। বরং তারা তাকে ভূলুণ্ঠিত করেছেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে দেশ পরিচালিত হয়নি। তারপরও তো জনগণের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল বলে গণজাগরণ মঞ্চ হয়েছে। জনগণ সচেতন হয়েছে। বুদ্ধিজীবীরা লেখালেখি করেছেন। কেউই আটকে রাখতে পারেনি। একসময় তো ইতিহাস তুলে দেওয়া হয়েছিল, বিকৃত করা হয়েছিল। কিন্তু তারপরও জনগণের মধ্যে তা বিদ্যমান ছিল। আমি মনে করি, প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে।

দেশ রূপান্তর : স্বাধীনতাপ্রাপ্তির ৪৮ বছর পার হলো। জাতির শ্রেষ্ঠ কিছু সন্তান মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে যখন নিহত হলেন, আমরা কি সত্যিই তাদের আত্মদানের বিষয়টি মাথায় রেখে অগ্রসর হয়েছি? তাদের থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে আমরা কি রাষ্ট্র গঠন করেছি?

শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী : হ্যাঁ, অবশ্যই। আমরা তো প্রায় ছাব্বিশ বছর অন্ধকারে ছিলাম। এই যে দীর্ঘদিনের শূন্যতা, তা পূরণ করে জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, একটু কষ্টকর বৈকি। তারপরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আমি মনে করি, এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামীতে সেই কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র আমরা পাব। বর্তমান সময়ে বুদ্ধিজীবীদের ছবিসহ জীবনী পাঠ্যপুস্তকে রয়েছে। সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন কর্মউদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর কথা স্মরণ করা হয়। এখন জয়বাংলা সেস্নাগানকে জাতীয় সেস্নাগানে পরিণত করার জন্য হাইকোর্ট মন্তব্য করেছে। কিন্তু তারপরও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। দেশবিরোধীরা রয়েছে, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি রয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের পরিবার রয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কম কথা নয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত