কেরানীগঞ্জে আগুনে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০২:৩৬ এএম

ঢাকার কেরানীগঞ্জে প্লাস্টিকসামগ্রী তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩ জনে দাঁড়িয়েছে। গত বুধবার বিকেলে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একজন ঘটনাস্থলে আর গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১২ জন হাসপাতালে মারা গেছেন। তাদের মধ্যে গতকাল রাতে ১০ জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ৮ এবং শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি আছেন ১০ জন। এছাড়া অগ্নিদগ্ধ দুর্জয়কে বাসায় নিয়ে গেছেন স্বজনরা। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দগ্ধদের মধ্যে অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক।

গত বুধবার বিকেল সোয়া ৪টার দিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ার হিজলতলা এলাকায় প্রাইম প্লেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে আগুন লেগে একজন নিহত হন। পরে দগ্ধ ৩৪ জনকে ভর্তি করার কথা জানিয়েছিল ঢামেক বার্ন ইউনিট কর্তৃপক্ষ। তবে গতকাল ঢামেক বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা. আরিফুল ইসলাম নবীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৩১ জন দগ্ধ হয়ে বার্ন ইউনিটে আসে। গত বুধবার ভুলক্রমে অন্য রোগীর নাম তালিকায় চলে আসায় ৩৪ জনের কথা বলা হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, কেরানীগঞ্জে অগ্নিদগ্ধদের মধ্যে ১২ জন মারা গেছেন। তারা হলেন– বাবলু (২৫), রায়হান (১৬), ইমরান (১৮), সালাউদ্দিন (৩২), আ. খালেদ (৩৫), সুজন (১৯), জিনারুল (৩২), আলম (৩৫), মেহেদী হাসান শান্ত (২০), ফয়সাল আহমেদ (২৯), জাহাঙ্গীর (৫৫) ও ওমর ফারুক (২৮)। এদের সবারই শরীরে ৯০ ভাগেরও ওপরে দগ্ধ ছিল। প্রথম থেকেই এদের অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল। চিকিৎসাধীন ১৮ জনের মধ্যেও অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

ডা. আরিফুল বলেন, ঘটনাস্থলে থেকে উদ্ধার মরদেহ মাহবুবের (২৫) বলে দাবি করেছেন তার বাবা গুলজার। তবে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর লাশ হস্তান্তর করা হবে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন ১০ জনের মধ্যে সোহাগ, সোহাগ-২, সুমন, ফিরোজ ও আসাদের শরীরের ৫০ ভাগ করে দগ্ধ হয়েছে। এছাড়া মফিজের ৪০ ভাগ, মুস্তাকিমের ২০ ভাগ, সিহাজুলের ৭০ ভাগ, রাজ্জাকের ১০০ ভাগ ও আবু সাঈদের ৮০ ভাগ দগ্ধ হয়েছে। আর ঢামেক বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন আটজনের মধ্যে বাসির, আসলাম ও লাল মিয়ার শরীরের ২০ ভাগ, জিসানের ১৭ ভাগ, সাখাওয়াতের ২২ ভাগ, জাকিরের ২৯ ভাগ, সাজিদের ১০ ভাগ ও সিরাজের ২১ ভাগ দগ্ধ হয়েছে।

শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. পার্থ শংকর পাল জানান, বার্ন ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে গতকাল দুপুর পর্যন্ত ১০ জন ভর্তি রয়েছে। পুরাতন বার্ন ইউনিটে ভর্তি আছে আটজন। সবারই অবস্থা আশঙ্কাজনক। কাউকেই শঙ্কামুক্ত বলা যাচ্ছে না।

এদিকে গতকাল দুপুরে শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটে দগ্ধদের দেখতে আসেন কারখানাটির মালিকপক্ষের চার-পাঁচজন নারী। এ সময় দগ্ধ রোগীদের স্বজনরা সাংবাদিকদের কাছে কারখানাটিতে আগুনের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালির অভিযোগ জানালে ওই নারীরা তাদের বাধা দেন। তারা বলেন, এটা ভাগ্যের লিখন ছিল। সবাইকে তা মেনে নিতে হবে। এতে স্বজনরা ক্ষিপ্ত হলে হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা ওই নারীদের হাসপাতাল থেকে বের হতে সহায়তা করেন।

গতকাল সকালে ঢামেক বার্ন ইউনিট ও শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ঘুরে দেখা গেছে, স্বজনদের আহাজারি থামছেই না। নিহতের স্বজনরা লাশের জন্য অপেক্ষা করছেন। আর আহতদের স্বজনরা অপেক্ষা করছেন একবার সাক্ষাতের জন্য। এদিকে গতকাল সকালে ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দগ্ধদের স্বজনদের হাতে ২০ হাজার করে টাকা তুলে দেন। তিনি জানান, আহতদের চিকিৎসার জন্য সব খরচ এবং নিহতদের ময়নাতদন্ত শেষে দাফনের খরচ সরকার বহন করবে।

এছাড়া শ্রম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দগ্ধদের চিকিৎসার খরচ হিসেবে প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় শ্রম সচিব কেএম আলী আজম ১৮ জন দগ্ধ রোগীদের স্বজনদের হাতে এই টাকা তুলে দেন। পরে নিহতদের পরিবারকেও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

এর আগে বার্ন ইউনিটে দগ্ধদের দেখতে এসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সাংবাদিকদের বলেন, কারখানাটি নিয়মকানুন মেনে কাজ করে না। অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থাও নেই। মালিকের উদাসীনতায় এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনা খুবই দুঃখজনক। কেরানীগঞ্জের ঘটনায় যে রোগীগুলো হাসপাতালে এসেছে, সবার অবস্থাই খারাপ। আহতদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক খবর রাখছেন। সরকারি খরচে চিকিৎসার নির্দেশনা দিয়েছেন।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অনেক কারখানা আছে যারা নিয়ম-কানুন মেনে কাজ করে না। অনেক জায়গায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢzকতে পারে না। এ বিষয়ে মালিকদের সতর্ক থাকতে হবে। তাদের উদাসীনতাতেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। বুধবার যেখানে আগুন লেগেছে, সেখানে আগুন নেভানোর সরঞ্জাম ছিল না।’

বিভিন্ন সংস্থার অগ্নিকাণ্ডের স্থান পরিদর্শন : গতকাল সকাল থেকেই দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা ইউনিয়নের চুনকুটিয়া হিজলতলা এলাকায় কারখানাটিতে বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা ও স্থানীয়রা জড়ো হন। সকালে ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আবুল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিকভাবে বোঝা যাচ্ছে আগুনের ঘটনায় মালিকের যথেষ্ট গাফিলতি রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিস্তারিত বলতে পারব।

শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব কেএম আলী আজম ও কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের পরিদর্শক শিবনাথ রায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা বলেন, কারখানাটি গত ৫ নভেম্বর শ্রম ও কলকারখানা অধিদপ্তরের লোকজন এসে পরিদর্শন করে গেছে। যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকায় কারখানাটির বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলাও হয়েছে। মামলার কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ার আগেই ঝরে গেল ১৩টি তাজা প্রাণ, আহত বাকিদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। অতিরিক্ত সচিব ড. মো. মোল্লা জালালকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

দুপুরের দিকে কারখানাটি পরিদর্শনে আসেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. মোল্লা জালাল ও যুগ্ম সচিব মো. সাইফুল ইসলাম। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, আমরা তদন্ত করছি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলতে পারব না।

শুভাঢ্যা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মো. ইকবাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসার জন্য যেখানে যা প্রয়োজন হয় সব স্থানীয় সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া স্থানীয় সাংসদের নির্দেশ অনুযায়ী শুভাঢ্যায় ঘনবসতি এলাকা থেকে সব অবৈধ কারখানা উচ্ছেদ করা হবে।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি শাহ জামান জানান, ঘটনার পর থেকেই কারখানার মালিক নজরুল ইসলামসহ সব কর্মকর্তা পলাতক। কারখানাটিতে যেন কোনো ধরনের অনাকাি•ক্ষত ঘটনা না ঘটে তাই সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত