ক্যাম্পাসছাড়া হওয়া দুই নেতার কমিটিতে চলছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) শাখা ছাত্রলীগ। গত ১৫ জুলাই সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ দুই সদস্যের কমিটি দেয় কেন্দ্র। কিন্তু এর অল্প দিনের মধ্যে আর্থিক লেনদেনে সাধারণ সম্পাদক পদ বাগিয়ে নিয়ে আসার স্বীকারোক্তিমূলক কথোপকথন প্রকাশ হওয়ার পর থেকে ক্যাম্পাসছাড়া সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। নতুন কমিটি গঠনের পাঁচ মাসের মাথায় এসে ক্যাম্পাসে তাদের কোনো ধরনের কার্যক্রম নেই। অন্যদিকে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ ও মামলায় জড়িয়েছেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক কার্যক্রম না থাকায় ঝিমিয়ে পড়েছেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছরের ১৫ জুলাই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের দুই সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। এতে ইংরেজি বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের রবিউল ইসলাম পলাশকে সভাপতি ও ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এ কমিটিকে এক বছরের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু পাঁচ মাসে বৃক্ষরোপণ ও মশক নিধন কর্মসূচি
ছাড়া দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি এ কমিটির। তবে নিজেদের মধ্যে কয়েক দফায় সংঘর্ষ ও মামলার ঘটনা ঘটেছে। সাবেক সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানা হালিমের দায়ের করা আইসিটি মামলায় এক মাস কারাগারে আটক থাকার পর গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জামিনে মুক্তি পেয়েছেন সম্পাদক রাকিব।
সংগঠনের সাধারণ কর্মীরা জানান, কেন্দ্র থেকে দুই সদস্যের কমিটি ঘোষণার পরেই সংগঠনের মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। সাবেক কমিটির সভাপতি-সম্পাদক সমর্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে পদ নিয়ে তৈরি হয় হতাশা। আবাসিক হলগুলো তাদের দখলে থাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে নতুন কমিটির সঙ্গে তাদের বিভেদের সূত্রপাত। নতুন কমিটির সমর্থকরা হলের সিট দখল করতে গিয়ে কয়েক দফায় হাতাহাতির ঘটনায় উভয়পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে গত ২৫ আগস্ট মধ্যরাতে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। ওই দিন পদপ্রত্যাশী পক্ষের নেতা মোশাররফ হোসেন নীলকে মারধরের অভিযোগ ওঠে সম্পাদকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাতভর দফায় দফায় সভাপতি-সম্পাদক গ্রুপের সঙ্গে পদপ্রত্যাশী গ্রুপের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ধাওয়া খেয়ে সাধারণ সম্পাদক ক্যাম্পাস থেকে পালিয়ে যান বলেও একপক্ষের ভাষ্য। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ১২ সেপ্টেম্বর সাধারণ সম্পাদকের ফোনালাপের একটি অডিও ক্লিপ ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়ে; যা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। ওই কথোপকথনে রাকিব সম্পাদক হতে ৪০ লাখ টাকা খরচ করেন বলে উল্লেখ করেন। এর জেরে পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীরা রাকিবকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে বিক্ষোভ করেন। পরবর্তী সময়ে একদল বহিরাগতকে নিয়ে ক্যাম্পাসে ঢোকেন সাধারণ সম্পাদক রাকিব। এ সময় দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে ধাওয়া দিয়ে তাকে ক্যাম্পাসছাড়া করেন পদপ্রত্যাশীরা। এরপর আরও চারবার তাকে ধাওয়া দিয়ে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেন পদপ্রত্যাশীরা।
এদিকে গত ৩১ অক্টোবর সাধারণ সম্পাদক রাকিব এবং সাবেক কমিটির বন ও পরিবেশবিষয়ক উপসম্পাদক জুবায়ের আল মাহমুদের মধ্যে কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ ফাঁস হয়। এতে সাবেক কমিটির সম্পাদক জুয়েল রানা হালিমের বিরুদ্ধে ৮-১০ কোটি টাকা কামানোর কথা উঠে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২ নভেম্বর হালিম ইবি থানায় আইসিটি আইনে রাকিব ও জুবায়েরের বিরুদ্ধে মামলা করেন। সেই মামলায় ৯ নভেম্বর কুষ্টিয়া থেকে গ্রেপ্তার হন রাকিব। আর এরপর থেকে সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির অনুপস্থিতিতে ক্যাম্পাসে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছেন পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীরা। ছাত্রলীগের এই গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শিশির ইসলাম বাবু ও তৌকির মাহফুজ মাসুদ, ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক মিজানুর রহমান লালন ও সাবেক সহসম্পাদক ফয়সাল সিদ্দিকী আরাফাত।
দীর্ঘদিন সংগঠনের এমন অবস্থায় ঝিমিয়ে পড়েছেন কর্মীরা। এ অচলাবস্থা কাটিয়ে ফের নেতাকর্মীদের সক্রিয় করতে দাবি জানিয়েছেন কর্মীরা। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার ইবি শাখা ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্তির দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন কর্মীরা। এ ছাড়া চলমান কমিটির এমন কার্যক্রমে নতুন কমিটি নিয়ে আসার জন্য কয়েক দফায় পদপ্রত্যাশীরা কেন্দ্রে যোগাযোগ করেছেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক তৌকির মাহফুজ মাসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমান কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত। তাদের কারণে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের কার্যক্রমে নাজুক অবস্থা। আমরা কেন্দ্রের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি। আশা রাখছি, কেন্দ্র বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে নতুন কমিটি দেবে।’
অন্যদিকে ইবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রবিউল ইসলাম পলাশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চলমান সংকটের কারণে ভর্তি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন দিবসে আমরা কাজ করতে পারিনি। তবুও ভেতরে-ভেতরে কাজ করার চেষ্টা করেছি। অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে কেন্দ্র বিষয়টির দিকে নজর দেবে বলে আশা রাখছি।’
ইবি শাখা ছাত্রলীগে স্থবিরতা নিরসনে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) লেখক ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কার্যক্রম সম্পর্কে আমি এবং আমার সভাপতি অবহিত। সুষ্ঠু সমাধানের জন্য আমরা কাজ করছি। তবে কবে নাগাদ নতুন সিদ্ধান্ত হবে তার নির্দিষ্ট সময় দিতে পারছি না।’
