ফেইসবুক আইডিতে নিজের কোনো ছবি নেই রিফাত আহম্মেদ ওরফে রুবনের (৩০)। তার প্রোফাইল পিকচার ও কাভার ফটোতে আছ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার ছবি। পরিচয় হিসেবে লেখা আছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অ্যাডিশনাল ডেপুটি কমিশনার হিসেবে কর্মরত এবং পড়ালেখা একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর তার টাইমলাইনে রয়েছে ‘ফ্রি ল্যান্সিংয়ের’ মাধ্যমে অল্প সময়ে অনেক অর্থ উপার্জনের লোভনীয় নানা অফার।
তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, আদতে তিনি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়েননি। ডিগ্রি পাস করেছেন গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে। তার এসব কর্মকাণ্ডের মূলে ছিল মানুষের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়া। ফেইসবুক পোস্টে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে টাকা দ্বিগুণ করে দেওয়ার আশ্বাস দিতেন তিনি। তার কথা বিশ্বাস করে যারা বিনিয়োগ করতে ফেইসবুকে যোগাযোগ করতেন তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিতেন। আর টাকা নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীর আইডি ও ফোন নম্বর ব্লক করে দিতেন। সিআইডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এভাবে প্রতারণার মাধ্যমে গত পাঁচ-ছয় মাস অন্তত ৩০ জনের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন রিফাত। সম্প্রতি তিনি সিআইডির হাতে ধরা পড়েছেন। সিআইডির
তদন্তে উঠে এসেছে রিফাতের একাধিক বিয়ে, তালাক এবং নিজের সন্তান বিক্রির মতো তথ্যও।
এ প্রসঙ্গে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস-অর্গানাইজড ক্রাইম) মোস্তফা কামাল গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রিফাতের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সিআইডির অনলাইন মনিটরিং সেল তদন্ত শুরু করে। তদন্তে রিফাতের প্রতারণার প্রমাণ পাওয়ার পর তাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সে প্রতারণার কথা স্বীকার করেছে। তার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না সে বিষয়ে তদন্ত চলছে।’ মোস্তফা কামাল আরও বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইনে প্রতারণা অনেক বেড়ে গেছে। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।’
সিআইডি কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি চট্টগ্রামের মো. শাকিল নামে এক ব্যক্তি রিফাত আহম্মেদ নামে একটি ফেইসবুক আইডির বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে বন্দর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। ওই জিডিতে ফেইসবুকের মাধ্যমে রিফাতের প্রতারণার কৌশলের বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি। এ অভিযোগের ভিত্তিতে সিআইডির সাইবার মনিটরিং এবং সাইবার ইনভেস্টিগেশন টিম ওই ফেইসবুক আইডি ব্যবহারকারীর তথ্য উদ্ঘাটনের কাজ শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের টিম জানতে পারে, দিনাজপুর জেলার পাহাড়পুর থেকে ফেইসবুক আইডিটি পরিচালনা করছেন রিফাত। সিআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে সিনিয়র এএসপি জুয়েল চাকমা এবং এসএসপি চাতক চাকমার নেতৃত্বে সাইবার পুলিশ সেন্টারের একটি দল গত শনিবার অভিযান চালিয়ে দিনাজপুরের কোতোয়ালি থানার পাহাড়পুর এলাকার নিজ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্বীকার করেছেন, কয়েক মাস ধরে ফেইসবুকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কথা বলে চটকদার পোস্ট দিয়ে ২০-৩০ জনের কাছ থেকে কখনো পুলিশের এডিসি আবার কখনো ডিআইজি পরিচয় দিয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।
রিফাতের ফেইসবুক আইডি ঘেঁটে দেখা গেছে, কাভার ফটোতে আছে পুলিশের রংপুর বিভাগের ডিআইজিসহ চার ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার ছবি। প্রোফাইল পিকচারেও রয়েছে ডিআইজিসহ পুলিশের দুই কর্মকর্তার ছবি। প্রোফাইলে নিজের পরিচয় লিখেছেন সিআইডির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের অ্যাডিশনাল ডেপুটি কমিশনার, সিআইডির অর্গানাইজক্রাইমে কর্মরত ছিলেন, পড়ালেখা করেছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাড়ি উল্লেখ করেছেন রংপুর। গত ৭ আগস্ট এক ফেইসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘ডেইলি ৫৩০ ইনকাম না হলে দ্বিগুণ দিবো। আপনার নিজের অ্যাকাউন্টেই ৮৫০০ রেখে দিনে ১ ঘণ্টা মোবাইল দিয়ে কাজ করলেই হবে। ইনবক্সে নক দিন।’ ওই পোস্টের শেষদিকে বিশেষ নোট দিয়ে লেখা ফিল্যান্সিং : যে পেশা বদলে দিতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের অর্থনীতি।
সিআইডির তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, রিফাত ২০০৮ সালে বিয়ে করেন। সেই পক্ষে তার দুই সন্তান রয়েছে। ২০১০ সালে ফের বিয়ে করেন তিনি। এই পক্ষের এক সন্তানকে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করাকে কেন্দ্র করে স্ত্রীর সঙ্গে বিরোধ হয়। দ্বিতীয় স্ত্রীর বিরুদ্ধে এই বাচ্চা বিক্রির অভিযোগ তুলে তাকে তিনি তালাক দিয়েছেন। রিফাত তার বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। পাশাপাশি অতিরিক্ত নগদ টাকার লোভে এ প্রতারণার আশ্রয় নেন বলে স্বীকার করেছেন। তার বিষয়ে আরও তদন্ত করা হচ্ছে।
