আমরা যখন ছোট তখন একদিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলছে, অন্যদিকে নকশালবাড়ির আন্দোলনের বজ্রনির্ঘোষ আছড়ে পড়েছে ভারতের গ্রাম শহরে। তখন নতুন নতুন সেস্নাগান আমাদের মতো কিশোরদের মনে চারিয়ে যাচ্ছিল। তারমধ্যে এক আধটা এখনো মনে আছে। সেই ষাট সত্তর দশকের দেয়াল লেখা আবছা হতে হতে আবার এখন স্পষ্ট হয়ে জ্বলজ্বল করছে– ‘একটি স্ফুলিঙ্গই পারে দাবানল সৃষ্টি করতে’। বস্তুত দাবানলের শক্তি নিয়েই এদেশের রাস্তায় রাস্তায় এখন তরুণ প্রজন্মের স্পর্ধিত মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।
দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইউনিভার্সিটিতে কেন্দ্রীয় সরকারের পুলিশ ও আধাসেনারা যে তাণ্ডব চালিয়েছে তা এককথায় কুখ্যাত জালিওয়ানওয়ালাবাগের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়। এর পরপরই জামিয়া মিলিয়ার ঘটনার জের ধরে ভারতের সব কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েদের আন্দোলন এদেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে।
এ পর্যন্ত বিষয়গুলো মোটের ওপর আপনার জানা। যা জানা থাকলেও হয়তো চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। তাই একটু বলি, এই মুহূর্তে ভারতীয় রাজনীতির সন্ধিক্ষণে অনেক মাত্রা, অনেক বিষয়। যা আপাত বিচ্ছিন্ন হলেও পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগ প্রবল। একদিকে এই প্রথম দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছে খোদ দেশের সরকার। ফেডারেল কাঠামো ভেঙে দিয়ে পুরোপুরি এককেন্দ্রিক ভারত নির্মাণের চেষ্টা চলছে। আর পাশাপাশি ভারত রাষ্ট্র দেশের নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে ।
‘এনআরসি’ বা সবে সবে ‘নাগরিক সংশোধনী বিল’ যা ইতিমধ্যেই আইনে পরিণত হয়েছে, তা যথেষ্ট ভয়ংকর। সব সম্প্রদায়ের কাছেই বিপজ্জনক। কিন্তু তার চেয়েও বড় চিন্তা ভারতে এই আইনকে নিয়ে যে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বা বলা ভালো তৈরি করা হয়েছে তা আগামীর ভারতকে কোন দিকে নিয়ে যাবে তাই নিয়ে দুশ্চিন্তা।
আজকের ভারত যেন ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগের পরিস্থিতির রিপ্লে বা পুনর্নির্মাণ। পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা তো একদম ৪৬-৪৭ সালের অখণ্ড বাংলা। শুধু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কোনো মুহম্মদ আলি জিন্নাহ, এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বা আবুল হাশিম নেই। দেশভাগের পর মুসলমানদের এলিট অংশ চলে গিয়েছিলেন ওপার বাংলায়। এপারে স্বেচ্ছায় বা বাধ্য হয়ে থেকে গেছিলেন বাঙালি মুসলমানের গরিবস্য গরিব অংশ। ড়্গেতমজুর, বর্গাদার, প্রান্তিক কৃষক, ছোট দোকানদার, দর্জি, ঘুড়িশিল্পী, জরি-বিড়ি-রেশম কারবারিরা। প্রচুর প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে স্বাধীনতার এত বছর পর বাংলার এপারে থিতু হওয়া মুসলিমদের তৃতীয় প্রজন্মের একটা অংশ যখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন, ডাক্তার, লেখক, অধ্যাপক, বিজ্ঞানী হিসেবে উঠে আসছেন তখন নতুন করে তাদের পরে চরম দক্ষিণপন্থি রাজনীতির হামলা শুরু হয়েছে।
ভাবের ঘরে চুরি করে লাভ নেই। এখন সংখ্যাগরিষ্ঠের বড় অংশের মনেই ইসলামফোবিয়া চারিয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে একটু একটু করে চারিয়ে দেওয়া হয়েছে। আশার কথা এখনো পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে সেভাবে জনমনে সাম্প্রদায়িকতা ঢোকেনি। কিন্তু মফস্বল, শহরে সাম্প্রদায়িক বিষ ক্রমে ক্রমেই ভয়ংকর চেহারা নিচ্ছে। হাওয়ার চেয়ে তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়ছে বহুবিধ গুজব। যা পল্লবিত হতে হতে গোটা সমাজকে আড়াআড়িভাবে ‘ওরা’ আর ‘আমরায়’ ভাগ করে দিচ্ছে।
এই ভাগাভাগির খেলা চলবে দুহাজার চব্বিশ সাল অবধি। কেননা, ওই সময় আবার ভারতের সংসদীয় নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির জয়ের জন্য ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতিই ভরসা। অনেকেই জানতে চান পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নিশ্চিত ভোট কত শতাংশ! আমি বলি ধর্মের বিভাজন বাদ দিয়ে যদি শুধু অর্থনৈতিক প্রশ্নে ভোট হয় তাহলে বিজেপির এত রমরমা থাকবে না। ২০১৪ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার সময় নরেন্দ্র মোদি যা যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে মসনদে এসেছিলেন তার একটাও রাখতে পারেননি। দুকোটি চাকরি পাওয়া, বিদেশ থেকে কালো টাকা ফেরত আনা– সবই রয়ে গেছে স্রেফ কাগুজে প্রতিশ্রুতি হয়ে। আর এবার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর থেকে আজ অবধি কীর্তি– কাশ্মীরকে বধ্যভূমি করে তোলা, অর্থনীতিকে পুরোপুরি অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া, একের পর এক রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে বেচে দেওয়া, দেশের সম্পদ নিয়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া শিল্পপতিদের মদদ দেওয়া এবং অবশ্যই হিন্দু-মুসলমান লড়াইয়ে ইন্ধন দিয়ে দেশের সংহতি ধ্বংস করা।
‘এনআরসি’, ‘ক্যাব’ এসব বাস্তবে কখনো হবে কি না তাই নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এগুলো এক একটা ফাঁদ। অভাব যন্ত্রণা বেহাল অর্থনীতি থেকে মানুষের মুখ ফেরাতে এসব বাগাড়ম্বর।
‘এনআরসি’ করতে ইতিমধ্যেই সরকারের হিসাবেই প্রায় দেড় দু হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে। এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলছেন ওইটি বাতিল করা হবে। আমরা সবাই জানতাম এই নাগরিকপঞ্জি সম্পূর্ণ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে আসাম সরকার করছে। তাহলে আচমকা ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় সরকার আদৌ কি তা বাতিল করতে পারে! তা-কি আইনসম্মত! এ প্রশ্ন উঠবেই। উঠছেও। এনআরসি আতঙ্কে কত কত লোক মারা গেছেন, আত্মহত্যা করেছেন, অসংবেদী সরকার তা না জানলেও সাধারণ মানুষ তা সহজে ভুলে যান না। বিশেষ করে যাদের পরিবারের লোক আতঙ্ক নিয়ে, অনুপ্রবেশকারী অপবাদ নিয়ে অপমান মাথায় নিয়ে চলে গেছেন তারা এখন শুনছেন তুঘলকি ফরমান এনআরসি হবে। তবে আসামে যা হয়েছে তা বাতিল। সারা দেশে একসঙ্গে ঘুষপেটিয়া বাছতে হবে। তাই সব রাজ্যে এক সঙ্গে এনআরসি হবে। অর্থনৈতিক মন্দার দেশে বেশি নয়, সামান্য দেড় দু হাজার কোটি টাকা জলে গেলে শাসকদের কী আসে যায়!
তারপর এলো ক্যাব। একটা কথা পরিষ্কার করে বুঝতে হবে ক্যাব ও এনআরসি দুটি দুটির পরিপূরক। আলাদা নয়। বলা যেতে পারে একই পয়সার এপিঠ ওপিঠ। তাহলে নাগরিক পঞ্জির সম্পূর্ণ তালিকায় উনিশ লাখ লোকের নাম বাদ দেওয়ার পর তড়িঘড়ি এই নাগরিক সংশোধনী আইন সংসদে পাস করানোর এত কেন তৎপরতা, লম্ফঝম্প! কী আছে এই আইনে যা সারা ভারতকে প্রায় গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে!
কুলোকে বলে যে ঘটনাচক্রে আসামের এনআরসি থেকে উনিশ লাখ লোকের মধ্যে অধিকাংশই হিন্দু নাম বাদ পড়ায় হিন্দুত্ববাদী বিজেপির অন্দরে নানা প্রশ্ন ওঠায় দ্রুত সংসদে নাগরিকত্ব বিল পেশ করা। এই আইন সম্পূর্ণ ভারতের সংবিধানের মৌলিক অধিকারবিরোধী। আমাদের সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারায় নাগরিকত্ব আইনে ধর্মীয় বিভাজনের কথা বলা নেই। এখন যে সংশোধনী এসেছে তাতে বলা হচ্ছে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর অবধি পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে যে হিন্দু বৌদ্ধ, খ্রিস্টানরা এসেছেন তাদের উদ্বাস্তু না বলে খুব দ্রুত নাগরিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে। আপাত সরল এই বক্তব্যের ধূর্ত রাজনীতির মারপ্যাঁচ বুঝতে শার্লক হোমসের সহায় হওয়া ছাড়া গতি নেই। তবু দু একটা বিষয় নিয়ে একটু আলোচনা হোক। একতো বোঝা যায় যে প্রতিবেশী যে তিনটে দেশের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে মূলত লক্ষ্য বাংলাদেশ। সেখান থেকেই ‘দলে দলে অনুপ্রবেশকারী ঢোকে’ এ প্রচার চরম দক্ষিণপন্থিদের বহুদিনের। এমনকি স্বাধীনতার আগেও এই প্রচার ছিল আসামে। উগ্র জাতীয়তাবাদী হিন্দু সংগঠনের চাপে তথাকথিত অনুপ্রবেশকারী গরিব কৃষক, যাদের অধিকাংশই ধর্মে মুসলমান ও নিমœবর্গের হিন্দু, তাদের কোণঠাসা করতে ব্রিটিশ সরকার অমানবিক লাইন প্রথা চালু করেছিল, তার বিরুদ্ধে লড়াই করেই উপমহাদেশের অবিসংবাদী জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। আসামের ভাসান চরের মানুষ বলেই নামের সঙ্গে জুড়ে গেল ভাসান। ভাসান চরের মওলানা বলতে বলতে ভাসানী।
স্বাধীনতার এত বছর পর এখনো ওই চরের মানুষ, গ্রামের মুসলমানের গা থেকে অনুপ্রবেশকারী, ঘুষপেটিয়া গন্ধ গেল না। এই ইতিবৃত্তেরই নবতম সংস্করণ ক্যাব ও এনআরসি। ক্যাব ক্যাব করছি বটে আসল উচ্চারণ আইন হওয়ার ফলে এখন সিটিজেনস অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট। সংক্ষেপে ‘সিএএ’।
তো সে ‘ক্যাব’ই হোক বা ‘সিএএ’, আইনটি একধরনের খুড়োর কল। হিন্দু মুসলমান কোনো সম্প্রদায়ের পক্ষেই খুব ভালো না। এ হচ্ছে সেই পুরনো প্রবাদ– চোরকে বলছে চুরি করতে আর গৃহস্থকে বলছে সজাগ থাকতে। হিন্দুদের বড় অংশ সংশোধনীর নানা গোপন ধারা উপধারা খুঁটিয়ে দেখছেন না বলে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। তবে তা সাময়িক। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে আজ না হয় কাল ধর্মের নামে বিভাজনের রাজনীতির পরিবর্তে পথে নামবেন রুটি রুজির দাবিতে। তখন আগ্নেয়গিরির ওপর যারা পিকনিক করতে বসেছেন তাদের সাধের ভোজসভা ছিন্নভিন্ন হবেই। আমাদের ছাত্রদের অভিমুখ তাই সঠিক পথে এগোচ্ছে। লাঠিগুলোর সাধ্য কি যৌবন জলতরঙ্গ আটকাবার!
