রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম উঠে আসার প্রতিবাদে গতকাল বুধবারও বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেছে মুক্তিযোদ্ধাসহ রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলায় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা বিক্ষোভ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি জানিয়েছে। নিজের নাম প্রত্যাহার চেয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু। পাশাপাশি যেসব তথ্যের ভিত্তিতে এ তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে তার অনুলিপি সরবরাহের অনুরোধ জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন তিনি। বগুড়ায় গতকাল বেলা ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার স্বাধীনতা মঞ্চে এ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন মুক্তিযোদ্ধারা। বরিশালে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটি। সমাবেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে সদ্য প্রকাশিত রাজাকারের তালিকা প্রত্যাহার করে যাচাই-বাছাই করে নতুন তালিকা প্রকাশের দাবি করা হয়। বিস্তারিত নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
তিন মন্ত্রণালয়ে গোলাম আরিফ টিপুর চিঠি :
চিঠি : রাজাকারের তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং তা প্রত্যাহার চেয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু। পাশাপাশি যেসব তথ্যের ভিত্তিতে এ তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে তার অনুলিপি সরবরাহের অনুরোধ জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন তিনি। গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান তিনি।
গত মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালের নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে গোলাম আরিফ টিপু বলেন, ‘আমি একজন ভাষাসংগ্রামী, ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। তালিকায় আমার নাম যুক্ত থাকায় আমি হতবাক, বিস্মিত, মর্মাহত ও অপমানিত।’ কেন এবং কীভাবে এ নাম এলো সেই ঘটনার উৎস খুঁজে আইনগতভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
গত ১৫ ডিসেম্বর প্রথম ধাপে ১০ হাজার ৭৮৯ জন রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। কোনো কোনো ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকারের তালিকায় নাম রাখায় তালিকা নিয়ে ইতিমধ্যে সমালোচনার ঝড় বইছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, তালিকায় ভুল থাকলে তা প্রত্যাহার করা হবে।
সিরাজগঞ্জে ক্ষুব্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের বিক্ষোভ : রাজাকার তালিকায় পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের সর্বাধিনায়ক আবদুল লতিফ মির্জার নাম থাকার প্রতিবাদে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা বিক্ষোভ করেছেন। গতকাল সকাল ১০টার দিকে শহরে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন, শহীদ মিনারে অবস্থান ও সমাবেশ করেন তারা। এ সময় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেন বক্তারা।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, অবিলম্বে এ তালিকা থেকে আবদুল লতিফ মির্জার নাম বাদ দিয়ে তালিকা সংশোধন করতে হবে। তা না হলে আগামী মঙ্গলবার সকালে উল্লাপাড়া মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স চত্বরে মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান নিয়ে বগুড়া-নগরবাড়ী মহাসড়ক অবরোধ করা হবে।
সমাবেশে উল্লাপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার খোরশেদ আলমের সভাপতিত্বে এ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা গোলাম সরোয়ার, মোজাম্মেল হক, রুহুল আমিন প্রমুখ।
এদিকে গতকাল সকালে সিরাজগঞ্জ শহরের চৌরাস্তা প্রেস ক্লাব মোড়ে আবদুল লতিফ মির্জা স্মৃতি পরিষদ আধা ঘণ্টাব্যাপী এক মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে। গাজী মির্জা ফারুক আহম্মেদের সভাপতিত্বে এ মানববন্ধন ও সমাবেশ হয়। এ সময় বক্তারা বলেন, আবদুল লতিফ মির্জা একটি ব্র্যান্ডের নাম। তিনি শুধু মুক্তিযোদ্ধাই ছিলেন না, ছিলেন একজন সংগঠকও। তার নেতৃত্বে প্রায় ৬০০ মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে গঠিত হয় পলাশডাঙ্গা যুব শিবির।’
এ ঘটনার প্রতিবাদে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মহিষলুটির হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়ক অবরোধ করে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ কর্মসূচি পালন করেন তাড়াশের মুক্তিযোদ্ধারা। তাড়াশ উপজেলার মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্যোগে প্রায় আধ ঘণ্টাব্যাপী এ অবরোধ চলাকালে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের সহঅধিনায়ক ও সিরাজগঞ্জ-৩ (তাড়াশ-রায়গঞ্জ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য গাজী ম ম আমজাদ হোসেন মিলন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার গাজী আরশেদুল ইসলাম, ডেপুটি কমান্ডার গাজী সাইদুর রহমান সাজু, গাজী এসএম আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ।
বগুড়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান কর্মসূচি : রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার নাম থাকার প্রতিবাদে বগুড়ার আদমদীঘিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। গতকাল বেলা ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার স্বাধীনতামঞ্চে মুক্তিযোদ্ধারা এ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। সান্তাহার মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ ব্যবস্থা কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত অবস্থান কর্মসূচি থেকে অবিলম্বে বিতর্কিত এ তালিকা বাতিল করে প্রকৃত রাজাকারদের তালিকা প্রকাশের দাবি জানানো হয়।
কর্মসূচিতে মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, সাবেক সাংসদ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক কছিমউদ্দিন আহম্মেদ, আওয়ামী লীগ নেতা মৃত ফয়েজউদ্দিন আহম্মেদ, মৃত তাহেরউদ্দিন আহম্মেদসহ বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার নাম প্রকাশ হয়েছে ওই তালিকায়। এদের মধ্যে কছিম আহম্মেদ ১৯৭০ ও ’৭৩ সালে এমপি নির্বাচিত হন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। তার নেতৃত্বে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এ তালিকায় রাখার মধ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমানিত করা হয়েছে।
বরিশালে প্রতিবাদ : রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের নাম থাকার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটি। সমাবেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে সদ্য প্রকাশিত রাজাকারের তালিকা প্রত্যাহার করে যাচাই-বাছাই করে নতুন তালিকা প্রকাশের দাবি করেছেন। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় নগরীর অশ্বিনী কুমার হলের সামনে সদর রোডে ওই বিক্ষোভ সমাবেশ হয়।
বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির আয়োজনে বিক্ষোভ সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করে বরিশালের সব প্রগতিশীল রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন। এতে বক্তব্য রাখেন রাজাকারের তালিকায় নাম থাকা মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ সন্তান অ্যাডভোকেট তপন কুমার চক্রবর্তী, তার কন্যা জেলা বাসদের সদস্য সচিব ডা. মনীষা চক্রবর্তী, প্রবীণ সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা মানবেন্দ্র বটব্যাল, বরিশাল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও শহীদ পরিবারের সন্তান পুলক চ্যাটার্জি , শুভব্রত দত্ত, নাট্যজন সৈয়দ দুলাল, বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সভাপতি কাজল ঘোষ, বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেন, জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সাংসদ অ্যাডভোকেট শেখ মো. টিপু সুলতান।
বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা অনতিবিলম্বে প্রকাশিত রাজাকারের তালিকা প্রত্যাহার করে যাচাই-বাছাই করে নতুন তালিকা প্রকাশের দাবি করেছেন। একই সঙ্গে ব্যর্থতার দায় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর পদত্যাগের আহ্বান জানান।
