প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় (পিইসি) যেসব কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে তাদের ২৮ ডিসেম্বরের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ৩১ ডিসেম্বর সেই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেয়।
শিশু শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের জারি করা রুলের জবাব না দেওয়ায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ওই বহিষ্কারের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে (ডিজি) তলব
করেছে আদালত। আগামী ৮ জানুয়ারি আদালতে হাজির হয়ে তাকে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
গত ১৯ নভেম্বর দৈনিক দেশ রূপান্তরে ‘পিইসি পরীক্ষায় শিশু বহিষ্কার কেন’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর ২১ নভেম্বর হাইকোর্টের নজরে আনেন আইনজীবী এএম জামিউল হক ফয়সাল। শুনানি নিয়ে আদালত স্বতঃপ্রণোদিত (সুয়োমোটো) হয়ে রুল দেয়। রুলে পিইসি পরীক্ষায় শিশুদের বহিষ্কার কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং বহিষ্কার করা পরীক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষা নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চাওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের ‘প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা নির্দেশাবলি’র ১১ নম্বর নির্দেশনা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির মহাপরিচালক ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়।
আইনজীবী এএম জামিউল হক ফয়সাল গতকাল আদালতে শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত কুমার তালুকদার। এরই ধারাবাহিকতায় এ আদেশ আসে।
শুনানিতে অ্যাডভোকেট জামিউল হক ফয়সাল বলেন, ২০১৯ শিক্ষাবর্ষ প্রায় শেষ হতে চলেছে। পিইসি পরীক্ষায় যেসব পরীক্ষার্থী বহিষ্কার হয়েছে তাদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তায় পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তারা নতুন ক্লাসে ভর্তি হতে পারছে না। পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনায় তাদের ওপর মানসিক চাপ বেড়েছে। তাই চলতি মাসেই তাদের পরীক্ষা নেওয়া ও ফলাফলের বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা চান তিনি। জাতীয় শিক্ষানীতিকে পাশ কাটিয়ে ওই শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার করা হয়েছে বলে শুনানিতে উল্লেখ করেন জামিউল হক ফয়সাল।
দেশ রূপান্তরের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৭ নভেম্বর শুরু হওয়া প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অসাধু পন্থা অবলম্বনের অভিযোগ তুলে ১৮ নভেম্বর সোমবার পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে কোমলমতি ১৫ শিশু পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা এ ধরনের বহিষ্কারের সিদ্ধান্তকে শিশুদের ওপর এক ধরনের মানসিক নির্যাতন বলে উল্লেখ করেন। যারা এখনো পরীক্ষা কিংবা নকলের মতো বিষয়টি ঠিকমতো বুঝে উঠতে শেখেনি তাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারা। উদ্বিগ্ন শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী ও অভিভাবকরা আরও বলেন, পরীক্ষার হলে কর্তব্যরত শিক্ষকরা আরেকটু সচেতন হলে এ ধরনের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত এড়ানো যেত।
এরপর গত ২৫ নভেম্বর একই পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২১ নভেম্বর আদালত রুল জারির পর ২৪ নভেম্বর শেষ পরীক্ষায় খুলনা, বরিশাল ও রংপুর বিভাগে ৫০ জন শিশু শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া ১৭ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া ছয় বিষয়ের এ পরীক্ষায় মোট ১২৭ জন শিশু শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়।
আইনজীবী জামিউল হক ফয়সাল বলেন, ‘জাতীয় শিক্ষানীতির ১১ নম্বর বিধান অনুযায়ী শিশু পরীক্ষার্থীদের বহিষ্কারের কথা বলা হলেও ওই বিধানে যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এটিকে পাশ কাটিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। হাইকোর্ট বলেছে, ২৮ ডিসেম্বরের মধ্যে ওই পরীক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষা নিয়ে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। যতজন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছিল তাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের এই নির্দেশনা প্রতিপালিত হবে।’ তিনি বলেন, ‘হাইকোর্ট রুল দেওয়ার পরও রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বারবার ফ্যাক্স ও যোগাযোগ করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের জবাব পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে আদালত খুবই অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। এছাড়া ওই বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে তলব করেছে আদালত।’
