ঢাকার কেরানীগঞ্জে প্লাস্টিক পণ্য তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে পোড়া রোগীদের স্বজনরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় হাসপাতালে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। গত কয়েক দিন এক এক করে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ায় খারাপ সংবাদের ভয় জেঁকে বসেছে তাদের মনে। অনেকে হারিয়েছেন কান্নার শক্তিও। পোড়া রোগীদের চিকিৎসায় দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় গতকাল বুধবার শেখ আবু বকর সিদ্দিক সোহান (১৯) নামে আরও এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গতকাল পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ জনে। চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও ১২ জন। এর মধ্যে লাইফ সাপোর্টে থাকা ৪ জনের স্বজনরা উদ্বিগ্ন। দিনরাত হাসপাতালেই থাকছেন অনেকে। চিকিৎসকরা বলছেন, দগ্ধদের অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লাইফ
সাপোর্টে থাকা রোগীদের অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এ ছাড়া বার্ন ইউনিটের হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটে থাকা ৮ জনের অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো। তাদের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বার্ন রয়েছে। সবাই সুস্থ হবে বলে আশা করছি। তবে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে কিছুদিন সময় লাগবে।’
১১ ডিসেম্বর বিকেল সোয়া ৪টার দিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ার হিজলতলা এলাকায় প্রাইম প্লেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে আগুন লেগে একজন নিহত হন। পরে দগ্ধ ৩১ জনকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। গুরুতর দগ্ধ ১২ জনকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়, যার মধ্যে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। বাকি রয়েছেন ৪ জন। ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৮ জন। এখন পর্যন্ত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ জন হাসপাতালে মারা গেছেন।
গতকাল শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট ঘুরে দেখা গেছে লাইফ সাপোর্টে থাকা রোগীদের স্বজনরা উদ্বিগ্ন। চিকিৎসক এলেই ছুটে যাচ্ছেন। কী অবস্থা জানতে চাইছেন তারা। যেকোনো সময় দুঃসংবাদ আসার ভয়ে দিনরাত হাসপাতালেই অবস্থান করছেন তারা। স্বজনরা বলছেন, দিনে দুই থেকে তিনবার দগ্ধদের দেখার সুযোগ পাচ্ছেন তারা।
লাইফ সাপোর্টে থাকা ৫০ শতাংশ দগ্ধ সোহাগ দেওয়ানের (২৫) স্ত্রী চম্পা আক্তার হাসপাতালে ৬ বছরের মেয়ে সোহাগীকে নিয়ে বসে আছেন। কথা বলার শক্তি নেই তার। স্বজনরা বলছেন, ঘটনার পর থেকে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন চম্পা। কান্নার শক্তিও হারিয়েছেন তিনি। তাদের গ্রামের বাড়ি বড়িশালের হিজলা থানার ইন্দুরিয়া গ্রামে। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে সোহাগ সবার বড়।
সোহাগের ভাই সোহেল বলেন, ‘একই দুর্ঘটনায় পুড়ে ছোট ভাই সুজন বৃহস্পতিবার মারা গেছে। বড় ভাই সোহাগের অবস্থাও ভালো না। কখন কী হয় বলা যাচ্ছে না। এ জন্য হাসপাতালেই আছি। রোগীর শরীরের ফোলা কিছুটা কমেছে। ডাক্তাররা বলেছেন ও ভালো আছে।’ তিনি আরও বলেন, ভাই শুধু বলছে ‘আমি বাচমু না, আমারে বাসায় নিয়ে যা।’
গতকাল দুপুরে ৭০ শতাংশ দগ্ধ সাহজুল ইসলাম সাজুর (১৯) বাবা নজরুল ইসলাম ও মা সাহারা বেগমকে দেখা যায় হাসপাতালের এক কোনায় নামাজ পড়ছেন। সাজুর ছোট ভাই শাহাদাত জানান, তারাও ঘটনার পর থেকে হাসপাতালেই অবস্থান করছেন। তাদের বাড়ি কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরের বামনডাঙায়। থাকেন কেরানীগঞ্জের জিনজিরার আমিরাবাদে। দুর্ঘটনার পর থেকেই হাসপাতালে অবস্থান করছেন।
৪০ শতাংশ দগ্ধ মফিজুল ইসলামের (৪৫) দুই ছেলে ও স্ত্রী বুধবার থেকেই হাসপাতালে রয়েছেন। ছেলে রাইহান আহম্মেদ বলেন, আমরা ঘটনার পর থেকেই এখানে আছি। ভেতর থেকে কখন কী খবর আসে সেই অপেক্ষায় রয়েছি।
৫০ শতাংশ দগ্ধ ফিরোজের (৩৯) স্ত্রী নাজমা আক্তারের চোখমুখ ফুলে আছে। তিন বছরের মেয়ে জোহরাকে বুকে নিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন আর আল্লাহকে ডাকছেন। পরিবারে একমাত্র অবলম্বন ফিরোজ।
নাজমা আক্তারের ভাই রহমত আলী বলেন, ‘চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন আগের তুলনায় এখন কিছুটা ভালো আছেন ভাই।’
ঢামেক হাসপাতাল বার্ন ইউনিটে থাকা ৮ জনের অবস্থাও আগের চেয়ে ভালো বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। তাদের মধ্যে বাসির, আসলাম ও লাল মিয়ার ২০, জিসানের ১৭, সাখাওয়াতের ২২, জাকিরের ২৯, সাজিদের ১০ ও সিরাজের ২১ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।
গতকাল সকালে ঢামেক হাসপাতাল বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায় এইচডিইউ ইউনিটের ১৬ নম্বর বিছানায় রয়েছেন দগ্ধ লাল মিয়া (৪১)। পাশেই স্ত্রী লেনি আক্তার ১০ মাসের মেয়ে আলিহাকে নিয়ে বসে আছেন। সঙ্গে রয়েছে আরও দুই মেয়ে নীলা (১৪) ও নিসা (৬)। স্বামীর কিছু হয়ে গেলে তিন মেয়েকে নিয়ে কী করবেন সেই চিন্তায় দিন কাটছে তার।
লাল মিয়ার ছোট ভাই চান মিয়া জানান, এখন কথা বলতে পারছে, তবে মুখের ফুলা একটু কমে গেছে। আগের চেয়ে ভালো লাগছে তার।
একই ইউনিটে ভর্তি রয়েছেন বশির হাওলাদার (২৩)। তার বাড়ি বরগুনা সদর উপজেলায়। আরেক দগ্ধ জিসান মোল্লার (১৬) বাবা মো. আক্কাস মোল্লা জানান, তাদের বাড়ি নড়াইল সদর ষোলুয়া গ্রামে। এবারই জিএসসি পরীক্ষা দিয়ে গত মাসের ২৫ তারিখে ওই কারখানায় কাজ সে। সে বলেছিলে, ‘আব্বা, আমার পরীক্ষা তো শেষ, আমি দুই মাস কাজ করি, কিছু টাকা পাইলে ভর্তি, বইনখাতা কিনতে পারুম।’ পরে ওর এক চাচা রায়হান তাকে এই কারখানায় এনে কাজে দেন। দুর্ঘটনায় দগ্ধ হয়ে রায়হানও মারা গেছেন। আমার ছেলের ব্রেন খুব ভালো ছিল। ৯ হাজার টাকা বেতন বলে ওরে কাজে দেয়। তবে ওর কাজ দেখে ওর বেতন ১২ হাজার দিতে রাজি হয়। একমাত্র ছেলে আমার। ওর ওপরেই ভরসা, আশা, ওর জন্য কত কষ্ট করি আমি, মানুষের জমিতে কাজ করি। নিজের শুধু ভিটাবাড়ি।
ঢামেক বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা. আরিফুল ইসলাম নবীন জানান, এই বার্ন ইউনিটে যে ৮ জন রয়েছে, তাদের অবস্থায় স্টেবল, ভালোর দিকেই। তবে এখনো কেউ শঙ্কামুক্ত বলা যাবে না।
মৃত্যুর কাছে হার মানলেন সোহান : অভাবী সংসারের হাল ধরতে চাকরি নেন আবু সিদ্দিক সোহান (১৯)। চাকরির ছয় দিনের মাথায় কারখানায় আগুন লাগলে দগ্ধ হন তিনি। এরপর সাত দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন সোহান।
গতকাল বুধবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে সোহানের মৃত্যু হয়। গত ১১ ডিসেম্বর কেরানীগঞ্জে প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে তিনি দগ্ধ হয়েছিলেন।
ঢামেক বার্ন ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সোহানের শরীরের ৫০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ায় লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো।’
সোহান জামালপুরের মেলান্দহের গোপিন্দির আবদুর জব্বারের ছেলে। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে সবার ছোট। তার মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছে পরিবার। ঘটনার দিনই খবর পেয়ে গ্রাম থেকে মাকে নিয়ে ঢাকা আসেন বড় ভাই আলমাস। গতকাল তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘তাদের তিন ভাইয়ের আলাদা সংসার। সোহান মা-বাবার সঙ্গে থাকত। ছোটবেলা থেকেই তার পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ। কিন্তু বাবা চাইতেন সে সংসারের হাল ধরুক। এত টানাপড়েনের মধ্যেও সে মাধ্যমিক পাসের পর জামালপুরের ইসলামপুরে ডেবরাই কারিগরি কলেজে ভর্তি হয়।’
কলেজে ভর্তি হওয়ার পর বাবার কষ্ট কমাতে কাজের খোঁজে পাঁচ মাস আগে ঢাকা আসেন সোহান। তিব্বত কোম্পানির প্যাকেজিংয়ের কাজ নেন। তিন মাস পর প্রথম বর্ষের পরীক্ষা দিতে বাড়ি যান। পরীক্ষা শেষে আবার ঢাকা আসেন। এরপর খালাতো ভাই আসলামের মাধ্যমে গত ৫ ডিসেম্বর কেরানীগঞ্জের ওই প্লাস্টিক কারখানায় ৮ হাজার টাকা বেতনে কাজ নেন সোহান। কারখানার পাশেই একটি মেসে থাকতেন। চাকরির মাত্র ছয় দিনের মাথায় দগ্ধ হওয়ার পর গতকাল সোহানের মৃত্যু হলো। এ ঘটনায় খালাতো ভাই আসলামও দগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আলমাস ছোট ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য ঢাকা এসে রিকশা চালাচ্ছিলেন। কিন্তু তাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেল। সোহানের মৃত্যুর খবর বাবাকে এখনো জানানো হয়নি। একবারে মরদেহ গ্রামে নিয়ে যাবেন আলমাস। গতকাল সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে মা আফরোজা বেগমকেও (৫০) অসুস্থ দেখা যায়। সন্তানের নানা স্মৃতিচারণ করার ফাঁকে ফাঁকে তিনি মূর্ছা যাচ্ছিলেন।
