বিজিবিকে কমান্ড মেনে চলার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ০২:৪৮ এএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিজিবিকে বিশ্বমানের সীমান্তরক্ষী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ভিশন ২০৪১’ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সরকার এ বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিজিবি পুনর্গঠনের আওতায় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করে যাচ্ছে এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে একটি বিশ্বমানের আধুনিক সীমান্তরক্ষী বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ভিশন ২০৪১ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।’

প্রধানমন্ত্রী এ সময় বিজিবির সুনাম অক্ষুণন রাখার জন্য এই বাহিনীর সদস্যদের দেশপ্রেম ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং চেইন অব কমান্ড মেনে চলার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আশাকরি, আপনারা সব সময় দেশপ্রেম, সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে এই বাহিনীর সুনাম ও মর্যাদা সমুন্নত রাখবেন।’

গতকাল রাজধানীর পিলখানায় বিজিবি সদর দপ্তরে বিজিবি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ডকে একটি বাহিনীর অন্যতম চালিকা শক্তি আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার আবেদন থাকবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কমান্ড মেনে চলবেন এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখবেন। আর আপনাদের কোনো সমস্যা হলে সেটা দেখার জন্য আমরা তো আছিই।’

‘কাজেই আপনারা সব সময় সততার সঙ্গে, নিষ্ঠার সঙ্গে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে আপনাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবেন। যেন দেশ আজ অর্থনৈতিকভাবে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, সেই অগ্রযাত্রা যেন অব্যাহত থাকে।’ যোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘জাতির পিতার হাতে গড়া এই প্রতিষ্ঠান। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পার হতে হয়েছে। আগামী দিনে এই সীমান্তরক্ষী বাহিনী সারা বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মর্যাদা অর্জন করবেÑসে বিশ্বাস আমার আছে।’ এর আগে বিজিবি সদস্যরা মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় সালাম জানান।

কুচকাওয়াজ পরিদর্শন এবং অভিবাদন গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী। একটি সুসজ্জিত খোলা জিপে করে প্যারেড পরিদর্শনকালে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাফিনুল ইসলাম এবং প্যারেড কমান্ডার কর্নেল এ এম এম খায়রুল কবির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।

এ ছাড়া মোটর শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় এবং বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ ও বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থীরা ‘স্বাধীনতা ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ শীর্ষক ডিসপ্লে প্রদর্শন করে।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বিজিবি দিবস উপলক্ষে বীরত্ব ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিজিবির কর্মকর্তাদের মাঝে বর্ডার গার্ড পদক-২০১৯, রাষ্ট্রপতি বর্ডার গার্ড পদক-২০১৯, বর্ডার গার্ড পদক সেবা-২০১৯ ও রাষ্ট্রপতি বর্ডার গার্ড পদক সেবা-২০১৯ বিতরণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণকারী প্যারেড কমান্ডার এবং অন্যান্য কন্টিনজেন্ট কর্মকর্তার সঙ্গে শুভেচ্ছাবিনিময় করেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা ও কূটনৈতিক কোরের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী পিলখানায় বিজিবি সদর দপ্তরের বীর উত্তম আনোয়ার হোসেন প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীন ও বিজিবি মহাপরিচালক তাকে অভ্যর্থনা জানান।

পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বীর উত্তম ফজলুর রহমান খন্দকার মিলনায়তনে বিজিবি সদস্যদের বিশেষ দরবারে অংশগ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতা এ দেশের গরিব-দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্যই বাংলাদেশকে সুখী-সমৃদ্ধিশালী করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তারপরই থেমে যায় আমাদের অগ্রযাত্রা।’

তিনি উল্লেখ করেন, আবার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই কেবল দেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। ‘আজকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং বিশ্বে আজ বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দারিদ্র্যের হার ২০ দশমিক ৫ ভাগে নামিয়ে এনেছি। মানুষের আয় মাথাপিছু বেড়েছে, সবার বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। আজ আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং আমাদের আর কারও কাছে ভিক্ষে চেয়ে চলতে হয় না।’

অনেক চড়াই-উতরাই অতিক্রম করেই আজকের এই অর্জন এমন অভিমত ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এটা আমাদের ধরে রেখেই এগিয়ে যেতে হবে। আমরা মাথা উঁচু করে চলব এবং বিশ্বে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে আমাদের অবস্থান করে নিতে সক্ষম হব।’ তিনি বিজিবি সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের কাছে এটাই আমরা চাই, আপনারা এ দেশকে ভালোবেসে দেশের মানুষের প্রতি কর্তব্য পালন করবেন।’

‘দেশ যদি উন্নত হয় তাহলে আপনাদের পরিবার-পরিজনরা এবং দেশের মানুষই উন্নত হবে। সে কথাটা সব সময় মনে রাখবেন।’ বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত বিদ্রোহ ও হত্যাকা- বিজিবির (তৎকালীন বিডিআর) ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন। ওই ঘটনায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন।

প্রধানমন্ত্রী ওই ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বাহিনীর তৎকালীন মহাপরিচালকসহ যেসব অফিসার, সদস্য ও বেসামরিক ব্যক্তি শহীদ হয়েছেন, আমি তাদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করছি। তিনি বলেন, বিডিআর বিদ্রোহের সঙ্গে সম্পৃক্ত উচ্ছৃঙ্খল ও বিপথগামী বিডিআর সদস্যদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মাধ্যমে এ বাহিনী এখন সম্পূর্ণ কলঙ্কমুক্ত হয়েছে।

জাতির পিতা দেশের স্বাধীনতা দিয়ে গেলেও দেশ স্বাধীনের মাত্র সাড়ে ৩ বছরের মাথায় নির্মম হত্যাকা-ের শিকার হওয়ায় বাংলার জনগণকে তার কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক মুক্তি দিয়ে যেতে পারেননি। সে লক্ষ্য বাস্তবায়ন করাই তার এবং আওয়ামী লীগের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বলেও প্রধানমন্ত্রী অভিমত ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, জাতির পিতা স্বাধীনতা দিয়ে গেলে দেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ করে তোলার সুযোগ না পাওয়ায় এটা তার দায়িত্ব মনে করে যখনই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে এ কাজটি এগিয়ে নেওয়ার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় জাতির পিতার ১৯৭৪ সালে সম্পাদিত মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির আওতায় ভারতের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ছিটমহল বিনিময়, সীমান্ত সুরক্ষা, বিজিবির আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগীকরণে তার সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পার্বত্য সীমান্তের নিরাপত্তা বৃদ্ধি, দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী জনসাধারণের আর্থসামাজিক উন্নয়নে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলায় প্রথম পর্যায়ে ৩১৭ কিমি সীমান্তবর্তী রিং সড়ক নির্মাণকাজ শুরু করা হয়েছে। ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে ব্যাটালিয়ন সৃজনের মাধ্যমে ৫৩৯ কিমি অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে ৪৪২ কিমি সীমান্ত নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।

জানুয়ারি মাসে অত্যাধুনিক দুটি হেলিকপ্টার বিজিবিতে যুক্ত হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৩২৮ কিমি সীমান্তে স্মার্ট ডিজিটাল সার্ভিল্যান্স অ্যান্ড ট্যাকটিক্যাল রেসপন্স সিস্টেম স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, আধুনিক, যুগোপযোগী ও কার্যকর ট্যাংক বিধ্বংসী অস্ত্র ক্রয় করা হচ্ছে। ১২টি আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) এবং ১০টি রায়ট কন্ট্রোল ভেহিকেল ক্রয় করা হচ্ছে। সীমান্তের স্পর্শকাতর আইসিপি/এলসিপিসমূহে ভেহিকেল এক্স-রে স্ক্যানার মেশিন স্থাপন এবং ‘বিজিবি ডগ স্কোয়াড’ গঠন করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত