প্রথমবার এসএ গেসমে অংশ নিয়েই বাজিমাত করেছেন হোমায়রা আক্তার অন্তরা। নেপালে এসএ গেমসের ত্রয়োদশ আসরে বাংলাদেশকে প্রথম পদকটি উপহার দিয়েছেন এই কারাতেকা। এরপর ব্যক্তিগত স্বর্ণসহ জিতেছেন দলগত বিভাগে রুপাও। মাত্র ২০ বছর বয়সে এই প্রাপ্তিতে দারুণ অনুপ্রাণিত অন্তরা পরবর্তী লক্ষ্য ঠিক করেছেন এশিয়ান গেমসে স্বর্ণ জয়। দেশ রূপান্তরের মুখোমুখি হয়ে জানালেন সে কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তোফায়েল আহমেদ
প্রশ্ন : এসএ গেমসে এবার প্রথম পদকটিই আসে আপনার হাত ধরে। এ নিয়ে আলাদা ভালোলাগা আছে নিশ্চয়ই?
হোমায়রা আক্তার অন্তরা : দেশকে প্রথম পদক এনে দিতে পেরে খুশি। তবে আমার লক্ষ্য ছিল স্বর্ণ। তাই আপসোসটা আমার পরদিন পর্যন্তও সঙ্গী ছিল।
প্রশ্ন : স্বর্ণ জয়ের মধ্যেই সেই আফসোটটা তো ভুলেছিলেন। বাংলাদেশ কারাতে থেকে তৃতীয় স্বর্ণ পেয়েছিলেন...
অন্তরা : সেদিন জেদ হয়েছিল, আমাকে স্বর্ণ জিততেই হবে। পদক মঞ্চে দেশের পতাকা উঁচু করতেই হবে। প্রথম প্রতিপক্ষ হিসেবে পাই পাকিস্তানকে। প্রতিপক্ষ দেখেই আমার মুক্তিযুদ্ধের কথা প্রথম মনে আসে। মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের পতাকাকে উঁচু করে গিয়েছেন, আমি আমার পতাকাকে নিচে নামাতে পারব না। আমি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে খেলছি। আমি মনে করি সেটা পেরেছিও। কারণ পাকিস্তানের প্রতিযোগীর পয়েন্ট ছিল ০, আমার ৪। পাকিস্তানকে হারানোর আত্মবিশ^াসটাই পরের ম্যাচে আমার জন্য সহজ করে দিয়েছিল এবং নেপালকে হারিয়ে স্বর্ণ জয় করি।
প্রশ্ন : আরেকটি স্বর্ণ আসতে পারত। দলগত ইভেন্টে শেষ পর্যন্ত রুপা পেতে হয়েছে। এ নিয়ে আক্ষেপ আছে?
অন্তরা : ওই ম্যাচে আমাদের প্রথম প্রতিপক্ষ ছিল শ্রীলঙ্কা। ওরা কোনো গোল্ড মেডেল পায়নি। এ কারণে তাদের জেদ ছিল। ওদের কোচ বলছিল, পয়েন্ট নয় হিট করো। শুরু থেকেই আমাদের বাজেভাবে আঘাত করছিল ওরা। মাউনজেরা বর্ণা ইনজুরড হলেও খেলা শেষ করে এবং জিতে ফেরে। তবে মারজান আক্তার প্রিয়া মেডিকেলে আউট হন। সেটার প্রভাব পড়েছে ফাইনালে। প্রিয়ার বদলে যে খেলেছে সে খুব জুনিয়র। তবু চেষ্টা করেছে। খুবই আক্ষেপ ছিল কেন আমরা স্বর্ণটা জিততে পারলাম না। আমরা আসলে জিততে পারতাম, কিন্তু শ্রীলঙ্কা যেভাবে আমাদের হিট করেছে, যার জন্য শারীরিকভাবে দুর্বল ছিলাম।
প্রশ্ন : প্রথমবার এসএ গেমসে অংশ নিয়ে একটি করে ব্যক্তিগত স্বর্ণ ও ব্রোঞ্জ জিতলেন। দলগতে রয়েছে একটি রুপা। নিজে কতটুকু তৃপ্ত?
অন্তরা : আমার বয়স ২০। আমি এত অল্প বয়সে তিন তিনটি পদক অর্জন করেছি। এটা সত্যিই বিরাট পাওয়া আমার কাছে। সবাই এক-দুইটা ইভেন্ট খেলেছে। আমিই একমাত্র খেলোয়াড় কারাতেতে যে তিনটি ইভেন্ট খেলেছি এবং তিনটিতেই পদক পেয়েছি। এটা আমার জন্য ভাগ্যের ব্যাপার। আমি ধন্যবাদ জানাই, যারা আমাকে সুযোগ করে দিয়েছেন এসএ গেমসে খেলার।
প্রশ্ন : দেশ ছাড়ার আগে ভেবেছিলেন এমন সাফল্য নিয়ে ফিরতে পারবেন?
অন্তরা : নেপালে খেলা জানার পরেই মনে হয়েছিল ওখানে তো মানুষ হিমালয় জয় করে। ছোটবেলাই আমার স্বপ্ন ছিল অনেক বড় কিছু করব। সাফে সুযোগ পাওয়ায় মনে হচ্ছিল স্বপ্নের খুব কাছে পৌঁছেছি। এখান থেকে স্বর্ণ হাতছাড়া হোক সেটা আমি চাইনি। মেডেল জিততে না পারলে আমার সব পরিশ্রম বৃথা যেত। আমি মেডিকেল টেস্ট, ভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষা এগুলো না দিয়ে ক্যাম্পে অংশগ্রহণ করেছি। কিছু যদি অর্জন করতে না পারি তবে তো সব ত্যাগ বৃথা। সেই প্রতিজ্ঞাতেই এই অর্জন।
প্রশ্ন : ভার্সিটি পরীক্ষা না দিয়ে ক্যাম্পে থাকার সিদ্ধান্ত। এর পেছনে কোন জিনিসটি কাজ করেছে?
অন্তরা : প্রচুর ঝুঁকি নিয়ে আমি কাজটা করেছি। যদি আমি স্বর্ণ জিততে না পারতাম, তবে আমার এই কূলও যেত, ওই কূলও যেত। তারপরও আমি দেশের জন্য কিছু করতে পারব, এই জিনিসটা আমার মধ্যে কাজ করেছে। সেই চিন্তা থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া।
প্রশ্ন : কারাতে খেলতে পরিবার থেকে কতটা সহায়তা পেয়েছেন?
অন্তরা : আমরা চার বোন। সবাই কারাতে খেলি। গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ী হলেও ঢাকাতেই বেড়ে ওঠা। বাবা ব্যবসায়ী, মা গৃহিণী। আমার মেধার কারণে বাবা-মা বলতেন, ‘তুমি যে সময়টা কারাতেতে দিচ্ছো, তা পড়াশোনায় দিলে ভালো একটা ভার্সিটিতে পড়তে পারতে।’ এটা শোনার পর কারাতে খেলতে গেলে মনে হতো আমি তাদের কথা শুনছি না...।
প্রশ্ন : শুরুর গল্পটা যদি বলতেন? কীভাবে কারাতে আসা?
অন্তরা : খুব ছোটবেলাতে আমার স্বপ্ন ছিল কারাতে করব। ২০১৩ সালে আমি এনএসসির জিমনেশিয়ামে এসেছিলাম শুধু খেলা দেখার জন্য। তখন পোস্টারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ২০১০ এসএ গেমসে স্বর্ণজয়ীদের ছবি দেখি। সেই জিনিসটা আমাকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করে। এরপর আমি মোজাম্মেল হক মিলন স্যারের ক্লাবে ভর্তি হই। আনসারে ভাতা পেয়ে ২০১৭ সালে ন্যাশনালে খেলা শুরু করি। প্রথম ন্যাশনালে আমার দুটি রৌপ্যপদক ও একটি ব্রোঞ্জপদক ছিল। ২০১৮ সালে আমার দ্বিতীয় ন্যাশনাল। সেখানে তিনটি ইভেন্টের তিনটিতেই আমি স্বর্ণপদক অর্জন করি। এই সাফল্য দেখে ফেডারেশন ভেবেছে আমি এসএ গেমসে ভালো রেজাল্ট করতে পারব।
প্রশ্ন : এরপর নিজেকে কোথায় দেখতে চান?
অন্তরা : নিজেকে এশিয়ান গেমসে গোল্ড মেডেলিস্ট হিসেবে দেখতে চাই।
প্রশ্ন : এশিয়ান গেমস ২০২২ সালে। সেখানেও কিছু সম্ভব মনে করেন?
অন্তরা : এখনো হাতে দুই বছরের বেশি সময় আছে। এই সময়টা যদি আমাদের ভালোভাবে তৈরি করা হয়, যদি কেয়ারিং পাই অবশ্যই সম্ভব। আমাদের কিন্তু নিজস্ব কোনো খেলার জায়গা পর্যন্ত নেই। এই বিষয়গুলো কর্তৃপক্ষ নজরে নিলে শুধু আমি নই আরও অনেককে দিয়েই বড় বড় সাফল্য পাওয়া সম্ভব বলে আমি মনে করি।
