দক্ষ ও যোগ্য প্রশাসন গড়ে তুলতে বড় প্রকল্প নিচ্ছে সরকার। ২৪১ কোটি টাকার এ প্রকল্পের আওতায় সরকারের ১ হাজার ৭৮০ কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে প্রশিক্ষণ ও ডিগ্রি অর্জন করবেন। এ তালিকায় রয়েছেন চাকরি জীবনের শেষ সময়ে থাকা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও সিনিয়র সচিবরাও। তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের আওতায় ৭৫ জন সচিব ও সিনিয়র সচিবও করবেন বিদেশ সফর। যদিও সফর শেষে অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সময় পাওয়ার আগেই অবসরে যাওয়ার বড় সম্ভাবনা রয়েছে তাদের অনেকের।
ক্যাডার সার্ভিসে যোগদান করা কর্মকর্তাদের একটি অংশ চাকরি জীবনের শেষদিকে সচিব হন। তাদের মধ্যে যারা আগে সচিব পদে পদোন্নতি পান, তারা পরে সিনিয়র সচিব হন। অতীতে দেখা গেছে, অনেক কর্মকর্তা সচিব বা সিনিয়র সচিব হওয়ার পর অল্প কয়েক মাসের মধ্যে অবসরে গেছেন। তাদের কেউ কেউ পরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেলেও বাকিরা এ সুযোগও পান না। ফলে সচিব বা সিনিয়র সচিব থাকাবস্থায় নেওয়া তাদের প্রশিক্ষণ বা ডিগ্রি অর্জন থেকে প্রশাসনের খুব একটা সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকে না। তা সত্ত্বেও ৭৫ জন সচিব-সিনিয়র সচিব যাবেন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রিফ্রেশার্স কোর্স’ করতে। নতুন নেওয়া এ প্রকল্পের আওতায় ২৫০ জন অতিরিক্ত সচিব ও ৫০০ জন করে মোট ১০০০ জন যুগ্ম সচিব ও উপসচিবরা বিদেশে প্রশিক্ষণ নেবেন। অথচ প্রশাসনে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে কর্মরত থাকবেন এমন নবীন কর্মকর্তাদের এতে রাখা হয়নি।
প্রকল্প প্রস্তাবকারী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২১ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ ও যোগ্য প্রশাসনিক কাঠামো গড়া জরুরি। এজন্য বিদেশে উচ্চ প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে নেওয়া এ ধরনের প্রকল্পের মূল্যায়ন করে নতুন প্রকল্প নেওয়া উচিত। এতে বোঝা যাবে, এসব প্রশিক্ষণ আদৌ দরকার আছে কি না। একই সঙ্গে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা এবং কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে এসে তা যেন কাজ লাগাতে পারেন, সেটাও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিতে হবে। তা না হলে প্রশিক্ষণের নামে কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ হবে, সরকারের হবে অর্থের অপচয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনে ‘বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকারকে শক্তিশালীকরণ (দ্বিতীয় পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ১ হাজার ৭৮০ জন বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তাসহ প্রকল্প বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণে বিদেশে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪০ কোটি ৬৯ কোটি টাকা। বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে এ সংক্রান্ত প্রকল্পের অর্থায়নের আহ্বানে সাড়া না পেয়ে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে বরাদ্দ দিতে হচ্ছে। চলতি ডিসেম্বর ২০২২ সাল নাগাদ এটি বাস্তবায়ন হবে। এর আগে ২০০৯ সালে এ ধরনের আরেকটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, যার আওতায় ২০১৭ সাল পর্যন্ত ২০৩০ কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
নতুন প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুসারে, সিনিয়র সচিব, সচিব ও ভারপ্রাপ্ত সচিব পদমর্যাদার ৭৫ জন কর্মকর্তা ‘রিফ্রেশার্স কোর্স’ করতে যাবেন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তাদের স্বল্পমেয়াদি (১০ দিন) প্রশিক্ষণ হবে। অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার ২৫০ কর্মকর্তা ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন। যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার ৫০০ জন কর্মকর্তা যাবেন যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক বিশ্ববিদ্যালয় ও ইতালির অবস্থিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় (আইএলও সেন্টারে)। ৫০০ জন উপসচিব যাবেন অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০ দিনের প্রশিক্ষণ নিতে। এর বাইরে ৩০০ কর্মকর্তা বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি ও ১০৫ কর্মকর্তা ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জনের জন্য যাবেন। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবেন এমন ৫০ কর্মকর্তাকেও বিভিন্ন প্রশিক্ষণে রাখা হয়েছে।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার গত শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ ধরনের কর্মসূচি আগেও নেওয়া হয়েছে। আগে যারা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তাদের দ্বারা দেশ বা জাতির কী উপকার হয়েছে, তা নিয়ে পর্যালোচনা হওয়া দরকার। মূল্যায়ন করলেই বোঝা যাবে এসব প্রশিক্ষণ আদৌ দরকার আছে কি না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার আমলে সিনিয়র সচিব ছিল না, তবে সচিবদের অনেকে লম্বা সময় সেবা দিয়ে থাকেন। তারা প্রশিক্ষণে যেতে পারেন।’
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রশিক্ষণ সবসময়ই ভালো। এসব প্রশিক্ষণ কর্মকর্তাদের চিন্তাভাবনা ও সেবা দেওয়ার ধরন বদলে দেয়, যা দেশের জন্য খুব জরুরি। তিনি বলেন, অর্থের অপচয় যেন না হয়, সে বিষয়টি মনিটরিং করা হবে। প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যেন ওইসব কর্মকর্তার কাছ থেকে সরকার বেশি সময় ধরে সেবা নিতে পারে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ ক্ষেত্রে যেসব সিনিয়র সচিবের মেয়াদকাল কম, তাদের চেয়ে অধিক সময় সার্ভিসে থাকবেন এমন সিনিয়র সচিবদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়ে থাকে। অনেকে সচিব হওয়ার পরও দুই-এক বছর সেবা দেন। তাদের এখানে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
প্রশিক্ষণ বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বিশ^ ব্যাংকের ঢাকা অফিসের পরামর্শক ও অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ যেন সঠিকভাবে হয়, তা মনিটরিংয়ে থাকা উচিত। কর্মকর্তারা যেসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন, দেশে ফিরে তা প্রয়োগ করতে পারেন না। কারণ তাদের পোস্টিং হয় অন্য বিভাগে। এজন্য প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশিক্ষণের জ্ঞান কাজে লাগাতে সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা রাইট টাইম, রাইট ট্র্যাক থিউরির দিকে যাচ্ছি। এর মানে, যার যে বিষয়ে জ্ঞান ও পড়ালেখা, তাকে সে জায়গায় বসানো হচ্ছে। অনেক জায়গায় লিডারশিপ ও বিভিন্ন ভাষা দক্ষতার প্রয়োজন হয়, আমরা সেখানে সেই লোক দেওয়ার চেষ্টা করছি। কাজও চলছে।’
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ সালকে সামনে রেখে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের জন্য যোগ্য ও গতিশীল প্রশাসন তৈরি করা হবে। ক্যাডারের উপযুক্ত কর্মকর্তাদের সুশাসন, উন্নয়ন প্রশাসন, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন, নবায়নযোগ্য শক্তি ও উন্নয়ন অর্থনীতিসহ আরও অন্যান্য বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি ও পিএইচডি এবং স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিতে কর্মকর্তারা বিদেশে যাবেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা বিভাগের সচিব নূরুল আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই প্রকল্প প্রস্তাব করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। দক্ষ জনবল কাঠামো গড়ে তুলতে এটি জরুরি। দ্রুত প্রকল্প অনুমোদনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রিফ্রেশার্স কোর্সের মাধ্যমে সচিবরা তাদের আগে নেওয়া প্রশিক্ষণগুলো আবারও ঝালাই করতে পারবেন। অন্যরাও বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ নেবেন।
পিইসি সভা বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের উপপ্রধান বোরহানুল হক বলেন, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তাদের জ্ঞান ও পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটি হাতে নিতে চায়। এ প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য বৈদেশিক সহায়তা অনুসন্ধান করা হয়েছিল। কিন্তু সাড়া পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, শিগগিরই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
