কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজের দাম নির্ধারণে পরিকল্পনা

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ০২:০১ এএম

দেশের পেঁয়াজের চাহিদা মেটাতে বড় একটি অংশের আমদানিনির্ভরতায় প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট সময়ে পণ্যটির দাম বেড়ে যায়। আবার উৎপাদন মৌসুমে ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষককে লোকসানে পড়তে হয়। এতে অধিকাংশ কৃষক পেঁয়াজ উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হন। তাই আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজার স্থিতিশীল রাখা ও কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এজন্য সম্ভাব্য সুযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কৃষি মন্ত্রণালয় পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের উৎসাহিত করবে। এক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কৃষক পর্যায়ে পণ্যটির দাম নির্ধারণে পদক্ষেপ নেবে। 

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে তিন মৌসুমে পেঁয়াজ চাষের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে আগাম ও শীতকালীন–এই দুই মৌসুমে। তবে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএআরআই বা বারি) বিজ্ঞানীরা বারি পেঁয়াজ-২, বারি পেঁয়াজ-৩ ও বারি পেঁয়াজ-৫ জাতের তিনটি গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের জাত উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছেন। যার স্বাদ ও ফলন কোনোটাই শীতকালীন পেঁয়াজের চেয়ে কম নয়। এর মধ্যে বারি পেঁয়াজ-২ ও ৩ বিশেষভাবে খরিফ মৌসুমে আবাদের জন্য উদ্ভাবন করা হয়েছে। এসব পেঁয়াজের বীজ ফেব্রম্নয়ারি থেকে মার্চ মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহের ভেতর জমিতে বুনতে হয়। চারা গজানোর পর তা এপ্রিল মাসে রোপণ করতে হয়। গ্রীষ্মকালীন চারা মাঠে লাগানোর ৮০-৯০ দিনের মধ্যে পেঁয়াজ তোলার উপযোগী হয়ে যায়। ফলে তা জুলাই-আগস্টের মধ্যে তুলে ফেলা সম্ভব। শীতকালীন পেঁয়াজ তোলার চার মাস আগেই ওই পেঁয়াজ পাওয়া যায়। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ বর্ষাকালেও আবাদ করা যায়। এই জাত তিনটির বিস্তারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেয়। কিন্তু অতিরিক্ত খরচ ও সেই অনুপাতে লাভ না হওয়ায় কৃষকরা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। অথচ গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ তোলার মৌসুমেই (আগস্ট-অক্টোবর) বাজার সবচেয়ে চড়া থাকে। এই সময়ে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ কমে যাওয়ায় আমদানির মাধ্যমেই চাহিদা মেটাতে হয়, যার বেশিরভাগ আসে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে। দেশটি কয়েক বছর ধরে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করছে। আর সরবরাহ সংকটের অজুহাতে দেশের ব্যবসায়ীরা পণ্যটির দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়াচ্ছে। চলতি বছর দেশের বাজারে বিশ্বের সর্বাধিক দামে পণ্যটি বিক্রি হয়েছে। সমস্যা সমাধানে বাড়তি খরচ করে সরকার বিভিন্ন উপায়ে পেঁয়াজ আমদানি করে আসছে। তবে দাম এখনো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সময়ে পেঁয়াজ আমদানি বাবদ কয়েকশ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়েছে। অথচ এই অর্থ যদি গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদনে ব্যয় করা হয়, তাহলে আমদানিনির্ভরতা ও সরবরাহ-সংকট দূর হবে। দেশের অর্থ দেশেই থাকবে। হয়ত স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি দামে পণ্যটি বিক্রি করতে হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইং সূত্রে জানা গেছে, কৃষি মন্ত্রণালয় অধিদপ্তরকে পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়াতে সব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলেছে। অধিদপ্তর নতুন মৌসুমের পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২৩ লাখ ৩০ হাজার টন থেকে বাড়িয়ে ২৩ লাখ ৮৩ হাজার টনে উন্নীত করেছে। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদন করা সম্ভব হলে লক্ষ্যমাত্রার পরিমাণ ২৫ লাখ টন ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা দেশের বার্ষিক চাহিদার সমান। অধিদপ্তরের কৃষি সংঘ নিরোধ বিভাগ থেকে জানা যায়, এতদিন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ছিল, কেউ আমদানি করতে চাইলেই তাকে অনুমোদন দেওয়ার। তবে বর্তমানে এই অবস্থান থেকে সরে আসার পরিকল্পনা করছে মন্ত্রণালয়। অভ্যন্তরীণ কৃষকদের দাম নিশ্চিতে জানুয়ারির পর থেকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পেঁয়াজ আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা বা অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করারও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসমাইল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদন করা গেলে বাজার অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। কীভাবে স্বল্প খরচে এই জাতের পেঁয়াজ উৎপাদন করা যায় সেই বিষয়ে বিএডিসি ও বারিকে আরও গবেষণা করতে হবে।  কৃষকরা যাতে পেঁয়াজ উৎপাদনের জন্য খুব সহজে ঋণ পায় সেজন্য কৃষি ব্যাংকের সব ব্যবস্থাপককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ন্যূনতম প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলেই কৃষকরা ঋণ নিতে পারবেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চিন্তা করেছি এখন থেকে কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজের দাম নির্ধারণ করব। এতে কৃষকরা লাভবান হলে উৎপাদন আরও বাড়াবে। ফলে আমদানিনির্ভরতা কমে আসবে। ২৬০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ খেতে চাই না। সারা বছর ৩০-৩৫ টাকা দামে পেঁয়াজ চাই। উৎপাদন বাড়াতে আমরা কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছি। চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়ানো গেলে আর কোনো সংকট থাকবে না। আশা করছি, এই কৌশলে অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত