গাজীপুরের কালীগঞ্জে বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় বখাটের মারধরের শিকার তরুণী বিষপানের পাঁচ মাস পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তার নাম জেসমিন আক্তার রিপা (২৩)। গতকাল শনিবার সকালে বাবার বাড়িতে মৃত্যুর পর কালীগঞ্জ থানা পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে। এর আগে ১০ আগস্ট এলাকায় বখাটে ও সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত বিল্লাল ফরাজী রিপাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাব প্রত্যাখান তাকে মারধর করে বিল্লাল। এতে অপমান ও লজ্জায় সেদিন রাতেই বাড়িতে থাকা কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন রিপা।
নড়াইলের লোহাগড়ায় যৌন হয়রানির শিকার স্কুলছাত্রী খাদিজা খানম (১৩) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। বখাটেদের উত্ত্যক্তে অতিষ্ঠ হয়ে গত ২৯ ডিসেম্বর সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। পরে গত শুক্রবার খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
তরুণী রিপার খালা রুনা বেগম দেশ রূপান্তরকে জানান, রিপার বাবা পেশায় দিনমজুর। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে রিপা মেজো। দীর্ঘদিন থেকে স্থানীয় ‘সন্ত্রাসী’ বিল্লাল ফরাজী বিয়ের জন্য রিপাকে উত্ত্যক্ত করছিল। ২০১৯ সালের ১৪ আগস্ট রিপার অন্যত্র বিয়ের দিন নির্ধারণ হয়। এ খবর জানতে পেরে বিল্লাল ফরাজী ১০ আগস্ট
রিপাকে বাড়ির পাশের রাস্তায় পেয়ে বিয়ের জন্য চাপ দেয়। প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে বিল্লাল রিপাকে মারধর করে। বাড়ি ফিরে রিপা বিষয়টি তার মা-বাবাকে জানায়। পরিবারের লোকজন ঘটনাটি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও বিল্লালের চাচা হেকিম ফরাজীকে জানালে বিল্লাল আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সে ওইদিন রাতে রিপার মায়ের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে অশ্লীল কথাবার্তার পাশাপাশি তাদের হত্যাসহ নানা ভয়ভীতি দেখায়। তার মা মোবাইল ফোনের লাউড স্পিকারে কথা বলায় পাশে থাকা রিপা সব কথা শুনতে পায়। অপমানজনক সেসব কথা সইতে না পেরে রাগে ও ক্ষোভে রিপা ঘরে গিয়ে লিচুগাছে দেওয়ার জন্য এনে রাখা কীটনাশক পান করে। টের পেয়ে পরিবারের লোকজন দ্রুত তাকে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে রেফার্ড করেন। পরে ঢামেকে নেওয়ার পথে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে রিপাকে উত্তরা রিজেন্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ১৫ দিন চিকিৎসার পর তাকে ঢামেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে দেড় মাস চিকিৎসা করিয়ে প্রায় ২ মাস আগে রিপাকে বাড়িতে নিয়ে আসে তার পরিবারের সদস্যরা। বাড়িতে তাকে কৃত্রিমভাবে খাবার দিয়ে চিকিৎসা করানো হচ্ছিল। পরে গতকাল রিপা মারা যায়।
রুনা বেগম বলেন, ‘মেয়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে দরিদ্র পরিবারটি একেবারে নিঃস্ব হয়ে যায়। টাকার অভাবে হাসপাতালে না রেখে বাড়িতেই চিকিৎসা দিচ্ছিল রিপার।’
রিপার মা নুরজাহান আক্তার জানান, চার বছর আগে কাপাসিয়া এলাকার এক প্রবাসীর সঙ্গে বিয়ে হয় রিপার। বিয়ের ৮ মাসের মাথায় তাদের সংসার ভেঙে যায়। এরপর তার সন্তানের জন্ম হয়। মেয়ে নুহাকে নিয়ে বাবার বাড়ি কালীগঞ্জে বসবাস করছিল রিপা।
নুরজাহান আক্তার বলেন, ‘রিপাকে মারধরের পর স্থানীয়দের কাছে বিচার চেয়ে না পেয়ে আমি বাদী হয়ে গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর বিল্লাল ফরাজী ও তার চাচা হেকিম ফরাজী মেম্বারসহ সাতজনকে আসামি করে কালীগঞ্জ থানায় মামলা করি। মামলার পর সন্ত্রাসী বিল্লাল দেশত্যাগ করে মালয়েশিয়ায় চলে যায়। অন্যরা হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে এসে আমাদের পরিবারকে হুমকি দিয়ে আসছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ইউপি সদস্য আব্দুল হেকিম ফরাজী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিল্লাল খারাপ প্রকৃতির লোক। জেসমিন বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় বিল্লাল তাকে মারধর করে। পরে সে ওই পরিবারকে ভয়ভীতি দেখালে জেসমিন বিষপান করে।’
গত ৩১ জুলাই বিল্লাল ফরাজী মোক্তারপুর ইউনিয়নের বড়গাঁও প্রাথমিক সরকারি বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। বিষয়টি বিল্লালের পরিবারকে জানালে সে নির্যাতনের শিকার ওই শিক্ষার্থীর মা-বাবাকে মারধর করে বলেও অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া বড়গাঁও এলাকার যুবলীগকর্মী মামুন হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি বিল্লাল ফরাজী।
উত্ত্যক্তের শিকার স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যা : নড়াইলের লোহাগড়ায় যৌন হয়রানির শিকার স্কুলছাত্রী খাদিজা খানম (১৩) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। বখাটেদের উত্ত্যক্তে অতিষ্ঠ হয়ে গত ২৯ ডিসেম্বর সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। পরে গত শুক্রবার খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। গতকাল শনিবার সকালে নিজ গ্রাম উত্তর পাংখারচরে জানাজা শেষে খাদিজাকে দাফন করা হয়।
লোহাগড়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আমানুল্লাহ আল বারী দেশ রূপান্তরকে জানান, খাদিজার আত্মহত্যাচেষ্টার পর তার বাবা সেলিম সরদার বাদী হয়ে গত ৩০ ডিসেম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা করেন। মামলার প্রধান আসামি সাব্বির শেখকে (১৮) ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার অন্য দুই আসামি নবীর শেখ ও সজীব শেখ পলাতক।
খাদিজার বাবার করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, উত্তর পাংখারচর গ্রামের কামাল শেখের ছেলে সাব্বির শেখ বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসার পথে খাদিজাকে উত্ত্যক্ত করত। গত ২৯ ডিসেম্বর বাড়ির পাশের পুকুর থেকে পানি নিয়ে ফেরার পথে বখাটে সাব্বির এবং তার সহযোগী নবীর ও সজীব খাদিজার পথ রোধ করে যৌন নির্যাতন করে। বিষয়টি সহ্য করতে না পেরে খাদিজা বাড়ি ফিরে ফ্যানের সঙ্গে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। টের পেয়ে পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় পরে সেখান থেকে খাদিজাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
খাদিজার বাবা সেলিম সরদারের অভিযোগ, বখাটে সাব্বির শেখ ও তার পরিবারের সদস্যদের দফায় দফায় সাবধান করা হলেও খাদিজার ওপর যৌন হয়রানি থামেনি।
খাদিজাকে উত্ত্যক্তকারী সাব্বির শেখের দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা আমানুল্লাহ আল বারী।
