ইরানের কেরমান শহরে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় ইরাকে নিহত জেনারেল কাসেম সুলেইমানির দাফন অনুষ্ঠানে পদদলিত হয়ে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যুর পর সাময়িকভাবে দাফন স্থগিত করা হয়। দাফন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ইরানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখো মানুষের ঢল নামে কেরমান শহরে।
ইরানি স্টুডেন্ট নিউজ এজেন্সির (ইসনা) প্রতিবেদনে ৬২ বছর বয়সী এ জেনারেলের দাফন স্থগিত করার কথা বলা হলেও কতক্ষণ দেরি করা হবে সে বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি। পদদলনে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু ও দুই শতাধিক আহত হয়েছেন বলে ইরানি সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ জানিয়েছে।
গত শুক্রবার ইরাকের বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় সুলেইমানি নিহত হন। এরপর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সুলেইমানির মৃত্যুতে ইরান তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছিল। ইরাক ও ইরানের বিভিন্ন শহরে কুদস বাহিনীর নিহত এ প্রধানের মৃতদেহের প্রতি সম্মান জানাতে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ স্লোগান দিয়েছেন। গতকাল ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাবেদ জারিফ আলজাজিরাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ধাপে ধাপে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
১৯৯৮ সাল থেকে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর ‘বিদেশি শাখা’র দায়িত্বপ্রাপ্ত সুলেইমানিকে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির পর দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। যুক্তরাষ্ট্র তাকে ‘সন্ত্রাসী’ ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করলেও নিজের দেশে সুলেইমানি বীরের মর্যাদা পেয়ে আসছিলেন।
ঘটনার ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের (পেন্টাগন) অধীনস্ত সব প্রতিষ্ঠান ও কর্মীকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে আইন পাস করেছে ইরানের পার্লামেন্ট। গতকাল মঙ্গলবার ২৩৩ জন আইনপ্রণেতা সর্বসম্মতভাবে আইনটির পক্ষে ভোট দিয়েছেন।
ওয়াশিংটন ইরানের সেনাবাহিনীকে (ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস-আইআরজিসি) সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকাভুক্ত করলে ২০১৯ সালের এপ্রিলে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে পশ্চিম এশিয়ায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডকে সন্ত্রাসী সংগঠন আখ্যা দিয়ে আইন পাস করে ইরান।
মঙ্গলবার ওই আইনে সংশোধনী এনে পেন্টাগনভুক্ত সব সংগঠন ও কর্মীকেই সন্ত্রাসী আখ্যা দেওয়া হয়। বিলটি পাসের পর আইনপ্রণেতারা ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ স্লোগান দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার আহ্বান জানান। এছাড়া সংশোধিত আইনে ইরানের বিপ্লবী গার্ডসের বিদেশি শাখা কুদস ফোর্সের জন্য জাতীয় উন্নয়ন তহবিল থেকে অতিরিক্ত ২০ কোটি ইউরো বরাদ্দের অনুমোদন দেওয়া হয়।
ইরাকের মাটিতে হামলা চালিয়ে দেশটির বেশ কয়েকজন মিলিশিয়া নেতা ও সুলেইমানিকে হত্যা করায় প্রতিবাদ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে অভিযোগ জানিয়েছে বাগদাদ। নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের কাছে পাঠানো পৃথক চিঠিতে এ অভিযোগ জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ইরাকের মাটিতে অবস্থান করে দেশটির সামরিক ঘাঁটিতে হামলা এবং ইরাক ও মিত্রদের ঊর্ধ্বতন সামরিক কমান্ডারদের হত্যা করে সার্বভৌমত্বকে মারাত্মকভাবে লঙ্ঘন করেছে যুক্তরাষ্ট্র।’
এদিকে বসে নেই যুক্তরাষ্ট্র। ভারত মহাসাগরে গোপন সামরিক ঘাঁটি দিয়াগো গার্সিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ছয়টি বি-৫২ স্ট্রাটোফোরট্রেস দীর্ঘ-পাল্লার বোমারু বিমান পাঠাচ্ছে বলে জানিয়েছে সিএনএন। গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানান, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রস্তুত এসব বোমারু বিমান। এর আগে গত বছর ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার সময় কাতারে ছয়টি বি-৫২ বোমারু বিমান মোতায়েন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার বাইরে দিয়াগো গার্সিয়াতে বিমানগুলো রাখা হয়েছে।
ইরানের সাংস্কৃতিক স্থাপনাগুলোতে হামলার হুমকি দিয়ে ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের এ ধরনের স্থানগুলো সুরক্ষিত থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কো ও ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই যুদ্ধসহ সব সময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার আন্তর্জাতিক ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছে। আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী সাংস্কৃতিক স্থানগুলোকে সামরিক হামলার লক্ষ্যস্থল করা যুদ্ধাপরাধ।
সুলেইমানির হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নাগরিক বা দেশটির স্বার্থের কোনো ক্ষতি করলে ‘ইরান ও ইরানের সংস্কৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ’ স্থানগুলোতে ‘খুব দ্রুত কঠোর আঘাত’ হানা হবে বলে হুমকি দেন ট্রাম্প। পরে ‘যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন মেনেই কাজ করবে’ বলে জানান দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও।
যুদ্ধের প্রস্তুতি ছাড়াও মিত্রদের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে ওয়াশিংটন প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসúারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন সৌদি আরবের উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান। গতকাল এক টুইট বার্তায় তিনি জানিয়েছেন, সাক্ষাতের সময় উভয় দেশের পারস্পরিক চ্যালেঞ্জসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা করেছেন তারা। এর আগে গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সৌদি মন্ত্রী। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে ইরানি শাসকদের হুমকি মোকাবিলায় রিয়াদের অব্যাহত সমর্থনের জন্য সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চায় না এবং উত্তেজনা নিরসনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে।’
