বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাহেন্দ্রক্ষণ

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২০, ১১:৩৩ পিএম

ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার আন্দোলনের বহু ধাপ পেরিয়ে একাত্তরে চূড়ান্ত রূপ পায় আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। পঁচিশে মার্চ কালরাতে রাজধানী ঢাকায় ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা ঘটিয়েও বাঙালিকে স্তব্ধ করে দেওয়া যায়নি। ছাব্বিশে মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণায় বাঙালি একাত্তরের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু ছাব্বিশে মার্চ থেকে ষোলই ডিসেম্বরের পরিক্রমাই মুক্তিযুদ্ধের সবটা নয়। আরও দুটো তারিখ বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে অমর হয়ে আছে। প্রথমটা সাতই মার্চ ১৯৭১, দ্বিতীয়টা ১০ জানুয়ারি ১৯৭২। ঐতিহাসিক সাতই মার্চে বঙ্গবন্ধুর বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠেÑ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ উচ্চারিত হওয়ার মধ্য দিয়েই সাত কোটি বাঙালি মুক্তিযুদ্ধের মরণপণ শপথ নিয়েছিল। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সীমাহীন আত্মত্যাগ আর তিরিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে ষোলই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। ‘জয় বাংলা’ সেøাগানে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে বিজয় এলো ঠিকই, কিন্তু বঙ্গবন্ধু তখনো পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। সব হারিয়ে, সব পেয়েও তাই বিজয়ের আনন্দ পূর্ণ হচ্ছিল না। অবশেষে এলো সেই পূর্ণতার দিন, ১০ জানুয়ারি ১৯৭২।  স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারামুক্ত হয়ে বিজয়ীর বেশে দেশে ফিরে এলেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের দুই প্রান্তে তাই সাতই মার্চ আর ১০ জানুয়ারি।  

আজ এমন এক সময়ে আমরা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উদযাপন করতে যাচ্ছি যখন পুরো দেশ প্রস্তুত হচ্ছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ ‘মুজিববর্ষ-২০২০’ উদযাপন করতে। আজ থেকেই শুরু হচ্ছে তার ক্ষণগণনা।  আগামী ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মদিন থেকে আগামী ২৬ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত উদযাপিত হবে ‘মুজিববর্ষ’। আজ তাই বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তিকে স্মরণ করবার দিন।  তার আদর্শকে অনুধাবন করার তার সংগ্রামী চেতনায় জাতি গঠন করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শপথে বলীয়ান হওয়ার দিন। বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংগ্রামকে স্বাধিকারের সংগ্রামে, জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামে রূপান্তরিত করার অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন তিনি। অধিকার সচেতন এক প্রতিবাদী কিশোর থেকে তিলে তিলে নিজেকে গড়ে তুলে, কঠোর ত্যাগ-তিতিক্ষায় আত্মোৎসর্গ করার মধ্য দিয়েই বিশ্বমঞ্চে ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন তিনি। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ছেষট্টির ছয়-দফা আন্দোলন ও ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনীতির মাঠ থেকে শুরু করে রাষ্ট্র ও কারাগারের পাঠ পর্যন্ত সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই শেখ মুজিবুর রহমান ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে উঠেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের আগেই যে বছর বাংলার মানুষ তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ নামে আপন করে নিয়েছিল, সেই বছরই বঙ্গবন্ধু এক বিশাল জনসভায় ‘পূর্ব বাংলার’ নামকরণ করেছিলেন ‘বাংলাদেশ’।

বাংলাদেশের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর বীরোচিত উত্থান যতটা মহাকাব্যিক, তার নির্মম মৃত্যু ততটাই ট্র্যাজিক। একাত্তরের সাতই মার্চে বঙ্গবন্ধুর বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠ যেমন বাংলার লাখো-কোটি মানুষের প্রাণে বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বকে প্রকম্পিত করেছিল; তেমনি পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টে তার নিথর দেহের ভারে বাংলার আকাশ-বাতাস-মাটি-জল যেন শ্রেষ্ঠ সন্তানকে হারানোর শোকে নিষ্ফলা-নির্বাক-নিথর হয়ে পড়েছিল। ইতিহাসের এই কলঙ্কিত অধ্যায়ে সুদীর্ঘ একুশ বছর ধরে বঙ্গবন্ধুর নামকে বাংলাদেশে এক নিষিদ্ধ নামে পরিণত করা হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস পাল্টে ফেলা যায় না, যায়নি। বাংলাদেশের মানুষ বারবার তাদের প্রাণপ্রিয় নেতার রাজনৈতিক চেতনাকে ফিরে পেতে চেয়েছে; মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশকে গড়তে চেয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা এসেছে।  কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশকে শোষণ ও বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক ‘সোনার বাংলা’ হিসেবে গড়ে তোলার সংগ্রাম এখনো চলমান।

কালের পরিক্রমায় অতীত আর ভবিষ্যতের সেতু গড়ার বর্তমান আজ আমাদের ইতিহাসের এক আবর্তনের সম্মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এখানে দাঁড়িয়ে অতীতের শিক্ষা আর ভবিষ্যতের প্রস্তুতির হিসাব মেলাতে হবে আমাদের।  বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে আজ তাই বাংলাদেশ ও গোটা দুনিয়ার কাছে ভবিষ্যতের বঙ্গবন্ধুকে উপস্থাপনের দায়িত্ব আমাদের সামনে। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন ও কীর্তির যথাযথ পাঠ, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তা ও দর্শনকে নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে অনুধাবন করতে পারাটা তাই জরুরি। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষকে ঘিরে যে বিপুল আয়োজন হতে যাচ্ছে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল দল, জাতি বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে সীমিত নন, তিনি দেশ-বিদেশের সব বাঙালির, দুনিয়ার সব শোষিত-নিপীড়িত মানুষের মুক্তির প্রতীক। দুনিয়ার মানুষের মুক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন যে বঙ্গবন্ধু, তাকে স্মরণ করার মহত্তম পথ হবে, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার রাজনৈতিক মতাদর্শকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এই কাজ কেবল বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একার নয়, বাংলাদেশের সব মানুষেরই।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত