সংবিধান লঙ্ঘন করা মানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অসম্মান করা বলে মনে করেন তার ঘনিষ্ঠ সহচর ও সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য ড. কামাল হোসেন। গতকাল শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে গণফোরামের উদ্যোগে ‘বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস-১০ জানুয়ারি ১৯৭২’ শীর্ষক স্মরণ সভায় ‘অকথিত ঘটনাবলীর’ ওপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, জনগণের অধিকারে কোনো ঘাটতি থাকলে বোঝা যাবে বঙ্গবন্ধুর কথা অমান্য করা হচ্ছে। আজকের দিনে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য এত সভা, অনুষ্ঠান হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানানোর উপায় হলো ওনার কথাগুলো ষোলো আনা পালন করা। প্রবীণ এই রাজনীতিক বলেন, সংসদ সার্বভৌম হিসেবে কাজ করতে পারছে কি না, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হচ্ছে কি না, এসবে যদি কোনো ঘাটতি থাকে তাহলে বুঝতে হবে বঙ্গবন্ধুর কথা অমান্য করা হচ্ছে। তিনি বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হতে না দেওয়া মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি অসম্মান করা। দেশে গণতন্ত্র নেই, স্বাধীনতার পরিবর্তে আমরা স্বৈরতন্ত্রকে মেনে নিয়েছি। গণতন্ত্র রক্ষার জন্য মাঝে মাঝে ঝুঁকি নিতে হয়, এবার আমাদের সেই ঝুঁকি নিতে হবে।
বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর লন্ডন ও দিল্লি হয়ে দেশে ফেরেন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। সে সময় তার সঙ্গী ছিলেন তরুণ রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী ড. কামাল হোসেন। গণফোরাম প্রতি বছর দিনটি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করে। ড. কামাল বলেন, বঙ্গবন্ধু যখন দেশে ফিরছিলেন, লন্ডন বিমানবন্দরে তাকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সম্মান জানানো হয়েছিল। ব্রিটেনের পুলিশ বঙ্গবন্ধুকে স্যালুট দিয়ে বলেছিল, ‘আপনার জন্য আমরা প্রার্থনা করেছিলাম।’ তখন বিশ্বব্যাপী বাঙালি শ্রদ্ধা ও সম্মান অর্জন করেছিল। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের কথা স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, এটা একটা বিশেষ দিন। একসঙ্গে আমরা ফিরে এসেছি। আমার জন্য দিনটা আনন্দের। ড. কামাল হোসেন বলেন, আমরা অসাধারণ এক নেতৃত্ব পেয়েছিলাম। সেই নেতৃত্বের কারণেই আমাদের স্বাধীনতা সম্ভব হয়েছিল। বাংলাদেশ যত দিন থাকবে, ওনাকে (বঙ্গবন্ধু) সবাই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুঃখ লাগে, অন্যান্য দেশের জাতির জনক ২০-৩০ বছর সরকার প্রধান হিসেবে থাকেন, আমাদের দুর্ভাগ্য যে ওনাকে খুব কম সময়ের মধ্যে হারিয়েছি। আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো ওনাকে বাঁচিয়ে না রাখতে পারা। বঙ্গবন্ধুকে হারানো দেশের অপূরণীয় ক্ষতি। বঙ্গবন্ধু অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি উল্লেখ করে ড. কামাল বলেন, কোনো অন্যায় দেখলে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। স্বাধীনতা মানে সব জনগণের, কোনো ব্যক্তির না। এখানে স্বৈরতন্ত্র থাকার কোনো অবকাশ নেই। নির্ভেজাল গণতন্ত্র থাকবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বিচারকরা ঝুঁকি নিয়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে লাঞ্ছিত, অপমানিত করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি সত্য বলতে পিছপা হননি। তিনি দেশ ছেড়ে গেছেন। তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়া লজ্জার। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরিত দলিল সংবিধান বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘরে রাখা আছে। প্রত্যেক স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের এই দলিল দেখানো উচিত। এই স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণ যদি গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় তাহলে বঙ্গবন্ধুর কথা অমান্য করা হবে।
সভায় বক্তব্য দেন গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি আবু সাইয়িদ ও সুব্রত চৌধুরী, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোকাব্বির খান, মহসিন রশীদ ও জগলুল হায়দার, যুগ্ম সম্পাদক মোশতাক আহমেদ প্রমুখ।
