জবির সমাবর্তনে আচার্যের আক্ষেপ

উপাচার্যরাই দুর্নীতি করলে কী হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২০, ০২:০১ এএম

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের (ভিসি) বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়ানার অভিযোগ ওঠায় তাদের সতর্ক হতে বলেছেন রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। গতকাল শনিবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে এ প্রসঙ্গটি তোলেন তিনি। 

রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ধূপখোলা মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘উপাচার্যরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আপনাদের সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। আপনারা নিজেরাই যদি অনিয়মকে প্রশ্রয় দেন বা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন, তা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা কী হবে, তা ভেবে দেখবেন।’

জীবনে অনেক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলেও কৃতকার্য হতে নকলের আশ্রয় নেননি বলে জানিয়ে আবদুল হামিদ বলেন, ‘জীবনে অনেক পরীক্ষায় ফেল করেছি, তবে কখনো পাস করার জন্য নকলের মতো অনৈতিক পথ অবলম্বন করিনি। এমনকি পাশের কাউকে জিজ্ঞেসও করিনি। এটা আমার জীবনের অহংকার এবং এটা নিয়ে আমি গর্ববোধ করি।’ এসময় তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘কিন্তু আজ শুনি শিক্ষকরা ছাত্রদের কাছে নকল সাপ্লাই করে। অনেক জায়গায় শোনা যায় অভিভাবকরা নকল সাপ্লাই করে। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে। এদের কী শাস্তি হতে পারে। মনটা চায় আর কইলাম না... বুইযঝা নিয়েন... ।’

পরীক্ষায় নকল প্রবণতা ও অনৈতিক পন্থা অবলম্বনের কারণে দেশ ও জাতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে মন্তব্য করে এর বিরুদ্ধে সবাইকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ‘রাজনীতির কারণে যথাসময়ে ডিগ্রি পাস করতে পারিনি। ১৯৬৯ সালে ডিগ্রি পাস করি। ’৭১ সালে ল’ পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণে তা সম্ভব হয়নি। দেশ স্বাধীনের পর ’৭২ সালে ল’ পরীক্ষার ব্যবস্থা হয়। চার পেপারে পরীক্ষা। তখন সারা দেশের পরীক্ষা হয়েছিল জগন্নাথ কলেজে। আমিও সেই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম।’

আবদুল হামিদ আরও বলেন, ‘পরীক্ষা যখন দিতে গেলাম দেখলাম সবাই মোটা মোটা বই দেখে লিখে যাচ্ছে। বই সামনে ছাড়া খুব কমই দেখেছি। আমি তখন বাংলাদেশের গণপরিষদের সদস্য। ভাবলাম, আমি যদি এই কাজটি করি তাহলে কেমন হয়! মাঝে মাঝে সাংবাদিকরাও আসছে। তারা যদি কিছু লেখে! পরে সিদ্ধান্ত নিলাম, কপালে যা আছে হবে কিন্তু বই দেখব না। যা পারি তাই লিখলাম। ফলাফলে চার সাবজেক্টের মধ্যে দুই সাবজেক্টে পাস করি আর দুই সাবজেক্টে ফেল করি। পরে অবশ্য ১৯৭৪ সালে ভালোভাবে পড়াশোনা করে ল’ পরীক্ষা দিয়ে পাস করি।’

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি যদি তখন নকল করতাম আর পত্রিকায় আসত তাহলে তো আজ তোমরা বলতে, বেটা নকল করে পাস করেছ, এখন বড় বড় কথা বলো।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিদেশিরা এসে আমাদের চাল-চলন দেখে হতাশ হয়। এজন্য সবার প্রতি অনুরোধ, বিষয়টি ভেবে দেখবেন।’

সবাইকে ট্রাফিক আইন মানার আহ্বান জানিয়ে আবদুল হামিদ বলেন, ‘প্রায় সাত বছর ধরে জেলখানার মতোই বঙ্গভবনে আছি। রাস্তায় স্বাধীনভাবে হেঁটে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে টেলিভিশনে দেখি, ওভারপাস আছে অথচ রিস্ক নিয়ে সমানে নিচ দিয়ে মানুষ পারাপার করছে।’

অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়ায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস স্থাপনে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। নতুন ক্যাম্পাস স্থাপনের জন্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সব সমস্যার সমাধান নতুন ক্যাম্পাসে গিয়েই সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। সমাবর্তন বক্তা অধ্যাপক ইমেরিটাস অরুণ কুমার বসাক সব গ্রাজুয়েটকে দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকে কাজ করার আহ্বান জানান।

২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরুর পর প্রথম সমাবর্তন হওয়ায় এবার বিপুলসংখ্যক সাবেক শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেন। ৩৬টি বিভাগ ও দুটি ইনস্টিটিউটের ১৮ হাজার ৩১৭ জন নিবন্ধিত সাবেক শিক্ষার্থীর মধ্যে ১১ হাজার ৮৭৭ জন স্নাতক , ৪ হাজার ৮২৯ জন স্নাতককোত্তর, ১১ জন এমফিল, ৬ জন পিএইচডি এবং ১ হাজার ৫৭৪ জন সান্ধ্যকালীন কোর্সের সনদ নেন। সমাবর্তনে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। সমাবর্তন উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নাটক ও কনসার্টের আয়োজন করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত