বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করা কার দায়িত্ব

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২০, ১০:১৭ পিএম

বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞান বিতরণ করে না, শিক্ষা ও গবেষণার মধ্য দিয়ে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে। এটা উচ্চশিক্ষার এমন প্রতিষ্ঠান যেখানে কেবল শিক্ষার্থীরাই লেখাপড়া করেন না; শিক্ষকদেরও সার্বক্ষণিক লেখাপড়া করে নিজ নিজ বিষয়ে দুনিয়ার সর্বশেষ অগ্রগতি জানতে-বুঝতে হয়। জ্ঞান অন্বেষণ ও জ্ঞানচর্চায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা এবং সে লক্ষ্যে তাদের প্রস্তুত করাই একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি বা বিশেষ অবদানের জন্য নয়, বরং প্রশাসনের দুর্নীতি এবং শিক্ষার মান সংকট নিয়েই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বছরজুড়ে আলোচনায় থাকছে।  বিশ্বজুড়ে সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় দেশের একটিও বিশ্ববিদ্যালয় না থাকা যেমন শিরোনাম হচ্ছে, তেমনি একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের দুর্নীতি ও অনিয়মও নিয়মিতভাবেই সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে। অবস্থা এতটাই বেগতিক যে, এখন খোদ রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের আচার্যই উপাচার্যদের দুর্নীতি নিয়ে কথা বলছেন।  আর মন্ত্রীরা কথা বলছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও শিক্ষার মান নিয়ে।

শনিবার রাজধানীতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য মো. আবদুল হামিদ বলেছেনÑ উপাচার্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাদের সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। তারা নিজেরাই যদি অনিয়মকে প্রশ্রয় দেন বা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন, তা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা কী হবে, তা ভেবে দেখবেন। রাষ্ট্রপতির এই আক্ষেপকে অবশ্যই আমলে নিয়ে ভেবে দেখতে হবে যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কী করে এই পরিস্থিতি বজায় থাকছে।  রাষ্ট্রপতির এমন খোলামেলা বক্তব্য অবশ্যই সাধুবাদ যোগ্য। একইসঙ্গে ভেবে দেখা জরুরি, কী করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের অভিযোগ সত্ত্বেও তারা পদে বহাল থাকছেন? ভেবে দেখা জরুরি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের আনুগত্যের রাজনৈতিক বিবেচনা বন্ধ না হলে এই সংকট কাটিয়ে ওঠার ভিন্ন কোনো উপায় আছে কি?

এদিকে, উপাচার্যদের দুর্নীতি নিয়ে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের দিনই, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক মানের ডক্টর অব ফিলোসফি বা পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়া হচ্ছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক।  একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গত বছর ২৬৫ জনকে পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়ার তথ্য জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পিএইচডি ডিগ্রিধারী কৃষিমন্ত্রী ‘টাকার বিনিময়ে পিএইচডি ডিগ্রি বিক্রি হয়’ বলেও মন্তব্য করেন। গবেষণার মান নিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্য আমলে নিয়ে প্রকৃত অবস্থার অনুসন্ধান জরুরি বটে।  পাশাপাশি দেখা প্রয়োজন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য অনুকূল পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় তহবিল রয়েছে কি না। এ কথা সবাই জানেন যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট বরাদ্দের যৎসামান্যই গবেষণা খাতে বরাদ্দ থাকে। বলা বাহুল্য, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণার মান কেমন হবে তা কেবলই কতিপয় ব্যক্তির সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না, এটা সামগ্রিক শিক্ষানীতির বিষয়।

সর্বশেষ অনুমোদনপ্রাপ্ত দুটি নিয়ে দেশে মোট পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এখন ৫০টি।  অনুমোদিত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ১০০টির ওপরে। উচ্চশিক্ষা বিশারদরা বলেছেনÑ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণার মান বাড়ানোর ওপর জোর না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি একটা বড় সংকট। পাশাপাশি রয়েছে কেবল অবকাঠামো উন্নয়নের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অত্যধিক ঝোঁক। তাদের মতে, দেড় শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করার মতো প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক ও শিক্ষা-প্রশাসকের অভাব রয়েছে দেশে। প্রকৃতঅর্থে, প্রাথমিকভাবে শিক্ষকদের মানই নির্ধারণ করে দেয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান কেমন হবে। শিক্ষকের মানহীনতার অন্যতম কারণ হলো, কম বেতন আর শিক্ষক রাজনীতি। এই দুই মিলিয়ে পুরো ব্যবস্থাটাই লেজে-গোবরে হয়ে গেছে। সংকট কাটাতে সবার আগে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির কঠিন ও যুগোপযোগী নীতিমালা করতে হবে এবং একইসঙ্গে শিক্ষকদের জন্য একটি যুগোপযোগী বেতন স্কেল তৈরি করতে হবে। বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বরাদ্দ বাড়িয়ে শিক্ষা ও গবেষণার মান বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। একইসঙ্গে দেশে আন্তর্জাতিক মানের পোস্ট-গ্রাজুয়েট রিসার্চ ইনস্টিটিউট খুলে দেশ-বিদেশের সেরা স্কলারদের নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে, যা মানসম্মত শিক্ষক ও গবেষক জোগান দেওয়ার বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারে।

সর্বোপরি দুর্নীতি বন্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রকৃত উচ্চশিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিবিড় আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে জ্ঞানচর্চার মুক্ত পরিবেশ ছাড়া ভালো উচ্চশিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এ জন্য শ্রেণিকক্ষের মতো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও মুক্ত পরিসর সমান জরুরি।  এই মুক্ত পরিসর কেবল ভৌত অর্থে স্থান নয়; বরং সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক জ্ঞানতাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পরিসর।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত