দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। চলতি অর্থবছরের ৬ মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমছে। এ অবস্থায় এই খাতের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সরকারকে পাশে দাঁড়াতে হবে বলে মনে করেন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক। দেশ রূপান্তরের স্টাফ রিপোর্টার মামুন আব্দুল্লাহকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে শিল্পের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও করণীয় নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন তিনি
পোশাক খাতের বর্তমান অবস্থা কী?
তৈরি পোশাক দেশের সর্ববৃহৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাত। এ খাতের হাত ধরেই সর্বাধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। কিন্তু বর্তমানে শিল্পটি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কারণে একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। মাসে মাসে কমছে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি। একের পর এক কারখানা বন্ধ হচ্ছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার পরিমাণ বেশি। এই দুর্দশার কারণেই ২০২১ সাল নাগাদ ৫০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না।
তৈরি পোশাকের অবস্থার কারণ কী?
পোশাত খাতের সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে মার্কিন ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা টাকার মান ধরে রেখেছে সরকার। মুদ্রা অবমূল্যায়নের বিষয়ে সরকারকে জোর করে বলতেও পারছি না। এছাড়া প্রতিযোগী দেশগুলোর নানা কারণে সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা সে হারে পারিনি। এছাড়া ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে কারখানার শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। কিন্তু বিশ^ বাজারে তৈরি পোশাকের দাম বাড়েনি। এছাড়া শ্রমিকদের দক্ষতা ঘাটতি ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে দুর্বলতা রয়েছে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাকের বাজার ও পণ্য বহুমুখীকরণের সাফল্য আসছে না। মুষ্টিমেয় কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভর করে ইউরোপ-আমেরিকার পুরনো বাজারে পণ্য রপ্তানি করতে হচ্ছে।
পণ্য বহুমুখীকরণে এই মুহূর্তে কী করণীয়?
এই মুহূর্তে পোশাক খাতের জন্য চার ধরনের ডাইভার্সিফিকেশন (বহুমুখীকরণ) জরুরি। এগুলো হলোÑ পণ্য, প্রক্রিয়া, দক্ষতা ও বাজার। আমাদের কাজ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে মার্কেট নিয়ে যদি বলি, কিছু মার্কেট খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেমন জাপান একটি। আমি শিগগিরই জাপান যাব। ইউনিক্লোর মালিক আমাকে ইনভাইট (আমন্ত্রণ) করেছেন। আমি যাব, আশা করি এটা একটা বিরাট সুযোগ তৈরি হবে।
ইউরোপ-আমেরিকার পর ভালো বাজার কোনটা?
ভালো বাজারের মধ্যে এশিয়া এটি বড় বাজার। ইউরোপ-আমেরিকার পর এটি অবশ্যই বড় মার্কেট। মার্কেট ডাইভার্সিফিকেশনে এই বিষয়টা আমাদের একটু চিন্তা করতে হবে। তিনি বলেন, এখন পণ্য বহুমুখীকরণ নিয়ে বলি। এটা আসলে খুব দরকার। কারণ আমি দেখি সাধারণত পাঁচ ধরনের পণ্য আমরা রপ্তানি করে থাকি। আমরা এখনো অনেক বেশি টি-শার্ট রপ্তানি করছি, কিন্তু সেটা অনেক কম দামে। কারণ আমাদের কারখানাগুলোর ক্যাপাসিটি বেশি। অনেক বড় বড় কারখানা আমাদের রয়েছে। কিন্তু দরকষাকষির জায়গায় আসলে আমরা ক্রেতার কাছ থেকে ওই দামটা পাচ্ছি না। আবার অনেক সময় আমরা নিজেরাই প্রতিযোগিতা করে কম দামে অর্ডার নিচ্ছি। অনেক সময় কারখানার চাকা সচল রাখতে এটা করতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা।
তাহলে মালিকদের দুরদৃষ্টিতার অভাব আছে কি?
আমাদের সামনে যেটা আসছে, সেটা নিয়েই আমরা ভাবছি। কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে তেমন ভাবছি না বা ভাবতে পারছি না। কারণ টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তবে আমাদের দুরদৃষ্টিতা থাকা জরুরি।
মুদ্রা বিনিময় হারের কারণে কি সমস্যা হচ্ছে?
মুদ্রা বিনিময় হার একটা বড় সমস্যা। কিন্তু জোর দিয়ে বলতে পারছি না ডিভ্যালুয়েশনের কথা। সরকার ডলারপ্রতি ৫টি করে টাকা ধরে দিলে আমাদের খাতটি আপাতত টিকে যেত। তাতে মাত্র বছরে ৩ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা সরকারের বাড়তি খরচ হবে।
এই মুহূর্তে সরকারের কাছে কী ধরনের সহায়তা চান?
সরকারের কাছে সবার আগে একটি নীতি সহায়তা চাই। কীভাবে আমরা আরও বড় খাত হতে পারি, সেই নীতিমালা। আর বিশেষ প্রণোদনার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রতি ডলার বিনিময় হারে অতিরিক্ত ৫ টাকা প্রদান, ১ শতাংশ বিশেষ প্রণোদনা পাওয়ার শর্তগুলো রহিত করা এবং প্রণোদনার ওপর ধার্য কর প্রত্যাহার করা। সরকার এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নেবে বলে আশস্ত করা হয়েছে।
আমাদের এক্সিট পলিসি দরকার। অনেক ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তা কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছেন। মেশিন বিক্রি করে তারা শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ করছেন। অন্যদিকে আমরা বলেছি, ইনোভেশন কীভাবে করা যায় সেটার বিষয়ে আমাদেরকে সাহায্য করতে। প্রতিবেশী দেশ ভারত এখাতে ৫০০ কোটি টাকার ফান্ড দিয়ে রেখেছে।
আমেরিকা-চীন যুদ্ধে বাংলাদেশ কী সুবিধা পেল?
চীন আর আমেরিকার যুদ্ধ সম্পর্কেও আমাদের ধারণা ছিল না। এই সময়ে বড় একটা বিজনেস হয়ে গেছে। আমরা সেটা থেকে সুবিধা নিতে পারিনি। আমরা কী করব এটা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই অন্যরা একটা অবস্থায় চলে গেছে। তবে আমি মনে করি এখনো সুযোগ আছে, ওই বাজারটা ধরার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে কিছু রিসার্চ (গবেষণা) করতে হবে।
অনলাইন কেনাবেচায় তৈরি পোশাকের ভবিষ্যৎ কী?
আগামী ৫-১০ বছরে কেনাকাটার ৬০-৭০ শতাংশ চলে যাবে অনলাইনে। কারণ ক্রেতার ধরন বদলেছে। রুচি বদলেছে। অ্যামাজনের মতো অনেক অনলাইন বিজনেস প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে গেছে। যারা মিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিজনেস করছে। তারা আমাদের কাছ থেকে কোনো কোনো পণ্য ৭০০-৮০০ পিস কিনতে চায়। এই ছোট ছোট অর্ডারগুলো বাংলাদেশ কীভাবে সাপ্লাই দেবে, সেটার প্রস্তুতিও নিতে হবে।
