অচলায়তন ভাঙার গল্পে ব্র্যাক

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২০, ০৯:৩৩ পিএম

মুক্তিযুদ্ধে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া দেশে পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করতে ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ, যা এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় এনজিও। দেশ-বিদেশে ব্র্যাকের কর্মকাণ্ডের ব্যাপ্তিও আকাশসমান। ব্র্যাক ও এর প্রতিষ্ঠাতাকে নিয়ে লিখেছেন আবুল কাশেম

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে পুনর্বাসন কার্যক্রমের উদ্দেশ্য নিয়ে স্বাধীনতার পরের বছর প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভেতর থেকে বাংলাদেশকে বদলে দিতে অবিরত কাজ করছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (এনজিও) ব্র্যাক। অতিদারিদ্র্য থেকে মুক্তি, অন্ধকার ঠেলে শিক্ষার আলো জ্বালানো, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও অসহায়দের আইনি সহায়তা দান, কমিউনিটি এম্পাওয়ারমেন্ট, লিঙ্গবৈষম্য দূর করা, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া, নিরাপদ অভিবাসন, দক্ষতা উন্নয়ন, সমন্বিত উন্নয়ন, ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন এবং নগর উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রেখেছে সংস্থাটি। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের আরও ১১টি দেশের দারিদ্র্য দূর করাসহ দেশগুলোর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক জীবন উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে ব্র্যাক, যার জন্ম প্রয়াত স্যার ফজলে হাসান আবেদের হাতে।

১৯৩৬ সালে হবিগঞ্জের বানিয়াচং গ্রামে জন্ম নেন বিশ্ব আলোকিত করা ব্র্যাকের ফজলে হাসান আবেদ। পাবনা জেলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক শিক্ষালাভের পর ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। তরুণ আবেদ উচ্চতর শিক্ষা নিতে পাড়ি দেন স্কটল্যান্ড, সেখানকার ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগো থেকে নেভাল আর্কিটেকচারে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। তখনো বাংলাদেশে জাহাজ নির্মাণ শিল্প শুরু হয়নি। তাই নিজ দেশে ভালো কিছু করার আশায় নেভাল আর্কিটেকচারে পড়া বাদ দিয়ে লন্ডনে ‘চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টস’ বিষয়ে ভর্তি হন। ১৯৬২ সালে তিনি তার প্রফেশনাল কোর্স সম্পন্ন করেন।

শিক্ষাজীবন শেষে শেল অয়েল কোম্পানিতে যোগ দেন। সেখানে কর্মরত থাকাকালে ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। এ সময় তিনি তার বন্ধুদের সঙ্গে ‘হেলপ’ নামের একটি সংগঠন গড়ে তুলে ঘূর্ণিঝড় উপদ্রুত মনপুরা দ্বীপের অধিবাসীদের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। সেখানে তারা ব্যাপক ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হলে ফজলে হাসান আবেদ ইংল্যান্ডে চলে যান। সেখানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায়, তহবিল সংগ্রহ ও জনমত গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সমর্থন আদায়ের জন্য ‘অ্যাকশন বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা করেন। একাত্তর সালের ডিসেম্বর মাসে ফজলে হাসান আবেদ সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তখন ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশিরা নিঃস্ব হয়ে ফিরতে থাকে। এ সময় তিনি তার লন্ডনের ফ্ল্যাট বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে ত্রাণকাজ শুরু করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে

ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চল শাল্লা এলাকায় কাজ শুরু করেন। এই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায়ই তিনি ১৯৭২ সালে ব্র্যাক গড়ে তোলেন। গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে তার দীর্ঘ অভিযাত্রার সূচনা ঘটে। দরিদ্র মানুষ যাতে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে নিজেরাই নিজেদের ভাগ্যনিয়ন্তা হয়ে উঠতে পারে, সেই লক্ষ্যে তিনি তার কর্মসূচি পরিচালনা করেন। শুরুতে ব্র্যাকের পূর্ণ নাম ছিল ‘বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন অ্যাসিসটেন্স কমিটি’ যা পরে ‘বাংলাদেশ রুরাল অ্যাডভান্সমেন্ট কমিটি’ নাম ধারণ করে। চার দশকের মধ্যে তিনি তার অভূতপূর্ব নেতৃত্বের মাধ্যমে কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটান। ব্র্যাক পরিণত হয় বিশ্বের সর্ববৃহৎ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায়। বর্তমানে বিশ্বের ১২টি দেশে ব্র্যাকের লক্ষাধিক কর্মী প্রায় তের কোটি মানুষের জীবনে উন্নয়নে নিরলস কাজ কাজ করে যাচ্ছে।

অতিদারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা জনগোষ্ঠীকে সময়াবদ্ধ প্রশিক্ষণ, গবাদিপশু পালনসহ নানাভাবে সহায়তা দিয়ে আর্থ-সামাজিক মুক্তির পথ দেখিয়ে আসছে ব্র্যাক। বিশ্বব্যাপী ব্র্যাক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়াদের ৭৫ থেকে ৯৮ শতাংশ ১৮ থেকে ৩৬ মাসের মধ্যে অতিদারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশের হাওর, চর ও ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় ব্র্যাকের নেওয়া কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে ৭০ শতাংশ খানা। তাদের ৯৬ শতাংশই অতিদারিদ্র্যসীমা পার করেছে এবং ৫০ শতাংশ পরিবার আয় উৎসারী কর্মকা-ে সম্পৃক্ত রয়েছে।

দেশজুড়ে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের মধ্য দিয়েও দারিদ্র্য দূর করার কাজ করেছে ব্র্যাক। ৫৬ লাখ ঋণগ্রহীতাকে ঋণ দিয়েছে সংস্থাটি। এর মধ্যে ৮৭ শতাংশই নারী। ব্র্যাকের ক্ষুদ্রঋণ নেওয়া ৫৬ লাখের মধ্যে ২৩ হাজার প্রতিবন্ধী রয়েছেন।

বাংলাদেশে প্রতি ৫ জনের ২ জনেরই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নেই। তাদের দক্ষতা উন্নয়নে দেশজুড়ে কর্মসূচি রয়েছে সংস্থাটির। ৮৪ হাজার ৫৮১ জনকে দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এদের মধ্যে ৫০ শতাংশ স্নাতক সম্পন্ন করার জন্য নিরাপদ চাকরি পেয়েছেন। প্রশিক্ষণ নেওয়াদের মধ্যে ৫০ শতাংশই নারী।

নিরাপদ অভিবাসন নিয়েও কাজ করে ব্র্যাক। এ কর্মসূচির আওতায় সংস্থাটি ২০০৬ সাল থেকে ৩৩ জেলার ৩৫ লাখ অভিবাসী বা অভিবাসন প্রত্যাশীকে সহায়তা করেছে। সামাজিক সালিশের মাধ্যমে ব্র্যাক অভিবাসীদের জন্য ৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা আদায় করে দিয়েছে। ৯ লাখ ৩৭ হাজার সম্ভাব্য অভিবাসীকে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে সংস্থাটি।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করার উপায় শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সহায়তা দিচ্ছে ব্র্যাক। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বিষয়ে দেশের ৪১টি জেলার ৮ লাখ ২৩ হাজার ৩৪২ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, ৩ লাখ ৩৬ হাজার পরিবার নিয়েছে ‘ইন্টিগ্রেডেট ক্লাইমেট-রিসিলেনপ সলিউশনস’ সুবিধা।

ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, সাইক্লোনসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে অনেক মানুষ। এরই মধ্যে সামরিক বাহিনীর নির্যাতনে মিয়ানমার থেকেও সাত লাখের বেশি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। তাদের মধ্যে মানবিক সহায়তা বিতরণে কাজ করছে ব্র্যাক। দেশের যেকোনো প্রান্তে ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মানবিক সহায়তা নিয়ে পৌঁছে যাওয়ার সক্ষমতা রয়েছে ব্র্যাকের।

কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায়ও কাজ করছে সংস্থাটি। ৪ লাখ ৪৪ হাজার কৃষককে এ বিষয়ে সেবা দিয়েছে সংস্থাটি। ‘পুষ্টি বাগান’ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ৫৬ হাজার ৬০০ নারীর দক্ষতা উন্নয়ন ঘটিয়েছে ব্র্যাক।

লিঙ্গভেদে বিচার-বৈষম্য দূর করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে ব্র্যাক। ২০১৮ সালে দেশের ৭ জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতনবিরোধী সচেতনতা প্রতিষ্ঠা ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ বিষয়ে ১৮ লাখ ৪৫ হাজার মানুষকে সচেতন করেছে। দেশের ৯৪ উপজেলায় ৯১ হাজার ২৮৬ জন কিশোরীকে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, প্রজনন ও যৌন স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন করা হয়েছে। ২০১৮ সালে ‘খারাপ ছোঁয়া’ ও ‘ভালো ছোঁয়া’ সম্পর্কে ৯১৪টি স্কুলের ২৩ হাজার ১৯ প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে সচেতন করা হয়েছে।

কমিউনিটি এম্পাওয়ারমেন্ট কর্মসূচির আওতায় ১২ লাখ দরিদ্র মানুষকে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় নেওয়া হয়েছে। ২০০২ সাল থেকে ব্র্যাকের পল্লী সমাজভুক্ত ৯ হাজারেরও বেশি প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেয়, যাদের মধ্যে ২ হাজার ৯০৩ জন জয়লাভ করে। যৌতুক, গৃহবিবাদের ২ লাখ ৮০ হাজার ঘটনা প্রতিরোধ করেছে সংস্থাটি।

মানবাধিকার ও আইনি সহায়তা সেবার আওতায় ব্র্যাক ৬৪ হাজার ৪১০টি মামলার বিপরীতে ১ লাখ ৯২ হাজার ৭৮২ নারীর পাশে থেকেছে। এ সময় নারীদের পক্ষে ৩ কোটি ৩১ লাখ ডলার আদায় করেছে ব্র্যাক। মানবাধিকার ও আইনি শিক্ষা বিষয়ে ৪২ লাখ ৪ হাজার ২৭৬ জন শিক্ষা নিয়েছে। ৬৯ লাখ ৬৪ হাজার ৪৬৪ শতাংশ জমি মাপ দিয়েছে ব্র্যাক। এর মধ্য থেকে অতিদরিদ্রদের জন্য ৬ হাজার ৭৮৬ খাসজমি বের করা হয়েছে।

পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্য বিষয়েও ব্র্যাকের ভূমিকা অপরিসীম। সংস্থাটির সার্ভিস ডেলিভারি কর্মসূচির আওতায় ১২ কোটি মানুষ সেবা পেয়েছে। ২০ লাখ কিশোরী ও গর্ভবতী নারীকে কাউন্সেলিং করা হয়েছে।

ব্র্যাকের শিক্ষা কর্মসূচির আওতায় বিশ্বজুড়ে ১ কোটি ২০ লাখ শিশু শিক্ষালাভ করেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্কুলে এখন ১৮ লাখ শিশু শিক্ষালাভ করছে। কিশোর ক্লাব, মোবাইল লাইব্রেরি ও মাল্টিপারপাস লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে সম্পৃক্ত থেকে ১৪ লাখ কিশোর-কিশোরী শিক্ষা নিচ্ছে।

১৯৮১ সালে ফজলে হাসান আবেদ ‘হার্ভার্ড ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট’ এর ভিজিটিং স্কলার হন। পরের বছর তিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস) এর বোর্ড অব ট্রাস্টিজ-এর সদস্য হন। ওই সময় তিনি ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ডেভেলপমেন্ট এজেন্সিস ইন বাংলাদেশ’-এর চেয়ারম্যান পদও অলংকৃৃত করেন।

ব্র্যাকের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে ফজলে হাসান আবেদের। বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে থাকেন তিনি। ১৯৮৬ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বিশ্বব্যাংকের এনজিও কমিটির সদস্য হন। পরের বছর যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন হেলথ রিসার্চ ফর ডেভেলপমেন্ট’-এর সদস্য হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। ১৯৯০ সালে ‘ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশন’ নামের একটি শিক্ষাবিষয়ক এনজিও তাকে ‘চেয়ারম্যান’ উপাধি দেয়। তার দুই বছরের মাথায় ফজলে হাসান ‘এনজিও ফোরাম ফর ড্রিংকিং ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যানিটেশন’-এর চেয়ারম্যান এবং ‘ইন্ডিপেনডেন্ট সাউথ এশিয়ান কমিশন অন পোভার্টি অ্যালিভিয়েশন’-এর বোর্ড মেম্বার নিযুক্ত হন। ১৯৯৩ সালে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চেয়ারপারসন হন তিনি। পরের বছর সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির ট্রাস্টি হন।

১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মানবতাবাদী প্রাণ ফজলে হাসান আবেদ ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের ‘পলিসি অ্যাডভাইসরি গ্রুপ’-এর সদস্য এবং সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত ‘ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’-এর বোর্ড অব গভর্নরস হন তিনি। তিনি একই সঙ্গে ব্র্যাকের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান, জাতিসংঘের ‘লিগ্যাল ইম্পাওয়ারমেন্ট অব দ্য পুওর’ কমিশনের কমিশনারের দায়িত্বও পালন করেন। ২০১০ সালে এই বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব জাতিসংঘ মহাসচিবের স্বল্পোন্নত দেশের বিখ্যাত ব্যক্তিদের গ্রুপের অংশীদার হন। দুই বছর পর তিনি জাতিসংঘ মহাসচিবের পুষ্টি উন্নয়ন বিষয়ক কর্মসূচিতে মূল গ্রুপের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আবেদ। পরে ২০১৩ সালে আবারও ব্যাংকটির চেয়ারপারসন হন তিনি। গত ২৬ আগস্ট ব্যাংকটির চেয়ারপারসনের পদ ছেড়ে দেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। তার আগে গত ৭ আগস্ট ফজলে হাসান আবেদ ব্র্যাকের চেয়ারপারসনের পদ থেকে অব্যাহতি নেন।

অনেক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত আবেদ ১৯৮০ সালে ‘র‌্যামন ম্যাগসেসে’ পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯২ সালে ইউনিসেফ মাউরাইস পেট অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করে তাকে। মানবজীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০০১ সালে ‘ওলওফ পাম প্রাইজ’ পান তিনি। ২০০৪ সালে জাতিসংঘ থেকে ‘মাহবুব উল হক’ পদক পান তিনি। ২০০৪ সালে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেইটস ফাউন্ডেশন পদক পান আবেদ। ২০০৭ সালে নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ‘হেনরি আর ক্যারভিস’ পুরস্কার পান। প্রায় একই সময়ে তিনি ক্লিনটন গ্লোবাল সিটিজেন অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হন। ২০০৮ সালে ‘ডেভিড রকফেলার ব্রিজিং লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ পান। ২০১০ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করে। তিনি ‘এন্টারপ্রেনার ফর দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাওয়ার্ড’, লিও টলস্টয় ইন্টারন্যাশনাল গোল্ড মেডেল’, ‘স্পেনিস অর্ডার অব সিভিল মেরিট’ পদকে ভূষিত হন।

দয়ালু স্যার ফজলে হাসান আবেদ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার, ইয়েল ইউনিভার্সিটি, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিসহ খ্যাতনামা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানজনক ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।

ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ সম্পর্কে গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে খুব কম মানুষই আছেন, যিনি জীবনে কোনো না কোনোভাবে আবেদের কর্মকা-ের সুফল ভোগ করেননি। আর তিনি যদি হন বিশাল গ্রামবাংলার দরিদ্রদের একজন, মহিলাদের একজন, তাহলে তো তাকে জীবনের প্রতি পদক্ষেপে আবেদের সাক্ষাৎ পেতে হয়েছেন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রোজগার, আত্মোপলব্ধি, আরও অনেক কিছুতে। আবেদ বাংলাদেশের গরিব মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির অসাধারণ কারিগর। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আর্থিক দৈন্যের মুক্তিদাতা।

ব্র্যাক গ্লোবাল বোর্ডের চেয়ার আমীরা হক বলেন, ফজলে হাসান আবেদ এমনভাবে ব্র্যাককে গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছেন যাতে তা কখনোই ব্যক্তিনির্ভর কোনো প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকেনি। বরং বহু মানুষের সমন্বিত শক্তিই ব্র্যাকের মূল চালিকাশক্তি হয়ে থেকেছে।

তিনি বিশ্বাস করতেন, ব্র্যাকের নিবেদিত কর্মীদল তার স্বপ্নের সেই পৃথিবী গড়ে তুলবে, যেখানে সব মানুষ তার সম্ভাবনা বিকাশের সমান সুযোগ পাবে। যে মূল্যবোধ তিনি আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত করেছেন, তা আমাদের জন্য ভবিষ্যতের পথনির্দেশক হয়ে থাকবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত