গরিবের বন্ধু খাজা ইউনুস আলী হাসপাতাল

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২০, ০১:৪৫ এএম

সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে গড়ে ওঠা ‘খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল’- দেশের অন্যতম বৃহৎ বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র। বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই চিকিৎসা কেন্দ্রটির অন্যতম প্রধান একটি বিভাগ ‘ক্যানসার সেন্টার’। বাণিজ্যিক চিন্তাধারার বাইরে গিয়ে প্রত্যন্ত এলাকায় মানুষের দোরগোড়ায় স্বল্পমূল্যে সর্বাধুনিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়াই এই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য। আশপাশের অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীরা আসছেন এখানে। স্বল্পমূল্যে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা পাচ্ছেন।  
প্রতিষ্ঠানটিতে গবেষণার সুযোগ থাকায় প্রতি বছরই ক্যানসার চিকিৎসার সর্বোচ্চ ডিগ্রি এমফিল ও এমডি অর্জন করে প্রত্যন্ত এলাকায় এই রোগের চিকিৎসা কর্মকা-ে যুক্ত হচ্ছেন নতুন নতুন চিকিৎসক। 
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ সর্বাধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের এই মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালটি ঢাকা থেকে ১৪৭ কিলোমিটার দূরে সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার প্রত্যন্ত এনায়েতপুর গ্রামের যমুনা নদীর তীরে প্রাকৃতিক নৈসর্গিক সৌন্দর্য ম-িত মনোরম পরিবেশে অবস্থিত। জেলা শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার ও বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু থেকে প্রায় সাড়ে ২২ কিলোমিটার দক্ষিণে এর অবস্থান। ১৯৯৫ সালের ১৬ নভেম্বর এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও  ২০০৪ সালের ৪ মে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু হয়। সেই থেকে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে রাতদিন নিরলসভাবে এ অঞ্চলের হাজার হাজার সুবিধাবঞ্চিত অসহায় মানুষের চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। 
মানব সেবার মহান ব্রত নিয়ে এ উপমহাদেশের প্রখ্যাত ধর্মীয় কামেল সাধক ওলি শাহ সুফি হযরত খাজা ইউনুস আলী এনায়েতপুরী (রহ.)-এর মেয়ের জামাই এবং এনায়েতপুর গ্রামের সম্ভ্রান্ত ও ধনাঢ্য আলহাজ মোসলেম উদ্দিনের ছেলে শিল্পপতি শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক ও ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের সাবেক এমডি ডা. এম এম আমজাদ হোসেন প্রায় দেড়শ একর জমির ওপর হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেন। সবাই যখন শহরমুখী বাণিজ্যিক ভাবনায় নিমজ্জিত, ঠিক সেই সময় তিনি এ অঞ্চলের রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হলেন। নিজ অর্থ ব্যয়ে এ অঞ্চলের শিক্ষা ও চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষকে অল্প খরচে জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসাসেবা দিতে বিদেশের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে এই অজ পাড়াগাঁয়ে ছুটে এসে গড়ে তুললেন সর্বাধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের এ হাসপাতাল। শুরু করলেন ক্যানসার ও ওপেন হার্ট সার্জারির মতো ব্যয়বহুল জটিল ও কঠিন চিকিৎসা। যা অল্প সময়ের মধ্যেই এ অঞ্চল ছাড়িয়ে দেশব্যাপী এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। এখন বিদেশমুখী রোগীরাও আসছেন চিকিৎসা নিতে। 

হাসপাতালের বৈশিষ্ট্য : ট্রাস্টি বোর্ড পরিচালিত খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে সব ধরনের চিকিৎসায় অনন্য। এ হাসপাতালটি চলে একঝাঁক দক্ষ ও অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে। এ ছাড়া হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ওপেন হার্ট সার্জারি ও ক্যানসার চিকিৎসায় এ উপমহাদেশের মধ্যে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে। এ হাসপাতালটিতে আধুনিক মানের ৫৮৬টি বেড রয়েছে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত আইসিইউ, সিসিইউ, এনআইসিইউ, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন ২১টি অপারেশন থিয়েটার ও রোগ নির্ণয়ের প্যাথলজিক্যাল ল্যাব রয়েছে। এখানে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ১১০০ রোগী চিকিৎসা নিয়ে থাকে। এটি শুধু দেশেরই নয়, দেশের বাইরে থেকে আসা বিদেশি রোগীদের কাছেও বেশ আস্থা অর্জন করেছে। বাংলাদেশে কর্মরত রাশিয়া, জাপান, কোরিয়াসহ বহু দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এখানে নিয়মিত চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। এ ছাড়া এ হাসপাতালের প্রসূতি, গাইনি, শিশু ও চক্ষু চিকিৎসায় এ হাসপাতালটি অনন্য। প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্ভুল পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা রোগীদের সঠিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। 


এখানে হার্ট ও ক্যানসারের চিকিৎসায় দেশের অন্যান্য হাসপাতালের তুলনায় ৬০ ভাগ খরচ কম। ফলে পাবনা-সিরাজগঞ্জ জেলাসহ উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলার হতদরিদ্র মানুষ, এমনকি সারা দেশের স্বল্প আয়ের মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রতিনিয়ত রোগী আসছেন এখানে। 
ক্যানসারের ডাক্তার তৈরি করছে এই মেডিকেল কলেজ : মেডিকেল কলেজে প্রতি ব্যাচে ১০০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়ে থাকে। এখানে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে কোনো রকম ডোনেশন লাগে না। সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। বর্তমানে ১৬তম ব্যাচের ভর্তি শেষ হয়েছে। এখানে শুধু এমবিবিএসই নয় দেশের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ক্যানসার চিকিৎসার উচ্চতর শিক্ষা ও ডিগ্রি প্রদানসহ এমফিল ও এমডি ডিগ্রি প্রদান করা হয়। এ ছাড়া এখান থেকে প্রতি বছর ২০ জন ডেন্টাল বিশেষজ্ঞ (বিডিএস) কোর্স নিয়ে থাকেন। এ ছাড়া এ মেডিকেল কলেজে শতভাগ আবাসিক সুবিধাসহ শিক্ষর্থীদের বিশাল খেলার মাঠ, পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতিসহ প্রাকট্রিক্যাল ল্যাব ও বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে।
কী সেবা পান রোগীরা : এ হাসপাতালে গরিব ও হতদরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা খরচের ১৫ শতাংশ বিনামূল্যে দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব রোগীর বেড ভাড়া ও ওষুধ খরচ ফ্রি করে দেওয়া হয়। রোগীর সঙ্গে আসা স্বজনদের সুলভ খরচে থাকা ও খাওয়ার সু-ব্যবস্থা আছে। এ হাসপাতালের নিজস্ব একাধিক লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স আছে, যা রোগীদের সেবায় সার্বক্ষণিক কাজ করছে। এ ছাড়া এখানে একটি বিশুদ্ধ ব্লাড ব্যাংক রয়েছে। যে কোনো ধরনের জরুরি রক্তের প্রয়োজনীয় চাহিদা এখান থেকে মেটানো হয়ে থাকে। যে কোনো গ্রুপের রক্তের জন্য রোগীর স্বজনদের ভাবতে হয় না।  


সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হাসপাতালটিতে আরও রয়েছে কঠোর সিকিউরিটি ব্যবস্থা, সার্বক্ষণিক নিজস্ব বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ, বড় বড় করিডর, প্রশস্ত দরজা জানালা, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, দৃষ্টিনন্দন ফুলবাগান, রোগী ও স্বজনদের বসার সু-ব্যবস্থা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ওয়াশরুম। এ ছাড়া রোগীদের সেবার জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত নার্স, আয়াসহ অন্যান্য কর্মচারী। রয়েছে সুলভ মূল্যের ফার্মেসি। 


ভবিষ্যতে এ হাসপাতালটিকে আরও উন্নত ও আধুনিক মানের করার বৃহৎ পরিকল্পনা ট্রাস্টি বোর্ডের আছে। এ ছাড়া এর বেড সংখ্যা আরও ২২০ থেকে ৩০০টি বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে।
রোগীর জন্য উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা : এ হাসপাতালে রোগীদের যাতায়াতের জন্য উন্নত রেল, সড়ক ও নৌ সুবিধা রয়েছে। দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে এ তিন মাধ্যমে যাতায়াত করা যায়। রেলপথে এলে সিরাজগঞ্জের কড্ডা এম মনসুর আলী 
অথবা সয়দাবাদের বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম রেলস্টেশনে নামতে হয়। সড়কপথে কড্ডার মোড় অথবা সয়দাবাদ বাসস্ট্যান্ডে নামতে হয়। এরপর সেখান থেকে বাসে অথবা সিএনজিতে হাসপাতালে পৌঁছাতে হয়। স্বল্প খরচে নৌপথে ট্রলার অথবা ইঞ্জিনচালিত শ্যালো নৌকায় হাসপাতাল ঘাটে এসে নামা যায়। জরুরি ও মুমূর্ষু রোগীরা সরাসরি সড়কপথে মাইক্রোবাস, সিএনজি বা অ্যাাম্বুলেন্সে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের গেটে চলে আসতে পারেন।


শিক্ষা ও চিকিৎসা : মেডিসিন, সার্জারি, স্ত্রী ও প্রসূতি, শিশু ও নবজাতক, চর্ম ও যৌন, কার্ডিওলজি, নেফ্রোলজি, গ্যাস্ট্রো-এন্ট্রোলজি, নিউরোলজি, ইউরোলজি, ক্যানসার সেন্টার, মেডিকেল অনকোলজি,  রেডিয়েশন অনকোলজি, সার্জিকেল অনকোলজি,প্যালিয়েটিভ অ্যান্ড টারমিনাল কেয়ার, মেডিসিন, চক্ষু, নাক-কান-গলা, অর্থপেডিকস্, দ-, রিউমেটোলজি, রেসপিরেটরি মেডিসিন, কার্ডিওথোরাসিক সার্জারি, ডায়ালাইসিস, আই.সি.ইউ, ইমার্জেন্সি, সি.সি.ইউ, প্যাথলজি, এন.আই.সি.ইউ, এনেস্থেসিওলজি ও ফিজিওথেরাপি বিষয়ে চিকিৎসা ও শিক্ষা দেওয়া হয়। 
এখানে আরও আছে : খাজা ইউনুস আলী বিশ^বিদ্যালয়, নার্সিং ইনস্টিটিউট, পাবলিক স্কুল, ব্যাংকিং সুবিধা, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, রোগীর আত্মীয়-স্বজনদের জন্য ৪০০ বেড বিশিষ্ট গেস্ট হাউস, নিজস্ব  পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, গ্যাস সুবিধা ও বর্জ্য পদার্থ ধ্বংস করার জন্য ইনসিনেরটরের ব্যবস্থাও আছে। 

লেখক :  অধ্যক্ষ ও বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি বিভাগ, খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত