খুব ছোটবেলায় বিশ্বের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক দশ বারটি জিনিসের নাম আমাদের শেখানো হতো। তার মধ্যে মিসরের পিরামিডের নাম সব সময় অত্যাশ্চর্যের তালিকায় সর্বপ্রথমে রাখা হতো। এটি একটি অসাধারণ স্থাপত্যকর্ম, মৃত রাজাদের সমাধিস্থল। অনেক সময় তাজমহলকেও এ তালিকায় রাখা হতো। এটিও সূক্ষ্ম, নিখুঁত ও অতীব সুন্দর শিল্পমণ্ডিত এক স্থাপত্যকর্ম। মুঘল সম্রাট শাহজাহানের স্ত্রী মমতাজ বেগমের স্মৃতিসৌধ। কেউ ভাবতে পারেন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এ সংক্রান্ত আলোচনায় আমাদের জাতীয় সংসদ ভবনের স্থান কোথায়?
আমার মতে, অতিপ্রাচীন পিরামিড থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত নির্মিত সব স্থাপত্যকর্মের গুণগত মান হিসেবে একটা তালিকা তৈরি করলে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় নির্মিত জাতীয় সংসদ ভবন এ তালিকায় প্রথম একশটির মধ্যে একটি হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন স্থাপত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ১০০ স্থাপত্যকর্মের একটি। জগদ্বিখ্যাত স্থপতি লুই আই কান যত কাজ করেছেন তার মধ্যে এটা সর্ববৃহৎ এবং বিশ্বের স্থাপত্যের ইতিহাসে তার এই কাজের প্রতিক্রিয়াই সবচেয়ে বেশি। স্থাপত্যকর্ম অনেক সময় কোনো শহর বা স্থানের আইকনিক ইমেজ বা প্রতীকে পরিণত হয়। আইফেল টাওয়ার দেখলেই আপনার প্যারিস ও ফ্রান্সের কথা মনে হবে। বিগ বেন বা ওয়েস্ট মিনস্টার অ্যাবি দেখলে আপনার লন্ডন বা ইংল্যান্ডের কথা মনে হবে। একসময় এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং দেখলে নিউ ইয়র্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের কথা মনে হতো।
একইভাবে জাতীয় সংসদ ভবন ঢাকা তথা বাংলাদেশের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও সর্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবেও ভাবা যেতে পারে সংসদ ভবনকে। পাকিস্তান আমলে যখন ঢাকায় দ্বিতীয় রাজধানী করার সিদ্ধান্ত হয়, তখন সবার মনে আসে একজন যোগ্য স্থপতি নিয়োগের কথা। তৎকালীন গণপূর্ত বিভাগ বা পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট তিনজন শ্রেষ্ঠ স্থপতির তালিকা তৈরি করেন। তারা হচ্ছেন ফ্রান্সের লে করবুশিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের লুই ইসাডোর কান ও ফিনল্যান্ডের আলভার আলতো। করবুশিয়ের ভারতের চন্ডিগড় শহর ডিজাইন করেন। তার সেই অভিজ্ঞতা নানা কারণে পুরোপুরি সন্তোষজনক হয়নি। আলতো বার্ধ্যক্যজনিত কারণে এই প্রজেক্টের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখাননি। কিন্তু লুই আই কানের সব সময় একটা শহরের মধ্যে শহর অথবা একটা শহরের অংশ যা একটা শহরের জটিলতা ও গুণাগুণ সম্পন্ন এমন কিছু ডিজাইন করার স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন পূরণের এবং তাতে ডিজাইনের উৎকর্ষ সাধনের চেষ্টা চালানোর জন্য তিনি এ কাজে খুবই উৎসাহ দেখান ও মনেপ্রাণে লেগে পড়েন। বাংলাদেশের পথিকৃৎ স্থপতি মাজহারুল ইসলামের লুই আই কান-কে এদেশে নিয়ে আসার ব্যাপারে একটা জোরালো ভূমিকা ছিল।
অতিপ্রাচীন পিরামিড থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত নির্মিত সব স্থাপত্যকর্মের গুণগত মান হিসেবে একটা তালিকা তৈরি করলে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় নির্মিত জাতীয় সংসদ ভবন এ তালিকায় প্রথম একশটির মধ্যে একটি হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন স্থাপত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ১০০ স্থাপত্যকর্মের একটি। জগদ্বিখ্যাত স্থপতি লুই আই কান যত কাজ করেছেন তার মধ্যে এটা সর্ববৃহৎ এবং বিশ্বের স্থাপত্যের ইতিহাসে তার এই কাজের প্রতিক্রিয়াই সবচেয়ে বেশি।
১৯৬২ সালে লুই আই কান একাই কোনোরকম শর্ত বা ফিস ছাড়াই একটা প্রিলিমিনারি মডেল উপস্থাপন করেন। তার কাজ ও কথাবার্তার মধ্যে একটা নিবেদিত মনের পরিচয় পেয়ে তার সঙ্গে কাজের দলিলপত্র স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৬৩ সালে লুই আই কান সংসদ ভবনের ডিজাইনের কাজ শুরু করেন। দ্বিতীয় রাজধানীর জন্য একদম ক্যান্টনমেন্টের গা ঘেঁষে ৪৮০ একর জায়গা হুকুমদখল করা হয়। অনেকে বলেন নিরাপত্তা ও আক্রমণের বিরুদ্ধে সুরক্ষার জন্যই জায়গাটা পছন্দ করা হয়। লুই আই কানকে যে প্রোগাম দেওয়া হয় তাতে অনেক কয়টা ভবনের কথা ছিল যেমন ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি, সুপ্রিম কোর্ট, জনপ্রতিনিধিদের থাকার জায়গা ও বিভিন্ন সুবিধাদি, প্রেসিডেন্ট প্যালেস, স্টেডিয়াম, জিমনেশিয়াম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাজার, চিত্তবিনোদনের স্থান ইত্যাদি। মোট কথা এলিট ও বুরোক্রেটদের জন্য অপর ছোট শহর। পরে অবশ্য অনেক পরিবর্তন করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট এখানে থাকতে চায়নি, মসজিদকে আলাদা না করে অ্যাসেম্বলি ভবনের অংশ হিসেবে করা হয়। এ কাজটাও স্থপতি খুব সাফল্যের সঙ্গে করেন। প্রধান ভবনটি উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম হলেও তিনি মসজিদ এলাকা কেবলামুখী করে স্থাপন করেন। এর ফলে সংসদ ভবনের পরিপূর্ণ কর্মটা অনেক বেশি সাবলীল হয়।
লুই আই কান যখন কাজ শুরু করেন তখন পাকিস্তান ক্রমেই একটা উগ্র ধর্মান্ধতার দিকে ঝুঁকছিল। সব স্থাপনা বা নির্মাণ কর্মকাণ্ডে তথাকথিত ধর্মীয় মোটিফের ব্যবহার আবশ্যকীয় মনে করা হচ্ছিল। যথেষ্ট ইসলামিক প্রতীকের না হওয়ার কারণে লুই আই কান ইসলামাবাদে কোনো স্থাপনা ডিজাইনের বা কাজ করার সুযোগ পাননি। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে স্থাপত্য দেশ ও সমাজের মতাদর্শ ও ব্যবহারিক ভাবধারার প্রকাশস্থল। উল্লেখ্য যে লুই আই কানকে এরকম কোনোভাবে প্রভাবিত করা হয়নি। তিনি কোনো দেশীয় মোটিফ বা ধারা অনুসরণের চেষ্টা করেননি। তিনি কোনো বিদেশি ফর্মও গ্রহণ করার প্রয়াসী হননি। লুই কান স্থপতির চাইতে বেশি ছিলেন দার্শনিক। তার স্থাপত্যের মূল ছিল ফর্ম, স্পেস ও আলো। তিনি তার অনবদ্য সৃজনশীল ফর্ম দিয়ে গণতন্ত্র ও ন্যায়ের শাসনকে আধ্যাত্মিক বা দার্শনিকভাবে প্রকাশ করতে চেয়েছেন ও সফলভাবে তা প্রকাশ করতে পেরেছেন। স্পেসের বেলায় তিনি সুন্দর সুশৃঙ্খল আয়তন তৈরি করেছেন। কোনো রুম বিশেষ একটি কাজের বিবেচনায় তৈরি হয়নি; একমাত্র অ্যাসেম্বলি স্পেস ছাড়া। অফিস রুম কেবলমাত্র অফিস হিসেবে ব্যবহারের জন্য বা খাওয়ার জায়গা কেবল খানাপিনার জন্যই ডিজাইন করা হয়নি। অর্থাৎ ফর্ম কর্মকা ঘটার স্থান হিসেবে বা ফাংশনকে অনুসরণ করে তৈরি করা হয়নি বরং তিনি মূল স্পেস ও তার সঙ্গে সহকারী বা সেবক স্পেস হিসেবে সাজিয়েছেন। অ্যাসেম্বলি হলটা হচ্ছে সর্বপ্রধান স্পেস; আর বাকিটা এই কাজটির প্রাধান্য পাওয়া ও সুষ্ঠু বিকাশের জন্য বিদ্যমান। অ্যাসেম্বলি হলের কাজটি প্রায় আধ্যাত্মিক; দেশের সবচেয়ে মূল্যবান জরুরি কাজ। আইন প্রণয়নের জন্য এক পবিত্র ও মহান স্পেসের প্রয়োজন যা লুই আই কান তার এই ভবনে সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। স্পেসের আকার ও অবয়ব ছাড়া তিনি এই স্পেসের চারপাশে প্রদক্ষিণ পথ তৈরি করেছেন একটা পবিত্রতার ভাব আনয়নের জন্য। এই প্রদক্ষিণ পথেও তিনি ছাদ থেকে আলো আসার ব্যবস্থা করেছেন। তাছাড়া অ্যাসেম্বলি হলে ছাদ থেকে আলো আসার বা আলোর ফোয়ারা বইয়ে দেওয়ার জন্য একটা ছাতার মতো আচ্ছাদন ব্যবহার করেছেন এবং বাইরে সবার ওপরে একটা বহুভুজ প্রতিফলক ব্যবহার করেছেন। এটি আয়না ছাড়াই প্রতিফলিত আলো প্রধান স্পেসে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
এই ভবন ডিজাইন হওয়ার সময় ১৯৬৩/৬৪ সালে অবজার্ভার পত্রিকার মালিক হামিদুল হক চৌধুরী পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। এ ভবন যখন শেষ হওয়ার দিকে, তিনি তখন তার পত্রিকায় একটা চিঠি লেখেন। তাতে তিনি বলেন যে, তিনি যখন প্রজেক্টটা দেখেছিলেন তখন এর ওপর একটা ডোম বা গম্বুজ ছিল। তিনি জানতে চান সেটা গেল কোথায়। অর্থাৎ তিনি আলো আসার মুকুটের মতো ব্যবস্থাটাকে গম্বুজ ভেবে ইসলামিক হয়েছে ভেবে সন্তুষ্ট ছিলেন। এখন সেটা না দেখে অবাক হচ্ছেন। অ্যাসেম্বলি হলে অনেক সময় জোর তর্ক-বিতর্ক হয়, এমনকি মারামারি হাতাহাতি হতেও দেখা গেছে। বস্তুত পূর্ব পাকিস্তান অ্যাসেম্বলিতে খুনাখুনিও হয়েছে। কিন্তু এই ভবনের অ্যাসেম্বলি হলে একটা শান্ত ও স্নিগ্ধ ও ধৈর্যশীলতার ভাব সব সময় লক্ষ করা যায়। আমার মনে হয়ে স্থপতি তার সৃষ্ট স্পেসে একটা বিশেষ ভাব বা মহত্ত্বের প্রভাব তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এ ভবনে একটা অসাধারণ মনুমেন্টালিটির ভাব বিদ্যমান। এই জন্যই এই ভবনকে সবাই শ্রদ্ধার চোখে দেখে।
বাংলাদেশ এ ভবন উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। স্বাধীনতার পর এ ভবন হুবহু আগের মতো না করে অনেক পরিবর্তন করা ও ব্যয় সংকোচ করার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ তা করেনি। হুবহু আগের মতো করেই শেষ করেছে। এটা আমাদের জন্য এক অতি প্রশংসনীয় অর্জন। এই ভবনের মহত্ত্বের দিকটা মূল্যায়ন করতে পারা এবং সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া বাংলাদেশের জনসাধারণের রুচিবোধ ও শিল্পানুরাগেরই প্রতিফলন। এই জন্য আজ আমরা গর্ববোধ করতে পারি; এই বিশ্বাস থেকে যে ফর্মের ভাষা সব সাংস্কৃতিক পার্থক্য অতিক্রম করে আলৌকিক বৈশিষ্ট ধারণ করতে পারে।
সংসদ ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে এবং শেষ হয় ১৯৮৪ খিস্টাব্দে। সংসদ ভবনের নিচতলা এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার বর্গফুট, স্থায়ী কক্ষ ৪০০টি, সিঁড়ি ৫০টি। সংসদ সদস্যের আসন সংখ্যা ৩৫৪টি। আমরা সাধারণত একটা ভবনে দেয়াল, জানালা, ছাদ ও কলাম দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু এই ভবনে শুধু একটি মাত্র কলাম আছে। বাকি সব দেয়ালেরই অংশ হয়ে ভবনটিকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। দক্ষিণ প্লাজা দিয়ে মসজিদ অংশের নিচ দিয়ে যেন পবিত্র হয়ে ভবনে ঢুকতে হয়; যদিও এই দরজা খুব বেশি ব্যবহার হয় না। মসজিদের স্পেসও অসাধারণ। অনেকটা উঁচুতে ছাদ আর দেয়ালে আলোর খেলা। নামাজের স্থানে এমন উপযুক্ত ও মহৎ স্পেস আর কোথাও আছে কি না সন্দেহ। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ আজ জাতীয় সংসদ ভবন নিয়ে গর্ব করতে পারে, কেননা এই ভবনই এখন গণতন্ত্রের চর্চার তীর্থ হয়ে উঠেছে।
লেখক : স্থপতি ও বিভাগীয় প্রধান, স্থাপত্য বিভাগ
সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
