ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বছরব্যাপী মশক নিধন, ডেঙ্গু ও করোনাভাইরাসের মতো সংকট মোকাবিলায় সিটি ভবনে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, বায়ু ও শব্দদূষণ, সিটি করপোরেশনের দুর্নীতি বন্ধসহ নির্বাচনী ইশতেহারে ১৯ দফায় ৯৫টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটিতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল। গতকাল সোমবার গুলশানে ইমানুয়েলস কনভেনশন হলে জাতিসংঘের ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য-২০৩০ এর আলোকে তৈরি’ এ ইশতেহার তুলে ধরেন তিনি।
এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান ও তাবিথের বাবা আবদুল আউয়াল মিন্টু, আবদুল্লাহ আল নোমান, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
নির্বাচনী ইশতেহার তুলে ধরে তাবিথ বলেন, ‘আমি আপনাদের কাছে আমার স্বপ্ন ও পরিকল্পনার কথাগুলো বলবার আগে আবেদন জানাচ্ছি, দয়া করে আমাকে সহযোগিতা করুন, সমর্থন করুন, আমার পাশে দাঁড়ান। আমি আপনাদের সহানুভূতি চাই। আমি কথা দিচ্ছি, আপনাদের অধিকার, সুযোগ-সুবিধা ও সেবার বিষয়ে আমি কখনো আপস করব না।’ এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি যেদিন নির্বাচিত হবো, সেদিন থেকেই কাজ শুরু করব।’ অপর এক প্রশ্নে তাবিথ বলেন, ‘জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে বিরোধী দলে থেকেও কাজ করা হয়। সিলেটের মেয়র আরিফুল হক ব্যাপক উন্নয়নমূলক কর্মকা- পরিচালনা করছেন। সম্প্রতি ঝুলে থাকা তার মাটির নিচে ট্যানেলের মাধ্যমে নিয়ে গেছেন। এজন্য সিলেটের মেয়র সবার প্রশংসা কুড়িয়েছেন।’
‘মেয়র প্রার্থীরা যেসব প্রতিশ্রুতি দেন তা একটি রাজনৈতিক সরকার পাঁচ বছরে করতে পারেন না। বিশেষ করে পরিবহন সেক্টরে বিগত সরকারগুলো শৃঙ্খলা ফেরাতে পারেনি। সে ক্ষেত্রে সরকারের ক্ষুদ্র একটি অংশীদার হয়ে কীভাবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন’ দেশ রূপান্তরের এমন প্রশ্নে তাবিথ বলেন, ‘সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত না হওয়ায় শুধু পরিবহন সেক্টর কেন, কোনো সেক্টরে সফলতা দেখাতে পারছে না। কারণ যাদের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে হচ্ছে। কিন্তু জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। কারণ জনগণের শক্তির কাছে বড় কেউ নেই।’
অপরিকল্পিত নগরে অগণিত চ্যালেঞ্জের মুখে টেকসই ও বিশ্বমানের আধুনিক নগর গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাবিথ বলেন, মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হলে তিনি ডেঙ্গুজ¦র প্রতিরোধে বছরব্যাপী কার্যক্রম নেবেন। ডেঙ্গুর ভাইরাস বহনকারী এডিস মশা ও লার্ভা নিধনে কার্যকর কীটনাশক প্রয়োগ, ‘মশা প্রতিরোধী’ বৃক্ষরোপণ, নিয়মিত মশার প্রবলতা পরীক্ষা ও জলাশয় পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেবেন। সিটি করপোরেশনের আওয়ামী লীগের দুই মেয়রের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু অনেকটাই ম্যানেজেবল এখন। কিন্তু সিটি করপোরেশন নিজ উদ্যোগে করেনি। তাদের অবহেলাতেই ডেঙ্গু রোগ বিস্তার পেয়েছে। মেয়র হলে আমি ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ থেকেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কর্মসূচি শুরু করব।’ এ সময় মেয়র হলে রাসায়নিক কারখানাগুলো ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করারও প্রতিশ্রুতি দেন বিএনপির এ প্রার্থী।
ইশতেহারে দূষণমুক্ত ঢাকা গড়ার প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ঢাকার উত্তরে তিনি যথাযথ সবুজায়ন করবেন। ‘ভার্টিকেল গার্ডেন’ প্রকল্প চালুর পাশাপাশি নগরবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে তার। পরিবেশবান্ধব দালানগুলোকে সনদ দেওয়া হবে। এ সময় আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, রাত ১২টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে নগরীর আবর্জনা অপসারণ, রিসাইক্লিং সেন্টার স্থাপন ও পশু জবাইয়ের জন্য ‘আধুনিক সøটার হাউজ’ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন ধানের শীষের এ প্রার্থী।
রাজধানীর যানজট নিরসন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ‘টেকসই উন্নয়নের’ বিষয়টি ইশতেহারে তুলে ধরেন তাবিথ। বলেন, এ লক্ষ্যে গণপরিবহনমুখী যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নে পুলিশ ও বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। ঢাকার রুটগুলোকে ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি ইলেকট্রিক ও হাইড্রোজেন চালিত বাস, রাত্রীকালীন নিরাপদ বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ এবং নগর ঘিরে রাজউকের রিংরোড তৈরিতে সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতিও দেন বিএনপির এ মেয়র প্রার্থী। তিনি বলেন, সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নগরে ‘কমন ইউটিলিটি বাইপাস ও টানেল’ নির্মাণ, ‘স্কাইওয়াক’ প্রবর্তন, ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ ও পার্কিং ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে।
স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে ‘রিমোট ও ভার্চুয়াল’ চিকিৎসাসেবা, ‘মোবাইল মেডিকেল ইউনিট’ স্থাপন, নারী-শিশু ও প্রতিবন্ধীবান্ধব ‘বিশেষ নারী সেল’ গঠন এবং নারীদের মাতৃত্বকালীন ও পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের বিনা খরচে চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে ধানের শীষের এ মেয়র প্রার্থীর ইশতেহারে। নগরে নিরাপদ ও সুপেয় পানির বন্দোবস্ত, প্রতিটি বাজারে ভেজাল খাবার পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপন, পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, ব্যবসায়ীদের দ্রুত ট্রেড লাইসেন্স প্রদান, অপরাধ দমনে ইমার্জেন্সি পোর্টাল স্থাপন ও ক্রাইম ম্যাপিং চালু করার কথাও বলেছেন তিনি। নগরবাসীর বিনোদনের জন্য ওয়ার্ডভিত্তিক বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা, শিশুপার্ক ও বিনোদনকেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়ন এবং আবাসন খাতে নাগরিক সমস্যা সমাধানে অনলাইন সার্ভিস চালু করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে তার ইশতেহারে। তথ্যপ্রযুক্তিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী তাবিথ ইশতেহারে জানিয়েছেন, ঢাকা সিটিকে ‘ইন্টেলিজেন্ট সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলতে চান। ডেটা অ্যানালাইসিস ও ফেইস রিকগনিশন চালু করে অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিক সেবাও নিশ্চিত করতে চান তিনি।
