সিটি করপোরেশন দুর্নীতিমুক্ত করার অঙ্গীকার তাপসের

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২০, ০৫:১২ এএম

নির্বাচিত হলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে (ডিএসসিসি) সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করার অঙ্গীকার করে নির্বাচনী ইশতেহারে পাঁচ রূপরেখা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস। গতকাল বুধবার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ ইশতেহার ঘোষণা করেন তিনি।

ইশতেহারে নির্বাচিত হলে বিদ্যমান আইন প্রয়োগ করে সব সেবা সংস্থাকে করপোরেশনের কাছে দায়বদ্ধ করা হবে জানিয়ে ঐতিহ্যের ঢাকা, সুন্দর ঢাকা, সচল ঢাকা, সুশাসিত ঢাকা ও উন্নত ঢাকাÑ এ পাঁচ রূপরেখা বাস্তবায়নে কাজ করবেন বলে বলেছেন বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনির ছোট ছেলে তাপস। এছাড়া গণপরিবহনের চলাচলে নিয়ন্ত্রণ, গৃহকর বৃদ্ধি না করা, ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু, নগর অ্যাপ, ছাত্র ও কর্মজীবী মহিলাদের জন্য হোস্টেল, সুপেয় পানি, খাল ও লেক অবৈধ দখলমুক্তকরণ ও সৌন্দর্যবৃদ্ধি করাসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। তাপসের এ ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু, মোজাফফর হোসেন পল্টু, যুগ্ম সাধারণ

 সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল, আফজাল হোসেনসহ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী।

অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ তাপস সাংবাদিকদের বলেন, পাঁচ দফা রূপরেখা অনুসারেই ৩০ বছরের মহাপরিকল্পনা তৈরি করে বিভিন্ন মেয়াদে তা বাস্তবায়ন করা হবে। তবে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশের লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অধিকাংশ প্রকল্প শেষ করা হবে। এ সময় তিনি আগামী ১ ফেব্রুয়ারির ভোটে জয়ী হতে নৌকা মার্কায় ভোট চান।

ইশতেহারে ‘ঐতিহ্যের ঢাকা’ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের এ মেয়র প্রার্থী বলেন, ‘৪০০ বছরের পুরনো আমাদের এই ঢাকার রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্যের উজ্জ্বল ছবি, ঐতিহ্যের গভীর শিকড় ও প্রতœতাত্ত্বিক গুরুত্ব। পর্যটনের জন্য ঢাকা হতে পারে অপার সম্ভাবনার ক্ষেত্র। এখানে ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ অনন্য। সাংস্কৃতিক ধারায় রয়েছে ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, পহেলা বৈশাখ, ঘুড়ি উৎসব, চৈত্রসংক্রান্তিসহ অজস্র উৎসব। আমি নির্বাচিত হলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকাকে “ঐতিহ্য প্রাঙ্গণ” হিসেবে গড়ে তুলব।’ তিনি বলেন, ‘বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যাÑ দুই নদীর অববাহিকায় পত্তন হওয়া আমাদের এই ঢাকা। এমন শহর পৃথিবীতে বিরল! “সুন্দর ঢাকা” গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক উদ্যান নির্মাণ, সবুজায়ন, ছাদবাগানে উৎসাহ, পরিবেশবান্ধব স্থাপনা বৃদ্ধি, বায়ু ও শব্দদূষণ রোধসহ শরীর ও চিত্তবিনোদনের জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ, শরীরচর্চা কেন্দ্র এবং নারী-শিশু ও প্রবীণদের জন্য হাঁটার উন্মুক্ত স্থান, আধুনিক মানের কমিউনিটি সেন্টারের ব্যবস্থা করা হবে। সাধারণ ও ভ্রাম্যমাণ পাঠাগারের ব্যবস্থা, দুস্থ-অসহায়দের কল্যাণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

শেখ তাপস বলেন, ‘খালগুলোর অবৈধ দখল উচ্ছেদ-খনন ও সৌন্দর্যবর্ধন করা হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, প্রয়োজনীয়সংখ্যক নর্দমা নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও জলাধার সংরক্ষণ এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দৈনন্দিন ভিত্তিতে সড়কের ওপর থেকে আবর্জনার স্তূপ অপসারণ করা হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার পাড় ঘিরে বনায়ন, বিনোদনকেন্দ্র স্থাপনসহ ব্যাপক সৌন্দর্যবর্ধনের মাধ্যমে সুন্দর ঢাকা গড়ে তুলব।’

‘অচল ঢাকাকে সচল করা হবে’ জানিয়ে আওয়ামী লীগের এই মেয়র প্রার্থী বলেন, ‘যানজটের কারণে রাস্তায় চলাচল হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো ও ফিরে আসতে নিরন্তর সংগ্রাম করতে হয়। বিশেষ করে কর্মজীবী নারীদের বিড়ম্বনা অপরিসীম। গণপরিবহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কিছু রাস্তায় দ্রুতগতির যানবাহন, কিছু রাস্তায় ধীরগতির যানবাহন, আবার কিছু রাস্তায় শুধু মানুষের হাঁটার ব্যবস্থা করব।’ সাইকেল লেন চালু করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, দ্রুতগামী যানবাহনের জন্য থাকবে আলাদা পথ, থাকবে নিরাপদ সড়কব্যবস্থা। রাস্তা পারাপারের সুব্যবস্থাসহ নগর ঘুরে দেখার ব্যবস্থা থাকবে। থাকবে প্রয়োজনীয় সড়কবাতি। পর্যটকদের ঘুরে বেড়ানোর জন্য শহরে নামানো হবে বিশেষ বাস সার্ভিস। তিনি আরও বলেন, ‘মাদক নির্মূল, জুয়া, কিশোর অপরাধসহ নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়জনিত বিভিন্ন অপরাধ রোধসহ এলাকাভিত্তিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় পঞ্চায়েতব্যবস্থা কার্যকর ও সংশোধনকেন্দ্র নির্মাণ করব। বছরের ৩৬৫ দিন, সপ্তাহের ৭ দিন, ২৪ ঘণ্টা নাগরিক সেবা প্রদানের জন্য খোলা থাকবে। ব্যবসায়িক লাইসেন্স পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে। গৃহকর (হোল্ডিং ট্যাক্স) বাড়ানো হবে না।’

দায়িত্ব গ্রহণের ৯০ দিনের মধ্যে মৌলিক সব নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের এ প্রার্থী বলেন, মশকের প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস, মশকনিধনে দৈনন্দিন ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, হাসপাতাল-ডিসপেনসারি ও প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনসহ মাতৃসদন, পরিবার পরিকল্পনা ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে ফায়ার হাইড্রেন্ট নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও পাড়া-মহল্লায় অগ্নিনির্বাপণ গাড়ি প্রবেশের কার্যকর পদক্ষেপসহ প্রয়োজনে নিজস্ব দমকল বাহিনী গঠন করা হবে।’

শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, করপোরেশন কোনো রাস্তা নির্মাণের পর অন্তত তিন বছরের মধ্যে অন্য কোনো সংস্থা ওই রাস্তা খনন করতে পারবে না। আইন, বিধি ও নীতিমালা কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে ঢাকার উন্নয়ন ও সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সিটি করপোরেশনের কাছে সমন্বিতভাবে দায়বদ্ধ করা হবে। সপ্তাহে এক দিন নগরবাসীর সঙ্গে তাদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে মেয়র নিজে আলোচনা করবেন। ব্যবসায়ীদের জন্য হবে ওয়ানস্টপ সেবা।’ তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ৩০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে নগরীর উন্নতি সাধন, ইমারত নির্মাণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা, ভূমি অধিগ্রহণ, নগর-পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হবে। নতুন ১৮টি ওয়ার্ডের জনগণের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নতুন প্রকল্প গ্রহণসহ প্রতিটি সড়ক ও নর্দমার উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের মান নিরূপণ করে অন্তত ১০ বছরের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা হবে। তিনি আরও বলেন, জনগণকে প্রদেয় করপোরেশনের সব সেবা, যেমন বাণিজ্য লাইসেন্স, জন্ম নিবন্ধন সনদ, প্রত্যয়নপত্র, গৃহকর, পৌরকর, অন্যান্য কর তথ্যপ্রযুক্তিগত সেবার আওতায় আনা হবে। সব ক্ষেত্রে অনলাইন সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে। নগরবাসী ঘরে বসেই কর এবং নির্ধারিত ক্ষেত্রে ফি পরিশোধসংক্রান্ত সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। ২৪ ঘণ্টা হেল্পলাইন এবং নাগরিক সেবা ও সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় তথ্যসমৃদ্ধ নগর অ্যাপ চালু করা হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত