‘কৃষকবন্ধু সেলিম রেজা’ বিশাল সংগ্রহশালা শুরু করেছিলেন কৃষকদের ফসলের উপকারী ও অপকারী পোকামাকড় চেনাবেন, জানাবেন বলে। আলাপ করে, দেখে লিখেছেন ওহী আলম। ছবি তুেলছেন রাফী উল্লাহ
তাদের ফসলের প্রধান প্রতিবন্ধক ও উপকারী বন্ধু পোকা, মাকড়, ব্যাঙ, সাপ, পাখিরা। ফসলের মান, লাভ, ক্ষতি সবই নির্ভর করে তাদের ওপর। তবে না জেনে অনেক সময় কৃষক উপকারী পোকাও কীটনাশক দিয়ে, নানাভাবে ধ্বংস করেন। ফসলের অনন্য এই পোকা-মাকড় নিয়ে তার আগ্রহ বেশি। বলেন কৃষকের বাণিজ্যলক্ষ্মী, মন্দ ভাগ্যের মূল তারা। তার সংগ্রহশালার উপকারী কটি পোকা_
-লেডি বার্ড বিটল (Lady bird beetle) : শূন্য দশমিক ৮ থেকে ১৮ মিলিমিটার লম্বা ছোট্ট পোকাগুলো উত্তর আমেরিকা থেকে ব্রিটেনের ফসলেও থাকে। পূর্ণ বয়সী পোকা, তাদের ছোট্ট সন্তানও বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য ফসল ধানগাছের শত্রু বাদামি ঘাসফড়িং, সাদা পিঠ ঘাসফড়িং, ছাতরা, জাব পোকাসহ অন্যান্য ক্ষতিকর পোকার ডিমসহ পোকাগুলো খেয়ে ফসলকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।
-ক্যারাবিড বিটল (Carabid beetle) : ধানগাছের ক্ষতিকর বাদামি ঘাস ফড়িং, সাদা পিঠ ঘাসফড়িং, পাতা মোড়ানো পোকার কীড়া বা লার্ভাসহ (বাচ্চা) অন্যান্য পোকা শিকার করে খায়।
-মাকড়সা : ফসলের অনিষ্ট করা পোকার ডিম, কীড়া, পুত্তলি ও পূর্ণবয়স্ক পোকা ধরে খায়। সাধারণত ধানক্ষেতের মাজরা পোকা, ঘাসফড়িং, পাতা ফড়িং ও ক্ষতকর মাছি ওদের খাদ্য। কিছু মাকড়সা জাল না পেতে শিকার করে ও ধরে খায়। কিছু আছে যারা জাল পেতে শিকার করে ও খায়।
-ড্যামস্যামফ্লাই (Demsemfly) : ড্যামস্যামফ্লাইয়ের শাবক পানিতে বাস করে। মা ও বাবা পোকা নানা ধরনের পাতা ও ঘাসফড়িংয়ের বাচ্চা ধরে সবাই মিলে খাওয়ার জন্য ধানগাছ বেয়ে উঠতে পারে। পূর্ণবয়সের পোকা ধানগাছের পাতার নিচ দিয়ে উড়ে বিভিন্ন ধরনের পোকা শিকার করে ও খায়।
-ড্রাগনফ্লাই (Dragonfly) : ড্যামস্যামফ্লাইয়ের চেয়ে আকারে বড় হয় তারা। মাথার দুপাশে বড় দুটি চোখ আছে। বসে থাকলেও ওরা পাখনা দুটি বিমানের ডানা ছড়িয়ে বসে_ এই হলো স্বভাব। ওরা গাছের ওপরের দিকে দ্রুত উড়ে বেড়ায়। বিভিন্ন পোকামাকড় ধরে খায়। খুব চঞ্চল ড্রাগনফ্লাই।
-বোলতা (Wasp) : বাংলাদেশে সুপরিচিত বোলতা বা ওয়াসপ কিন্তু ফসলের খুব উপকারী। ফসল ধ্বংস করে ও ফসলে জীবাণুর বাহক পোকামাকড়ের ডিম, কীড়া, পুত্তলি ও পূর্ণবয়সের পোকার ওপর পরজীবী হিসেবে তারা বাস করে জীবনধারণ করে, তাদের ধরে খায়। ওদের সবাইকে নষ্ট করে দেয়। অধিকাংশ বোলতা মাজরা পোকার ডিম বা কীড়ার ওপর ডিম পাড়ে। ফলে তাদের মারা অন্যায়।
-ঘাসফড়িং ( Grass hopper) : ঘাসফড়িং ঘাসে, ঘাসে বেড়ানো ফড়িং। মাজরা, গান্ধি পোকা, গাছ ও পাতা ফড়িংয়ের ডিম ও ছানা শিকার করে খায়। তারা ফসলের এত উপকারী যে এক-একটি ঘাসফড়িং দিনে তিন থেকে চারটি হলুদ মাজরা পোকার ডিমের গাদা খেয়ে ফেলতে পারে।
এবার বলি তার সংগ্রহের কটি অপকারী বা ফসলের শত্রু কটি পোকার গল্প–
-বাদামি ঘাসফড়িং (Brown planthopper) : যেসব ধানের জাতের বাদামি ঘাসফড়িং নামের পোকার আক্রমণ প্রতিরোধের জন্মগত বা বৈজ্ঞানিকভাবে পাওয়ার ক্ষমতা নেই, সেই ফসলগুলোতে হলুদ রঙের এই পোকাগুলো খুব দ্রুত বংশ বাড়ায় এবং আক্রমণ করে খায়। অবিশ্বাস্য গতিতে তাদের সংখ্যা বাড়ায় ক্ষেতে তারা বাজ পড়ে ফসল নষ্ট হওয়ার চেহারা তৈরি করে, তার আগেই ফসল শেষ করে দেয়। আক্রান্ত গাছ প্রথমে হলুদ হয়, পরে শুকিয়ে মরে।
-ধানের ছাতরা পোকা (Rice mealy bug) : হলুদ এই পোকাগুলো শুকনো আবহাওয়ায়, খরায় ও যেসব জমিতে বৃষ্টির পানি জমতে পারে না, তখন ধানে বেশি আক্রমণ করে। গাছের রস শুষে খেয়ে ওরা বাঁচে। ফলে গাছ খাটো হয়ে জীবনীশক্তির অভাবে মরে। আক্রমণ বেশি হলে ধানের শিষ বের হয় না। আক্রান্ত ক্ষেতের গাছ বসে গিয়েছে এমনটি দেখা যায়। স্ত্রী ছাতরা খুব ছোট, লালচে সাদা, নরম দেহের, পাখাহীন, গায়ে সাদা মোমের মতো আবরণের। তারাই গাছ মারে খেয়ে। প্রকৃতির আশ্চর্য নিয়মে পুরুষ পোকা ফসলের কোনো ক্ষতি করে না।
-পামরি পোকা (Rice hispa) : চালের শত্রু পামরি পোকার গায়ের রং কালো, পিঠে কাঁটা আছে। পূর্ণবয়সের পোকা তার পুরো জীবনই ধানগাছের ক্ষতি করে। পুরো বয়সে পামরি পোকা ধানের পাতার সবুজ অংশ কুরে, কুরে খায়। তাতে পাতার ওপর লম্বা, সমান্তরাল কটি দাগ চোখে পড়ে। বেশি ক্ষতি করতে পারলে পাতাগুলো শুকিয়ে পুড়ে মরেছে বলে মনে হয়। তার আগেই এই পোকার আক্রমণে গাছগুলো মরে যায়।
-মাজরা পোকা (Rice stem boror) : বাংলাদেশে তিন ধরনের মাজরা পোকা ফসলের ক্ষতি করে_ হলুদ মাজরা, কালো মাথা মাজরা এবং গোলাপি মাজরা পোকা। এই পোকার কীড়াগুলোও এতই ক্ষতিকর যে, তারা গাছের কাণ্ডের ভেতরে থেকেই গাছ খাওয়া শুরু করে। ধীরে ধীরে গাছের ডিগ (নরম কাণ্ড), পাতার গোড়া খেয়ে কেটে ফেলে। ফলে ডিগ, পাতা মারা যায়। একে ‘মরা ডিগ’ বা ‘ডেড হার্ট’ বলে।
-গান্ধি পোকা (Rice bug) : এই জাতের গান্ধি পোকা ধানের দানা আক্রমণ করে। পূর্ণবয়সের তো বটেই, শিশু পোকাও ধানের ক্ষতি করে খেয়ে। দানায় যখন দুধ হয়, তখন এবং পুরো ক্ষতি করলেও ধানে চিটা হয়। তখন আক্রমণ না করে পরে ওরা আক্রমণ করলে ধানের মান খারাপ হয়, চাল ভেঙে যায়।
-সবুজ পাতা ফড়িং (Green leafhopper বা Rice green leafhopper) : আমাদের সবুজ পাতা ফড়িং নামে পরিচিত এই পোকাগুলো ধান করে এমন সব দেশেই আছে। শিশুকাল থেকে তাদের খাদ্য ধানের পাকার রস। তারা ধানগাছ মারে; বেঁটে করে, ক্ষণকালের আক্রমণে হলদে রোগ ছড়ায়, ‘টুংরো’ ও ‘হলুদ বেঁটে’ নামের ভাইরাস রোগ ছড়ায়।
n ধানের থ্রিপস (Rice thrips) : এই দেশে ছয় জাতের থ্রিপস পোকা ধানগাছকে আক্রমণ করে। পূর্ণবয়স্ক থ্রিপস তো বটেই, তাদের বাচ্চারাও গাছের পাতার ওপর ক্ষত করে পাতার রস শুষে খেয়ে বাঁচে। তাতে পাতা লম্বালম্বিভাবে মুড়ে যায়, মরে যায়। খাওয়া জায়গা হলদে পরে লাল হয়। চারা, কুশি (পাশ দিয়ে গজানো নতুন পাতা, অনেকগুলো মিলে হয় ধানের গোছা) ছাড়া অবস্থায়ও তারা গাছ আক্রমণ করে। যেসব জমিতে পানি জমতে পারে না, সেগুলোতে পোকাগুলোর আক্রমণ বেশি হয়।
n চুঙ্গি (Rice case worm) : তারা রাতে বের হয়। আলোর প্রতি আকর্ষণ বেশি থাকে। চুঙ্গি পোকা ধানগাছের কুশি ছাড়ার পাতার সবুজ অংশে লম্বালম্বি আক্রমণ করে এবং পাতাগুলো খেয়ে এমন অবস্থা করে যে পাতার ওপরের পর্দাটি পড়ে যাওয়া বাকি থাকে। আক্রান্ত ক্ষেতের পাতাগুলো সাদা হয়ে যায়। গাছের চারায় পোকাগুলো বেশি ক্ষতি করতে পারে। কাটা পাতাগুলো বাতাসে, পানিতে ভেসে ক্ষেতের এক কোণে জমা হয়। দেখলে মনে হয়, কাঁচি দিয়ে পাতা কুচি কুচি করে কাটা হয়েছে।
n গলমাছি (Rice call midge) : এই মাছির আক্রমণে ধানের মাঝের পাতা পেঁয়াজ পাতার মতো হয়ে যায়। ফলে তাদের আক্রমণের শিকার পাতাগুলোর নমুনাকে ‘পেঁয়াজ পাতা’ বলে। আক্রমণের শুরুতে পাতাগুলোর রং হালকা উজ্জ্বল সাদা থাকে। ধানগাছে আক্রমণ করা ছোট এই পাকাগুলোকে অনেক সময় খালি চোখে দেখা যায় না। তারা ধানের শিষ জন্মাতে দেয় না।
n পাতা মোড়ানো (Rice leafroller) : বয়সকালে দেখতে পোকাগুলো প্রজাপতির মতো ধানের এই শত্রুরা সেই গাছের পাতা মেরে লম্বাভাবে মুড়িয়ে দেয়, পাতার সবুজ অংশ খেয়ে ওরা বাঁচে। তাতে পাতায় সাদা লম্বা দাগ হয়। তারা গাছের খুব ক্ষতি করলে পাতা পুড়ে যাওয়ার হয়ে মরে পড়ে থাকে।
n সাদা পিঠ ঘাসফড়িং (White plant hopper) : সাদা রঙের সুন্দর পোকাগুলো বেশির ভাগ সময় বাদামি ঘাসফড়িংয়ের সঙ্গে মিলে থাকে। অভিজ্ঞ না হলে তাদের আলাদা করে চেনা যায় না। পোকাদের ছানারা সাদা, বাদামি, কালো ও সাদার মিশেলের হয়। পুরো বয়সের ফড়িং পাঁচ মিলিমিটার লম্বা, পিঠের ওপর সাদা লম্বা দাগ থাকে। পূর্ণবয়সের স্ত্রী সাদা পিঠ ফড়িং ছোট পাখার হয়। পোকাগুলো গাছের ভাইরাস-জাতীয় কোনো রোগ ছড়ায় না, গাছের রস শুষে খেয়ে বাঁচে বলে পাতা মারে; পরে গাছও মরে। তাদের খাবার হয়ে যাওয়ার পর মরা পাতাগুলোকে পুড়ে যাওয়ার মতো দেখায়।
n শিষ কাটা লেদা পোকা (Ear cutting caterpillar) : ধানের শত্রু এই পোকাগুলো। রোপা ও বোনা আমন ধানের জন্য খুবই ক্ষতিকর। একসঙ্গে অনেক থাকে কোনো এক ধানগাছে। ফলে তাদের ইংরেজ কৃষক ও বিজ্ঞানীরা ‘আর্মি ওয়ার্ম’ও ডাকেন। এক ক্ষেতের ফসল খেয়ে শেষ করে তারা আরেক ক্ষেতে আক্রমণে যায়। লেদা পোকা নানা জাতের ঘাসও খায়। তবে এ পোকার কীড়াগুলো শুধু ফসলের ক্ষতি করতে পারে। তারা বড় হলে আধা পাকা বা পাকা ধানের শিষের গোড়া খেয়ে গাছ কেটে দেয়। ফলে আমরা তাদের বলি ‘শিষ কাটা লেদা পোকা’। তারা এশিয়ার অন্যতম ধ্বংস বয়ে আনা পোকা।
n লম্বা শুঁড় উড়চুঙ্গা (Southern mole cricket) : মাটির নিচে গাছের গোড়া খেয়ে ফেলে, নতুন শিকড় খায়, গাছের গোড়া কেটে দেয়। সবভাবেই গাছ মারে। অনেক সময় তাদের ক্ষতিগুলোকে মাজরা পোকার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন কৃষকরা, কিন্তু মাজরা গাছের কাণ্ডের ভেতর ভেতরে ঢুকে কাণ্ড খায়। লম্বা শুঁড় উড়চুঙ্গা বা উড়চুঙ্গা নামে পরিচিত এই পোকা পানি আটকে থাকে না, কোথাও আছে, কোথাও নেই; মাটি চোখে পড়ছে বা পানি নেই_ এমন ধানক্ষেতে আক্রমণ করে। ক্ষেত পানিতে ডুবলে আইলে বা উঁচু জায়গায় উড়চুঙ্গা উড়ে চলে যায়। মাটির শক্তস্থানে বসে ডিম পাড়ে। অন্যসব ক্ষতিকর ও উপকারী পোকার মতো তারাও জন্ম থেকে গাছের ক্ষতি করে।
কৃষিবিদ সেলিম রেজার কাছে আছে ফসলের মারাত্মক ক্ষতিকর আগাছাও। তিনি জানালেন, ‘এই আগাছাগুলোই জমির ফলন অর্ধেক কমিয়ে আনতে পারে।’ কটি গুরুত্বপূর্ণ আগাছার বিবরণ দিলেন–
n শ্যামা : বিশ্বের নিকৃষ্টতম আগাছার একটি। আমাদের দেশেও দেদার জন্মে ভেজা, পানি থাকে এমন জমিতে। ধানের জমিতে ওরা জন্মে, বাড়ে; ধানের আগাছা হিসেবে থাকে। ধানের সঙ্গে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম সারের জন্য তীব্রভাবে লড়াই করে বাঁচে। যে হারে, সে মরে। তারা এতই শক্ত প্রাণ যেকোনো জমির ৯০ ভাগ ধানও মেরে ফেলতে পারে। ওরা খাঁড়া ও শক্ত কাণ্ডের এক বছরের বেশি বাঁচা আগাছা। লম্বায় ১ দশমিক ৫ মিটার বা ৪ দশমিক ৯২ ফিটও হয়। প্রকৃতির আশ্চর্য খেয়াল, শ্যামা দেখতে অনেকটা ধানগাছের মতো; চারা ধানের চারার মতো, পূর্ণবয়সের গাছপাতা হওয়া ধানের গাছের মতো। উঁচু জমির ধানক্ষেত এবং নিচু জমিতে এই আগাছা প্রচুর দেখা যায়। তারা ধানের সঙ্গে নাইট্রোজেন, পটাশিয়াম ও ফসফরাসের জন্য তীব্রভাবে প্রতিযোগিতা করে। শ্যামার বিস্তারে ও আক্রমণে কখনো জমির শতকরা ৯০ ভাগ ফসল নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
n আঙুলি : আঙুলি ও বর্ষজীবী, ঘাসজাতীয় আগাছা। ৭০ সেন্টিমিটার বা ২ দশমিক ৯৬ ফিট পর্যন্ত লম্বা হয়। ফুল হয় তিন থেকে আটটি, খাঁড়া। ছড়াগুলো লম্বা। চারদিকে ছড়ানো। আর্দ্র বা স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় ভালো জন্মে। বীজে বংশ বাড়ায়। কেটে সাফ করলেও উপযুক্ত মাটিতে লুকিয়ে থাকা বীজে আবার অত্যন্ত দ্রুত জন্মাতে পারে। আউশ ধানের অন্যতম প্রধান এই শত্রু তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে একই খাবার খেয়ে টিকে এবং জমিতে এই ফসলের ৭০ ভাগ ফলন শেষ করে দিতে পারে।
n মুথা : সারা বিশ্বের ১০টি সবচেয়ে ক্ষতিকর আগাছার একটি মুথা নামে আমাদের দেশে পরিচিত। এক বর্ষজীবী বিরুৎ-জাতীয় আগাছার গাছ এটি। কাণ্ড খাঁড়া, শাখা-প্রশাখা নেই, গা মসৃণ, শরীর তিন কোণের; পুরো গাছ সাধারণত ১০ থেকে ৭৫ সেন্টিমিটার লম্বা। বীজ ও কন্দে ওরা জীবন বাড়ায়। উঁচু জমির ধানক্ষেত, যেখানে আউশ জন্মে; সেখানে তারা খুব ক্ষতিকর। রোপা-আমন ধান চাষের জমিতে কাদা করার সময় ধানগাছের যথেষ্ট পানি না থাকলে, রোপণের পর জমি শুকিয়ে গেলে মুথা অনেক বেশি জন্মে। জমিতে ফসলের ৫০ ভাগকে মেরে ফেলে তাদের খাবার খেয়ে। তাদের দমন খুব কষ্টের। সেজন্য উন্নত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োজন।
n বড় চুচা : বর্ষজীবী আগাছা। সাধারণত ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। কাণ্ড মুথার মতোই; কিন্তু তারা গুচ্ছ করে বাড়ে। স্যাঁতসেঁতে জমিতে বড় চুচা ভালো জন্মে। ধানের অন্যতম ক্ষতিকর আগাছা প্রজাতিটি আমাদের আউশ, রোপা-আমন ও বোরো ধানের জমিতে জন্মে। ধানের চারার মূল ও অঙ্গ বাড়াকে প্রভাবিত করে তাদের সঙ্গে খাবারের লড়াই করে টিকে থাকে। ওরা দুর্বল হয় বা মরে, তারা বাড়ে। ফসলের ৪০ ভাগ মেরে ফেলে।
n কাঁটা নটে শাক : বাংলাদেশের সবখানে কাঁটা নটে শাক জন্মে। চাষ লাগে না, পড়ে থাকা, আবাদ করা যাবে বা জন্মানো সম্ভব এমন জমিতে, পথের ধারের আইলেও জন্ম লাভ করে। ভেজা, স্যাঁতসেঁতে মাটিতে ভালো জন্মায়। জমে থাকা পানি তাদের শত্রু। সেখানে কোনো দিনও জন্মায় না। উর্বর, যেখানে দ্রুত আপনাতেই ফসল হয়_ তাদের আদর্শ ভূমি। গরম তাদের প্রিয়। আমাদের দেশ বাদেও ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ গরমের দেশগুলোতে জন্ম নেয়। এরা বছরখানেক বাঁচে, গায়ে কাঁটা আছে। এক মিটার বা ৩ দশমিক ২৮ ফিট পর্যন্ত লম্বা হয়। তাদের কাণ্ড নরম, শাখা থাকে। পাতা ডিমের মতো দেখতে। প্রতিটি ডালের আগায় মঞ্জরি আছে। ফুল ছোট, ধূসর-সাদাটে। ফুল, ফল সারা বছর ধরে। তবে কাঁটা নটে শাকের কাণ্ড ও শিকড় নানা রোগের ওষুধ। তারা বীজ থেকে চারার মাধ্যমে জন্ম নেয়। বীজ চকচকে ও কালো। আউশ ধানের অন্যতম প্রধান শত্রু কাঁটা নটে শাক। এই ফসলের জমিতে তাদের সঙ্গে প্রাকৃতিকভাবে মিল আছে বলে আপনাতেই দ্রুত বাড়ে, বিস্তার হয়। তারা পুষ্টি খেয়ে এই ধানের ৮০ ভাগ ফলন কমিয়ে দেয়, তাদের মেরে ফেলে। কাঁটা নটে শাকও বিশ্বের অন্যতম নিকৃষ্ট আগাছা। আমাদের দেশে ‘নটে শাক’ নামে তাদের শাক হিসেবেও খাওয়া হয়।
n দূর্বা : এই ঘাস আমরা সবাই চিনি। আউশ, পাট, আখ, ভুট্টা ইত্যাদি ক্ষেতে থাকে। তবে সব সময় পানি আছে এমন জমিতে বাঁচে না। দূর্বা সবুজ কাণ্ডের, কখনো লালচে। ৫ থেকে ৪৫ সেন্টিমিটার লম্বা, মসৃণ, গোলাকার। ফুল ধরে তাদের। এটি বীজ, ডালপালার মাধ্যমে বংশ বাড়ায়। মাটির খুব গভীরে শিকড় নেই বলে যেতে পারে না। দূর্বাঘাসের বিনাশের প্রাকৃতিক উপায়, লাঙল বা ট্রাক্টরে মাটি গভীর থেকে চাষ করে শিকড় উল্টে দিয়ে রাখা। পরে গরমে সূর্যের তাপে ঘাসগুলো মরে যায়।
n প্রেম কাঁটা : সুন্দর নামের আগাছা গাছগুলো প্রায় সারা বছর জন্মাতে পারে। উঁচু, মাঝারি উঁচু জমি তো বটেই, বাড়ির আঙিনা, পথের ধারে, জমির আইলেও অসংখ্য জন্মায়। এপ্রিল থেকে আগস্ট_ চারটি মাস তাদের বীজ ও ফুল জন্মানোর আদর্শ আবহাওয়া। লতানো গাছগুলো বীজ, কাণ্ড ও গোড়ার মাধ্যমে বংশ বাড়ায়।
n কানাই নলা : বহু বছর বাঁচে আগাছার এই গাছ। মাটিতে গড়িয়ে তারা থাকে। কাণ্ড রসে ভরা। মসৃণ বা কম লোমের। ১২ থেকে ৪০ ইঞ্চি (৩০ সেন্টিমিটার থেকে মিটারখানেক) লম্বা কানাই নলা চেনার প্রধান উপায়_ ফুল দুটি নীল। তারা ভেজা মাটির উদ্ভিদ। শুকনো বালিমাটি তাদের আদর্শ বাসভূম। বীজ ও গায়ের অঙ্গ থেকে বংশ বাড়ায়।
