ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করে ডাকা হরতালে বিএনপির নেতাকর্মীদের রাজপথে তেমন দেখা যায়নি। গতকাল রবিবার সকাল-সন্ধ্যার এ হরতালে কোনো পিকেটিং হয়নি। কর্মসূচিতে ছিলেন না দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাও। হরতালকে কেন্দ্র করে সকাল ৭টা থেকে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন দলটির নেতাকর্মীরা। সকাল সাড়ে ৯টায় তাদের সঙ্গে যোগ দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ সময় প্রতীকী ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) পোড়ানো তারা। হরতাল শেষে কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব আগামীকাল ৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানী ঢাকার থানায় থানায় বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
বিএনপির ডাকা এই হরতালে সমর্থন জানিয়েছিল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। হরতালকে কেন্দ্র করে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন ছিল। ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান লক্ষ করা যায়। নির্বাচনী দায়িত্বের অংশ হিসেবে মাঠে ছিলেন বিজিবি সদস্যরাও। হরতাল কর্মসূচি চলাকালে দলীয় কার্যালয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী বলেন, হরতাল গণতন্ত্রের অন্যতম অস্ত্র। গণতন্ত্রের এই অস্ত্রের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের দাবি আদায় করব। হরতাল মানে কোনো বিধ্বংসী কাজ নয়, হরতাল মানে আগুন দিয়ে পোড়ানো নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটাকে ভিন্ন খাতে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু বিএনপি সেদিকে যাবে না।
বেলা ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের বিক্ষোভে অংশ নেন ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন। নেতাকর্মীরা তাকে নেতাদের সঙ্গে চেয়ারে বসার অনুরোধ জানালেও তিনি কর্মীদের পাশে বসে নিজেই স্লোগানের নেতৃত্ব দেন। এ সময় তারা ‘মুক্তি মুক্তি মুক্তি চাই, খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই’, ‘আজকের হরতাল, চলছে, চলবে’, ‘দাবি আদায়ের হরতাল চলছে চলবে’, ‘সংগ্রাম, সংগ্রাম, রাজপথে সংগ্রাম চলছে, চলবে’, ‘প্রহসনের নির্বাচন মানি না, মানব না’ ইত্যাদি সেøাগান দেন।
‘সিটির ফল মনগড়া’ : পরে ইশরাক তার বক্তব্যে বলেন, ‘নির্বাচনের ফলে যে পরিমাণ ভোট কাস্ট দেখানো হয়েছে তার চাইতে অনেক কম ভোট কাস্ট হয়েছে। আমরা দেখেছি, আওয়ামী লীগ সমর্থকরা সাধারণ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে দেননি। যে ফল ঘোষণা হয়েছে সেটি সম্পূর্ণ মনগড়া একটি সাজানো ফল। এ ফলাফলের মাধ্যমে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি। আমরা এ ফল প্রত্যাখ্যান করছি।’
‘হরতালের দাবি জনগণের কাছ থেকে এসেছে’: দুপুরের পর বিএনপির কার্যালয়ের সামনে যান ঢাকা উত্তর সিটিতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, ‘হরতালের দাবি জনগণের কাছ থেকে এসেছে। আমরাও জনগণের পক্ষে আছি।’ হরতালে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তাবিথ সাংবাদিকদের বলেন, ‘হরতালকে কেন্দ্র করে দৃশ্যমান কিছু আমরা দেখছি না। দুই সিটিতেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সবাই এ হরতাল পালন করছে।’ তিনি বলেন, ‘ন্যূনতম সুষ্ঠু ভোটও হয়নি। এ রকম নির্বাচন আমরা কখনো প্রত্যাশা করিনি। তাই ভোট চুরির নির্বাচন আমরা প্রত্যাখ্যান করছি।’
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব বলেন, সিটি নির্বাচনে যেসব অনিয়ম, কারচুপি হয়েছে সে বিষয়ে গণমাধ্যমের কাছে তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরবেন আমাদের দুই মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল এবং প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন। নির্বাচনের ওপর মানুষের আস্থা চলে যাওয়ায় ভোটার উপস্থিতি কম হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ায় জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি)।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, ইশরাক হোসেন, তাবিথ আউয়াল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
হরতালের সমর্থনে দুপুরে হাইকোর্ট এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেন বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা। একই সময়ে ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থী ও ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শরিফউদ্দিন জুয়েলের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল হয়। মিছিলটি বারিধারা প্রগতি সরণি থেকে শুরু হয়ে নতুন বাজার গিয়ে শেষ হয়। এছাড়া ছাত্রদল বাংলামোটর ও ল্যাবএইড এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করে।
হাত-পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে নয়াপল্টনে রিজভী : সিটি নির্বাচনে দলীয় মেয়র প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালাতে গিয়ে ‘হামলার শিকার’ রিজভী সকাল ৬টায়ই নয়াপল্টনে ছুটে যান। এ সময় তার হাত-পায়ে ব্যান্ডেজ ছিল। হরতাল শেষ হওয়ার কিছু আগে আবার অ্যাম্বুলেন্সে করে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে চলে যান তিনি।
